জো পল ইকন এর ইসলাম গ্রহণ

নাম: জো পল ইকন। ইসলাম কবুলের পর তিনি সালেহ নাম গ্রহণ করেন। জন্মস্থান: ফিলিপাইন। তিনি তার ইসলামে আসার কাহিনী এভাবে বর্ণনা করেন:

“আমার জন্ম রোমান ক্যাথলিক পরিবারে। ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলতে পারিবারিকভাবে আমাদেরকে খুবই কড়া শাসনে রাখা হতো। ইলেমেন্টারী স্কুলে পড়াবস্থায় আমি গীর্জার গায়কদলের একজন মেম্বার ছিলাম। মেরীর বিভিন্ন ধরণের মুর্তি আমার সাথে থাকতো। যেমন: কুমারী মেরী, মেরী ম্যাগডালেন বা চরিত্র সংশোধনকারী মেরী, নিস্কলংক মেরী ইত্যাদি। 

স্কুল শেষ করে যখন আমি কলেজে ভর্তি হলাম তখন আমার ধর্মীয় চিন্তায় একটি পরিবর্তন আসে। একদিন কলেজের একটি অনুষ্ঠানে পাদ্রী বাইবেল পড়ছিলেন। আমাদের সবার হাতেও ছিল একটি করে বাইবেল। আমি বাইবেলে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে, এ গ্রন্থে বার বার মুর্তিপুজার ব্যাপারে নিষেধ করা হচ্ছে অথচ আমরা নিজেরাই দিন রাত মেরীর মুর্তি বানিয়ে চলেছি। এ বৈপরিত্য আমাকে ব্যথিত করে। আমি পরের দিনই রোমান ক্যাথলিক চার্চে ইস্তফা দিয়ে প্রোটেষ্ট্যান্ট খৃষ্টান পরিচয় গ্রহণ করি।

কলেজে আমার কিছু শিক্ষক ছিলেন মুসলিম। কিন্তু উনাদের জীবন যাপন ছিল অন্য দশটা খৃষ্টান বা হিন্দুদের মতোই, কোনো পার্থক্য আমার চোখে পড়েনি। একারনে আমার ধারণা জন্মে যে: এ ধর্ম হয়তো নিজে থেকেই সৃষ্ট, গড থেকে না। 

মুসলিমদের সম্পর্কে আমাদেরকে কলেজে যে ধারণাটি দেয়া হতো তা হচ্ছে, এরা খুবই খারাপ প্রকৃতির। কখনো এদের সাথে কোন কাজ কর্ম বা লেন দেনে যাবেনা। এদের সামনে দিয়ে যাবেনা, তাহলে এরা তোমাকে হত্যা করতে পারে। ইত্যাদি ইত্যাদি।

কম্পিউটার ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করার পর আমি ফিলিপাইনস্ত ইনটেল কোম্পানীতে চাকুরী নেই। আমরা হার্ডওয়ারের চিপস তৈরী করতাম। সৌদী আরবে তখন আমাদের চাহিদা প্রচুর। বিশেষ করে যারা পিসি এসেম্বলিং এ দক্ষ। একদিন নিউজপেপারে একটি চাকুরীর বিজ্ঞাপন দেখলাম। সৌদী আরবের একটি ব্যাংকে হার্ডওয়্যার/সফটওয়্যার ইঞ্জিনীয়ার হিসেবে লোক নিয়োগ হবে। আমি আবেদন করলাম। আমার পূব অভিজ্ঞতা থাকায় সাথে সাথে চাকুরীও হয়ে গেল। এক সপ্তাহের মধ্যে আমি মাতৃভুমি ফিলিপাইন ছেড়ে সৌদী আরবের দাম্মামের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমালাম। 

একটি এপার্টমেন্টে আরও কয়েকজন ফিলিপিনোর সাথে আমরা থাকতাম। ব্যাংকে যিনি আমাদের সুপারভাইজার ছিলেন তার নাম আবদুল্লাহ আল আমর। তিনি আরব হলেও আমাদের সাথে তার সমস্ত কথাবার্তা হতো ইংরেজীতে। একদিন তিনি একটি গল্প বলতে গিয়ে “জেসাস” শব্দটি উচ্চারণ করেন। আমি প্রায় কিছুটা উত্তেজিত হয়েই তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম: জেসাস আমাদের গড। তার সম্পর্কে আপনি কি জানেন?

