সাত যুবকের গল্প ( পর্ব-১ )

“তারা ছিল কয়েকজন যুবক। তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেছিলাম, আমি তাদের চিত্ত দৃঢ় করে দিলাম; তারা যখন উঠে দাঁড়াল, তখন বলল, আমাদের প্রতিপালক! আকাশ্মন্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালক! আমরা কখনই তাঁর পরিবর্তে অন্য কোন মাবুদকে ডাকব না; যদি করে বসি তবে সেটা খুবই গর্হিত হবে।“

                                                                                              ( সূরা কাহাফঃ ১৩-১৪)

সূরা কাহাফের যে আয়াত দুটি উধৃত করা হয়েছে সেই আলোকে এবং আধুনিককালের স্টাইলে যদি বলি তাহলে আজকের আলোচনার নাম দিতে সাত যুবকের গল্প। আল কুরআনে বর্ণিত এই গল্পে মানব জাতির তরুণ সমাজের জন্য মহান পয়গাম নিহিত রয়েছে। এই ঘটনা তাদের জন্য এক উন্নত মডেল। চেতনার অবিনাশী উৎস। সকল কালের তরুণদের জন্যই সমান উপযোগী এই ঘটনা। শুধু মন ও বিশ্বাসই নয় বরং যোগ্যতা, সাহস, স্বপ্ন ও সংকল্প নির্মাণেও এই ঘটনা সমান কার্যকর। কখনও বা এই গল্প পাঠে হৃদয়ে প্রশান্তির শিশির ঝরে, কখনও বা বর্ষিত হয় তরতাজা পুষ্পবৃষ্টি, কখনও বা হৃদয়ে জ্বলে উঠে দৃঢ় অঙ্গীকার। আজকের যুবসমাজকে সেই গল্পই শুনাচ্ছে আল-কুরআন। আর তারা ছিল এত ভাগ্যবান, কুরআন তাদের গল্প শুনিয়ে তাদেরকে শাশ্বত ও চিরন্তন মর্যাদায় ভূষিত করেছে। সকল কালের সকল তরুণদের জন্য তাদেরকে নির্বাচন করেছে অনুসরণীয় মডেল হিসেবে। ঘতনার বর্ণ্না খুবই সরল ও সংক্ষিপ্ত। অথচ খুবই গভীর এবং শিক্ষণীয়।

গল্পটি হল এই, রোমান সুপার পাওয়ার শাসিত একটি অঞ্চল। যাকে শাম ও ফিলিস্তিন বলা হয়। এই অঞ্চলেই একটি দাওয়াত সৃষ্টি হল। যারা বাহক হযরত ঈসা ( আলাইহিস সালাম )। আমরা মুসলমানরাও যাঁকে আল্লাহর নবী হিসেবে মানি ও শ্রদ্ধা করি। তিনি আবির্ভূত হলেন। তাওহীদের প্রতি জানালেন উদাত্ত আহবান। অথচ খোদার দুনিয়াটা তখন শিরক ও কুফরীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। এই অন্ধকারের মধ্যেই তিনি আলোর চেরাগ হাতে উঠে দাঁড়ালেন। শিরক, বংশপূজা, রুসুম-রেওয়াজের অন্ধ অনুকরণ, সংশয়বাদ, ক্ষমতার দাপট আর মানবতা বিরোধী সকল তৎপরতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললেন। তাঁর এই দাওয়াতের ভিত্তি তাওহীদ ও নিরেট আল্লাহর দাসত্ব। কেউ কেউ তাঁর এই দাওয়াতকে মেনে নিল। তারা নিজেরাও শরীক হয়ে পড়লো মহান এই তাওহীদি মিছিলে। তারা তাওহীদের এই আলোকিত পয়গাম নিয়ে নিজেদের অঞ্চল থেকে বেরিয়ে এলো। রোমকদের শাসনকেন্দ্রের কাছে গিয়ে এই দাওয়াত তুলে ধরলো। এটা বাস্তব, সাধারণত পরিপক্ব বয়স ও অভিজ্ঞতায় যারা পুষ্ট হন তাদের পা প্রচলিত রেওয়াজ, অভিজ্ঞতার আবেদন, ভয় ও সম্ভাবনার অদৃশ্য শেকলে বাঁধা থাকে। ফলে তারা অভিজ্ঞতার নতুন সীমানায় পা দিতে যেমন ভয় পায় তেমনি নবতর আহবে ঝঁপিয়ে পড়তেও দ্বিধা বোধ করে। থমকে দাঁড়ায়। পক্ষান্তরে ওই অদৃশ্য শেকল্মুক্ত তরুণ সমাজ সহজেই পারে যে কোন সংস্কারের ডাকে সাড়া দিতে, নতুন সীমান্তের পথে পা বাড়াতে। যৌবন ও তারুণ্য এভাবেই এগিয়ে যায় নতুনের পথে।

