সাত যুবকের গল্প (পর্ব-২)

এই যুবকরা গিয়ে সেই ময়দানে দাঁড়াল যেখানে রোমান শাসনের পতাকা উড়ছিল। এই রোমান শাসনই ছিল তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে সুশৃঙ্খল সভ্য উন্নত ও আইন প্রণেতা দেশ। এই শাসন ব্যবস্থাও পৃথিবীর এক বিশাল অঞ্চলব্যাপী দর্পের সাথে রাজত্ব করছিল। সমকালীন এই মহাশক্তিধর পাওয়ারের একেবারে নাকের নীচে, চোখের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কয়েকজন তরুণ একত্ববাদের এই নতুন দাওয়াতকে গ্রহণ করছে এবং তার দাওয়াত দিচ্ছে। আর এটাই ছিল তখনকার সত্য দ্বীন, যথার্থ ইসলাম। কারণ, তখনও খৃষ্টধর্ম বিকৃত হয়নি। হযরত ঈসা ( আলাইহিস সালাম)-এর পয়গাম ও দাওয়াতের যথার্থ পতাকাবাহীগণ সেখানে পৌঁছেছিলেন। তাঁরা সেখানে গিয়ে জানালেনঃ এই শাসকেরা আমাদের রিযিকদাতা নয়। আমাদের লালন-পালন করার ক্ষমতাও তাদের নেই। আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনিই আমাদের রিযিকদাতা, তিনিই পালনকর্তা।

 

“ আকাশ ও পৃথিবীর প্রভুই আমাদের প্রভু”

 

জীবনোপকরণের দন্ড যাদের হাতে, প্রতিষ্ঠিত সেই সরকারের সামনেই, সেই দেশেই এই বাণী উচ্চারণ করা হলো। বাহ্যত যে শাসকেরা ছিল সে দেশের জনতার ভাগ্য ও রিযিকের অধিপতি। মানুষের ক্ষতি ও উপকার সাধনের সব শক্তিই বাহ্যত তাদের হাতেই সমর্পিত ছিল। অবস্থা এমন ছিল, শাসকদের সাথে সম্পর্ক নির্মাণ ও তাদের প্রতি আত্মসমর্পণই  তখন বুদ্ধিমত্তা ও বাস্তবদর্শিতা মনে করা হতো। পুরো সমর্পণ না করলেও নীরবতা ও মৌনতার সাথে জীবন পার করে দেয়াটাই ছিল দৃশ্যত যুক্তিগ্রাহ্য বিষয়। কিন্তু তারা ধরলেন বিপরীত পথ। তারা গ্রিক ও রোমান দেবতাদেরকে অস্বীকার করে বসলেন। অথচ সমকালীন গ্রিক ও রোম সভ্যতা সংস্কৃতি ও জীবনবোধ ছিল এসব দেবতা বিশ্বাসে পূর্ণ আচ্ছন্ন। শুধু গ্রিক আর রোমই কেন, প্রাচীন ভারতও ছিল একই ব্যাধির শিকার। সংশয়বাদে সমর্পিত ছিল সবাই। আল্লাহ তা’আলার অনুপম গুণাবলীকে তারা দেবতার আকৃতিতে ভাবতো। তাদের নামে ভোজনালয় ও ইবাদতখানা নির্মাণ করতো। বলতো, এটা ভালবাসার দেবতা, এটা করুণার দেবতা, যুদ্ধজয়ের দেবতা এটা আর ওটা হলো ভয় ও প্রভাব সৃষ্টির দেবতা। বৃষ্টি অ শান্তির দেবতাও ছিল স্বতন্ত্র। কিন্তু ভাগ্যবান ও সত্যদর্শী এই যুবকদল একবাক্যে অস্বীকার করে বসল এ সকল দেবতাকে। তারা বললঃ

 

“তারা বলল; আমাদের প্রতিপালক আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিপালক। তাঁকে ব্যতীত অন্য কোন মাবুদকে আমরা ডাকবো না। যদি ডাকি তাহলে তা হবে খুবই গর্হিত। আমাদের সম্প্রদায়ের এই লোকেরা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যদেরকে মাবুদ বানিয়ে রেখেছে। ( আচ্ছা, এরা যে তাদের প্রভু ও মাবুদ ) এ বিষয়ে তারা স্পষ্ট প্রমাণ পেশ করে না কেন? যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে তাদের চাইতে জঘন্য অবিচারী আর কে আছে”?  ( সূরা কাহাফঃ ১৪-১৫ )

 

 

এখানে পবিত্র কুরআন আরেকটি তত্ত্ব তুলে ধরেছে। তা হলো, প্রথম উদ্যোগ মানুষকেই নিতে হয়। মানুষকেই প্রথমে সসাহসে অগ্রসর হতে হয়। তারপর আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে সাহায্য অবতীর্ণ হয়। ইরশাদ হয়েছেঃ

 

“তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছে, তারপর আমি তাদের হেদায়াতকে বৃদ্ধি করে দিয়েছি”।

 

এতে এ কথাই প্রতিভাত হয়, যদি কোন ব্যক্তি অপেক্ষায় থাকে কোন কথা কিংবা বুশ্বাস নিজে নিজেই তার অন্তরে স্থান করে নিবে অথবা বিনা সাধনাতেই তার কণ্ঠে শোভিত হবে- তাহলে তার ধারণা হবে ভুল ও অবাস্তব। সত্য হলো, প্রথমে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারপর সচেষ্ট হতে হবে। আল্লাহর সাহায্য আসবে সচেষ্ট হবার পর। আল্লাহ বলেছেন-

 

“ আমি তাদের অন্তরগুলোকে আশ্রয় দিয়েছি, ভরসা দিয়েছি “

 

কারণ তাদের লড়াইটা ছিল সমকালীন সর্বোচ্চ শক্তির সাথে। তারা সরকারী ধর্ম উপেক্ষা করে আল্লাহর দ্বীনকে গ্রহণ করেছিল।

 

                                                                   ( চলবে……………… )

                                                                  ( লেখকঃ সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী ( রহঃ )

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (টি রেটিং)