আমার প্রশ্ন শুনে তিনি কিছক্ষন চুপ থেকে অত:পর বললেন: তুমি কি নুহ, আব্রাহাম (ইবরাহিম), মুসা প্রমুখ নাবীদের নাম শুনেছ? আমি বললাম: হ্যা, তাদের নাম আমি বাইবেলে পড়েছি। তারা সকলেই গড প্রেরিত ছিলেন। 

তিনি বললেন: তারা আমাদেরও নাবী। 

তার এ জওয়াব শুনে আমার অন্তর রাজ্যে ঝড় শুরু হলো। আমি নিজেকেই প্রশ্ন করলাম: তাহলে কি তাদের ধর্মের সাথে আমাদের ধর্মের কোনো সংযোগ আছে? আমি কি এতোদিন কোনো ভুলের মধ্যে ছিলাম? যদি তাদের ও আমাদের ধর্ম বিশ্বাস একই হয়ে থাকে তাহলে তাদের সাথে আমাদের এ শত্রুতা কেন?

আমার কৌতুহলী মন সত্যটা জানতে ব্যাকুল হয়ে উঠল। দাম্মামস্ত জারির বুক শপে একবার আমি বিভিন্ন ধরণের বই দেখেছিলাম। সেদিনই আমি ঐ বুকশপে গেলাম। কিছু বইয়ের হেডিং ছিলো এরকম: Jesus not God, Son of Mary. আমি বিভিন্ন ধর্মের তুলনামুলক আলোচনার উপর পাচটি বই কিনলাম। বইগুলো পড়ার পর আমার আত্না যেন আরও অশান্ত হয়ে উঠল। সত্যটা আমাকে জানতে হবে। আবদুল্লাহ আল আমর আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে একদিন সেখানকার ইসলামিক সেন্টারে নিয়ে গেলেন এবং ওখান থেকেও বইপত্র নিয়ে পড়তে বললেন, যদি আমি আগ্রহী হই।           

কেনার জন্যে আমি বেশ কিছু বই হাতে নিলাম। দায়িত্বরত লোকটি বললেন: আপনি এসব বিনামুল্যেই নিতে পারবেন। কারন এ বইগুলো নন-মুসলিম, নতুন মুসলিমদেরকে ফ্রী দেয়া হয়। আমি এ বইগুলোও মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। এরমধ্যে এক সহকর্মী আমাকে আহমাদ দিদাত এর একটি ভিডিও ক্যাসেটও দিয়ে গেল। এ ভিডিওটি ছিল একটি প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠান। উত্তর দিচ্ছিলেন একজন খৃষ্টান ও ইসলামীক স্কলার। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম: খৃষ্টান বক্তাটি বহু জীবন জিজ্ঞাসার জওয়াব এড়িয়ে যাচ্ছেন, যা ছিল আমারও প্রশ্ন। বলা যায়, এখান থেকেই আমার আপন ধর্মীয় বিশ্বাসে চির ধরা শুরু হয়।

বলে নেয়া আবশ্যক, সৌদী আরবে চাকুরী শুরুর বছর খানেকের মধ্যেই আমি এক ফিলিপিনোর সাথে পরিচিত হই। সে ছিল মুসলিম। আমি একবার তার কাছে ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাইলে সে আমাকে ধর্মীয় তুলনামুলক কিছু বই এবং কুরআন পড়তে দেয়, যা ছিল ইংরেজীতে অনুবাদ করা। একটি ব্যাপার আমাকে খুব অবাক করতো, তাহলো: আমার এই স্বদেশী বন্ধু এবং আবদুল্লাহ আল আমর বা ইসলামীক সেন্টারের কেউই আমাকে কোনোদিন আমার খৃষ্টান ধর্ম বিশ্বাস পরিবর্তন করতে কোনো চাপ বা প্ররোচনা প্রদান করেনি। তবে সবারই একটি ভাব আমি লক্ষ্য করেছি, তা হচ্ছে, আমি যেন প্রকৃত সত্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করি। এ জিনিসটি আমার মনোরাজ্যে বিরাট প্রভাব ফেলে। আমাকে যদি চাপ প্রয়োগ করা হতো তাহলে হয়তো শুরুতেই আমি আমার আপন ধর্মবিশ্বাসে গো ধরে থাকতাম। 

