জার্মানীতে ইসলাম দ্রুত বিকাশমান ধর্ম

ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানী আয়তনের দিক দিয়ে ইউরোপের সপ্তম বৃহৎ রাষ্ট্র। ১৬টি অঙ্গ রাজ্য নিয়ে জার্মান ফেডারেল ইউনিয়ন গঠিত। ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দের পুর্বে জার্মানরা সুসংঘবদ্ধ জাতি ছিলনা। ৩,৫৬,৯৭১ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের জার্মান রাষ্ট্রের রাজধানী বার্লিন। সর্বশেষ আদম শুমারী অনুযায়ী জার্মানীর জনসংখ্যা ৮,৩২,৫১,৮৫১ জন। ‘বন’ পশ্চিম জার্মানীর অস্থায়ী রাজধানী। প্রধান ভাষা জার্মান। জার্মানীর পার্লামেন্টে আসন সংখ্যা ৬১৪টি। দু’তৃতীয়াংশ মানুষ রোমান ক্যাথলিক অথবা প্রোট্যাষ্টান্ট। ১৯৬১ সালে দু’জার্মানীর মধ্যে বিভেদ রেখা হিসেবে গড়ে তোলা হয় বার্লিন প্রাচীর। পূর্ব জার্মানী এ প্রাচীর নির্মাণ করে। অবশ্য ১৯৮৯ সালে এ প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর দু’জার্মানী একীভূত হয়। জার্মানীতে ইহুদীর সংখ্যা স্বল্প। ১৮৭১ সালে প্রোশিয়া জার্মানীর সাথে একীভূত হওয়ার পর ইহুদীদের সমান অধিকার প্রদান করা হয়। ১৯৩০ সালে জার্মানীতে পাঁচ লাখ ইহুদী বাস করত। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অধিকাংশ ইহুদী হয়তো দেশ ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায় অথবা নাৎসী বাহিনীর হাতে নিহত হয়। মাত্র ৪০ হাজার ইহুদী, যাদের মধ্যে অধিকাংশ বয়োবৃদ্ধ, জার্মানীতে থেকে যায়। পুর্ব ইউরোপে কমিউনিজমের পতনের পর ইহুদীরা রাশিয়া ও ইউরোপের পূর্বাঞ্চল হতে বার্লিনসহ জার্মানীর বিভিন্ন শহরে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে।

ইসলামের বিকাশধারা

ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশসমূহের মধ্যে জার্মানী অন্যতম। সামাজিক শৃংখলা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে জার্মানী উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে। সুষ্টু ও অবাধ নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকায় জার্মানীতে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী খ্রিষ্টান ধর্মালম্বী। মুসলমান, ইহুদী, হিন্দু ও শিখধর্মালম্বীদের সংখ্যা আনুপাতিক হারে কম। জার্মানীর ৮ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ৩৫লাখ মুসলমান; যাদের অধিকাংশই তুরস্ক হতে আগত। বর্তমানে বিভিন্ন শহরে ২১লাখ তুর্কী বংশোদ্ভূত মুসলমান বসবাস করে। জার্মান বংশোদ্ভূত মুসলমানের সংখ্যা প্রায় এক লাখের মত। বার্লিন, কোলন, ফ্রাংকফুট, মিউনিখ, আচেন এবং মুলহেইমে মুসলমানের অবস্থান ৪ হতে ৫ শতাংশ। অবশ্য সব শহরে এ সংখ্যার অনুপাত সমান নয়। আচেন এলাকায় মুসলমানদের সংখ্যা ১০ শতাংশ। বার্লিনের ৩০ লাখ জনগণের মধ্যে পাঁচ লাখ মুসলমান।

তুরস্কের উসমানী খিলাফতের সোনালী যুগে ইসলামের আলোকধারা জার্মানীতে প্রবেশ করে। মুবাল্লিগ, মুজাহিদ, ব্যবসায়ী ও ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে জার্মানীর বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলাম বিকশিত হতে থাকে। বৈরী পরিবেশে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে মুসলমানগণ নিজেদের অবস্থান গড়ে নিতে সক্ষম হয়। খ্রিষ্টান অধ্যুষিত জার্মানীতে মসজিদ, পাঠাগার ও ইসলামী শিক্ষকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় মুসলমান ধর্মপ্রচারক ও সমাজ হিতৈষীদের অসামান্য অবদান রয়েছে। বহু ধর্মপ্রাণ মুসলমানের প্রানান্ত প্রয়াসে পুরো জার্মানীতে ২ হাজার মসজিদ গড়ে উঠেছে ; এর মধ্যে ৪০০ হচ্ছে বিভিন্ন বৃহৎ আকারের শপিংমল অথবা বাণিজ্যিক কেন্দ্রে প্রার্থনা কক্ষ। জার্মানীতে ইতোমধ্যে অনেক ইসলামিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বর্তমানে চারটি বড় আকারের ইসলামী সংস্থা কর্মরত। এইগুলো হলো ১. সুপ্রিম কাউন্সিল অব মুসলিম্স ইন জার্মানী ; ২. সেন্ট্রাল কাউন্সিল অব মুসলিম ; ৩. ইউনিয়ন অব তার্কিশ মুসলিম্স এবং ৪. ইসলামিক ইনিষ্টিটিউট অব আচেন। সুপ্রিম কাউন্সিল অব মুসলিম্স ইন জার্মানীর তত্ত্বাবধানে প্রায় ৮০০ মসজিদ পরিচালিত হয়। আচেন এলাকায় ইসলামিক ইনিষ্টিটিউটের বহুমাত্রিক তৎপরতার ফলে ইসলাম ক্রমান্বয়ে বিস্তার লাভ করছে। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ হতে এই সংস্থা যুবকদেরকে ইসলামের পথে দাওয়াত প্রদান এবং তাদের অনৈতিকতার হাত থেকে রক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ড. মুহাম্মদ হাওয়ারী’র তত্ত্বাবধানে প্রতিমাসে

শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়, যেখানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ হতে প্রায় ১৫০০ শত মুসলমান অংশ নেন। শিশু ও তরুণদের শিক্ষাদানের পদ্ধতির উপর সবিশেষ জোর দেয়া হয়। প্রতি শনিবার ইনষ্টিটিউটের ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন বয়সের মহিলাদের সমাবেশ ঘটে। ঈমান, আকীদা, আখিরাত, জবাবদিহিতা, পরিবার, দাম্পত্য জীবন, সমাজসেবা, উন্নত নৈতিক চরিত্র ইত্যাদী বিষয়াবলীর উপর ক্লাশ বা বক্তব্য পেশ করা হয়। আচেন এলাকায় ইসলাম ধর্মের বিকাশের ক্ষেত্রে ড. মুহাম্মদ হাওয়ারীর গুরুত্বপূর্ণ সেবাধর্মী অবদান রয়েছে। দামিশ্কে জন্মগ্রহণকারী এ ধর্মপ্রচারক ১৯৫৮ হতে ১৯৬২ পর্যন্ত বেলজিয়ামে ফার্মেসী ও রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন। ঔষধ প্রস্তুতকরণ শিল্পের উপর রয়েছে তাঁর পি.এইচ.ডি ডিগ্রী। ১৯৬২ হতে ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি দামিশ্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে জার্মানী গমন করেন। ১৯৮০ সাল হতে জার্মানীতে তিনি ইসলামের খিদমতে নিয়োজিত রয়েছেন। জার্মানী ইসলামিক সেন্টারের উপ-পরিচারক এবং কাউন্সিল অব ইসলামিক কোপারেশন ইন ইউরোপের উপদেষ্টা হিসাবে ইউরোপের বুকে ইসলামকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। কাউন্সিলের দু‘টি শাখা রয়েছে; একটি ব্রাসেলসে অপরটি ষ্টাসবার্গে। ড. হাওয়ারী বেলজিয়ামে অধ্যয়ন কালে ব্রাসেলসে ইসলামিক সেন্টার স্থাপন করেন এবং তিনিই এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মক্কাস্থ রাবেতা আল আলম আল ইসলামীর অঙ্গ সংগঠন ইসলামিক ফিকাহ কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে তিনি ইউরোপে অবস্থানকারী মুসলমানদের আর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সমস্যাবলী এ ফোরামে তুলে ধরেন।

ধর্মশিক্ষার ব্যবস্থা

রাষ্ট্র পরিচালিত জার্মানীর স্কুলগুলোতে মুসলমানদের ধর্মশিক্ষার কোন ব্যবস্থা না থাকলেও মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারে আরবীভাষা, কুরআন, হাদীস, ইসলামের ইতিহাস ও সংষ্কৃতি শিক্ষাদানের সুব্যবস্থা রয়েছে। জার্মানীতে সাধারণত দুপুরে স্কুল ছুটি হয়ে যায় এবং প্রত্যেহ বিকেলবেলা ধর্মীয় বিষয়াদির ক্লাশ শুরু হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সুপ্রিম কাউন্সিল অব মুসলিম বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি পাঠ্যক্রম তৈরী করে এবং রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত স্কুল সমূহে অধ্যয়ণরত মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের ইসলাম ধর্ম বিষয়ক শিক্ষা প্রদান করা যায় কিনা তার উপযোগিতা নিয়ে সরকারের উর্দ্ধতন মহলে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রাখে। ইতোমধ্যে বার্লিন, বন ও মিউনিখে প্রাইভেট ইসলামিক স্কুল গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে কিং ফাহাদ একাডেমী অন্যতম। এইসব প্রাইভেট স্কুলগুলো পরিচালনা পর্ষদ অথবা ট্রাষ্টি বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত। এইসব স্কুলের সরকারী স্বীকৃতি থাকলেও সরকারের পক্ষ হতে আর্থিক অনুদান, বেতন, ভাতা প্রদান করা হয়না। তিউনিসিয়া, মরক্কো ও তুরস্ক সরকারের সাথে সাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী আরবী ও অন্যান্য ইসলামিক বিষয়াবলী পাঠ দানের জন্য স্ব স্ব সরকার শিক্ষক প্রেরণ করে থাকেন। সেভেন এলেভেনের ঘটনায় জার্মানে মুসলমানরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। জার্মান সরকার মুসলমানদের ব্যাপারে কিছু কঠোর নীতিমালা ও বিধি পরিবর্তন করে। ইসলামিক সেন্টার ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় এতদিন যে স্বাধীনতা ছিল, ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর তা সীমিত হয়ে পড়ে। নব প্রণীত নীতিমালা অনুযায়ী যে কোন সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে কোন মুসলমানকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি করতে পারে। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মুসলমানরা নীরব ও অলস বসে নেই। তাঁরা প্রতিনিয়ত সকারের সাথে আলাপ আলোচনায় বসেন। ডা. নঈম ইলিয়াছের নেতৃত্বে সুপ্রিম কাউন্সিল অব মুসলিম্স ইন জার্মানীর একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল জার্মান চ্যান্সেলরের সাথে সাক্ষাৎ করে সন্ত্রাস পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন এবং জার্মানীতে মুসলমানদের অবস্থান তুলে ধরেন।