এখানে কুরআনে কারীম চিহ্নিত করেনি এই যুবকদের বয়স কত ছিল। আর এটাই কুরআনের বৈশিষ্ট্য। কারণ, যদি নির্দিষ্ট করে বলতো, তাদের বয়স ১৮-২০ বছর-তাহলে এর নীচের ও উপরের বয়সীরা বলতো, এটা আমাদের গল্প নয়। তাই কুরআন বলেছেঃ “তারা কয়েকজন যুবক ছিল”। এখানে ‘ফিতয়াতুন’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আরবী ‘ফিতয়াতুন’ শব্দটি বয়সের তারুণ্যের পাশাপাশি মন মেজায সাহস উদ্যম সংকল্প ওস্বপ্নের তারুণ্যের প্রতিও ইঙ্গিত করে। আর এখানে ‘ফিতয়াতুন’ শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় অল্প কয়েকজন তরুণ। আর এটাই সর্বকালের বাস্তবতা। যখনই সত্য সুন্দর ও সংশোধনের কোন দাওয়াত এসেছে তো সূচনাতে খুব সামান্যজনই তা গ্রহণ করেছে। আল্লাহ তা’আলা যাদেরকে তাওফিক দিয়েছেন তারাই যুগে যুগে এই সাহস করেছেন।

এখানে আল্লাহ তা’আলা তাঁর সুন্দরতম নামাবলীর মধ্যে “রব” শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ইরশাদ করেছেন- “তারা ছিল কয়েকজন তরুণ-তারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল”। এখানে রব’ শব্দটির অর্থ গভীর অর্থবহ। কারণ, শাসকরা নিজেদেরকে প্রজাদের রিযিকদাতাও মনে করে। কখনও বা এ কথা মুখে বলে, আবার কখনও তা তাদের কাজেকর্মে ফুটে উঠে। ফলে, শাসিতের ভেতরেও এমন একটা ধারণা সৃষ্টি হয়, তারা ভাবে সম্মানের সাথে বাঁচতে হলে, সুখ-ভোগের ভিতর জীবনযাপন করতে হলে শাসক শ্রেণীর সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তাদের তল্পি বহন করতে হবে। তাদের আঁকা ছকের ভিতরে থেকে জীবনযাপন করতে হবে। তাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলাতে হবে। কারণ, এর বাইরে গেলে সুখভোগ ও মর্যাদার জীবন ব্যাহত হবে। জীবন হয়ে পড়বে দুর্বিষহ।

কুরআনে কারীমের অলৌকিকতা এটাই। কুরআন যেখানে যে শব্দ চয়ন করেছে সেটাই সেখানকার জন্য যথার্থ। শব্দের এই একটি চয়নমাত্রার কারণে এক শব্দ পুরো এক গ্রন্থের মর্ম বর্ণনা করতে পারে।    

                                                                     (   চলবে.........।)

                                                            ( লেখকঃ সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী ( রহঃ)                                             

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)