ইতিমধ্যে সৌদী আরবে আমার দু’বৎসর পার হয়ে গেছে। এ দু’বৎসরে আমার পড়াশুনা আমাকে যে উপসংহারে পৌছতে বাধ্য করে তাহলো:

এক: যে বাইবেল আজ আমরা পড়ছি তা আসল রুপে নেই। যেসমস্ত কথা এ বাইবেলে দেখা যাচ্ছে তা বিশ্বস্রষ্টার বাণী হওয়া অসম্ভব। তাই এ ধর্ম আকড়ে ধরে থাকা জ্ঞান ও বিবেকবুদ্ধি বিরোধী কাজ।

দুই: জেসাস প্রভু বা গড নন। এক্ষেত্রে কুরআন যা বলছে, তা-ই প্রকৃত সত্যের অনেক কাছাকাছি।

তিন: এতো দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাবার পরও কুরআন অপরিবর্তিত। বিষয়টি সাধারণ নয়।

চার: কুরআন যদি স্রষ্টার বাণী না হবে তাহলে সেই অন্ধকারচ্ছন্ন যুগে এতে এতোসব বৈজ্ঞানিক তথ্যাবলীর সন্নিবেশ  কিভাবে ঘটলো।

কী যেন কিসের আকর্ষণে একদিন আমি আবারও সেই ইসলামীক সেন্টারে গিয়ে হাজির হলাম। ধর্মীয় একটা ক্লাশ তখন সেখানে চলছিল। ফিলিপিনোদের একটা গ্রুপকেও সেখানে দেখলাম। আমি তাদের সাথে বসে গেলাম। নবদীক্ষিত মুসলিম ফরিদ উকেনডো ছিলেন বক্তা। তার লেকচার আমাকে অভিভুত করে। আমি যেন তা-ই শুনলাম, যা আমার অস্থির অন্তর খুজে ফিরছিল। বোধকরি অনেকটা প্রায় নিজের অজান্তেই, আমি ফরিদ উকেনডোকে জিজ্ঞেস করে বসলাম: কিভাবে একজন খৃষ্টান মুসলিম হতে পারে?

ফরিদ বললেন: আপনি কি মুসলিম হতে চান? 

আমি বললাম: হ্যা। 

তিনি আমাকে আবারও বললেন: আপনি জেনে বুঝে এ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেনতো?

আমি বললাম: হ্যা, নিশ্চয়ই।

অত:পর ঐদিনই ওখানে শাহাদা পাঠ করে আমি মুসলিম হই। 

শাহাদা পাঠের পর ভাই ফরিদ আমাকে জিজ্ঞেস করেন, কী ইসলামী নাম আমি পছন্দ করবো। আমি মনে মনে একজনকে খোজ করছিলাম, কিন্তু তার নাম জানতামনা। তিনি ঐ সেন্টারেরই একজন শিক্ষক ছিলেন। আমি ঠিক করলাম, তার যে নাম আমিও সে নামই গ্রহণ করবো। কারন ঐ লোকটির মুগ্ধকর চরিত্র ও লেকচারই আমাকে ইসলামে আসার পথে সহায়ক হয়েছে বেশী। লোকেরা বললো: ঐ শিক্ষকের নামতো সালেহ। 

আমি বললাম: তাহলে সালেহ নামটিই আমি আমার নিজের জন্য নিবাচন করছি”। 

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4 (টি রেটিং)