স্মর্তব্য যে, জার্মানী সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে পুরুষের তুলনায় মহিলার সংখ্যা সব চেয়ে বেশী। এর পেছনে রয়েছে নানা যৌক্তিক কারণ। নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী স্বাধীনতার নামে পাশ্চাত্যে যে সব কর্মকান্ড হচ্ছে তাতে সাধারণ মহিলারা আতংকিত ও বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠছেন। হুদা খতূব নাম্নি এক খ্রিষ্টান মহিলা যিনি পরবর্তী সময়ে মুসলমান হয়েছেন, এক সাক্ষাতকারে মন্তব্য করেন,“নারীবাদ মূলত নারীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার নামান্তর”।
তিনি আরও বলেন: Women copying men, an exercise in which womanhood has no intrinsic value.. অর্থাৎ ‘মহিলারা পুরুষদের নকল করছে; এটা এমন এক কর্মকান্ড যার কারণে নারীত্বের অন্তর্নিহিত মর্যাদা আর অবশিষ্ট থাকে না।’

ইউরোপের মর্যাদাবান সংবাদপত্র The London Times তার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যে মন্তব্য করে তা প্রণিধানযোগ্য: It is even more ironic that most converts should be women, given the disparate view in the West that Islam treats women poorly. Westerners despairing of their own society- rising crime, family breakdown, drugs and alcoholism- have come to admire the discipline and security of Islam.
অর্থাৎ ‘এটা অত্যন্ত দূর্ভাগ্যের ব্যাপার যে, ধর্মান্তরিতদের মধ্যে অধিকাংশ মহিলা, অথচ পশ্চিমা বিশ্বে এ মতবাদ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে যে, ইসলাম নারীদের সাথে দুর্ব্যবহার করে। ক্রমবর্ধমান নেশাগ্রস্থতা, মদ্যপান, পারিবারিক ভাঙ্গন ও অপরাধ প্রবণতার কারণে নিজেদের সমাজ সম্পর্কে হতাশাগ্রস্থ পশ্চিমাগণ ইসলামের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রশংসা করছে।’

প্রতিকূল ও বৈরী পরিস্থিতি সত্ত্বেও জার্মানীতে অবস্থানরত মুসলমানগণ ইসলামী শরীয়তের বিধি অনুসরণে অত্যন্ত কঠোর। তারা ইসলামী সংস্কৃতি প্রতিপালনে কোন আপোষ করতে রাজী নয়। কারণ শরীয়তই একজন মুসলমানের অস্থিত্বের ভিত্তি। এ দৃঢ় মনোবৃত্তির কারণে জার্মানীর ভূ খন্ডে ক্রমশ ইসলাম বিস্তৃতি লাভ করছে।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3.7 (3টি রেটিং)

sl

 

আলহামদুলিল্লাহ ।

আল্লাহ্ তাঁর দ্বীনের প্রচার প্রসার ঘটাবেনই। কিন্তু আমাদের সাফল্য নির্ভর করছে আমরা সে কাজে নিজেদেরকে কতটা যুক্ত করতে পেরেছি, তার উপর।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

 

sl

German Priest burned himself Wtinessing Islam Growing

 

http://www.youtube.com/watch?v=8O74zn9w-gY

sl

১৭  জন  জার্মানের  ইসলাম  গ্রহণ ,  অনলাইনে  শাহাদাত  ঘোষণা দেখুন -

http://www.youtube.com/watch?v=8Y3IOuzkbHM&feature=player_embedded

ভাল লাগা রেখে গেলাম . .

-

নিরপেক্ষতা মানে যদি এই হয় যে তা সত্যের পক্ষেও নয় মিথ্যের পক্ষেও নয় বরং নিরপেক্ষ তবে আমি নিরপেক্ষ নই , সত্যের পক্ষে ।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3.7 (3টি রেটিং)