যুক্তির নিরিখে কুরআন – আট

কুরআন থেকে হেদায়াত পেতে চাইলে এর পাঠককে আরও যা হ্রদয়ংগম করা জরুরী তা হচ্ছে: আল্লাহ যদি মানবকুলের বাসনা পূরণার্থে দুনিয়াতেই পাপীর শাস্তি এবং পূণ্যবানের পুরস্কারের ব্যব্স্থা করেন তাহলে কে সত্যপথ অবলম্বন করে আছে, আর কে ভ্রান্তপথ – তা সুস্পষ্ট হয়ে যায় বটে, কিন্তু এটি করলে পরীক্ষা অনুষ্ঠানের (যে জন্য আল্লাহ এ পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন) কোন মূল্য থাকেনা। কুরআনের বক্তব্যও অর্থহীন প্রমাণীত হয়।

আরও যে চির সত্যটি তাকে অনুধাবন করতে হবে তা হচ্ছে:

এ দুনিয়া প্রাচীন রোমান সম্রাটদের রংগভূমির মতো কোনো coliseum  বা এ জাতীয় কিছু নয়। সত্য ও মিথ্যার মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধিয়ে, মানুষকে পরস্পরের মধ্যে লড়াই করিয়ে আনন্দে অট্রহাসি হাসার জন্য এ ভুবন সৃজিত হয়নি। বরং আল্লাহ এখানে মানুষ সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষার নিমিত্ত। এটা দেখার জন্য যে, কে কেমন কাজ করে।

যেমন, তিনি বলেছেন: “তিনিই সেই সত্তা, যিনি জন্ম এবং মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন, এটা পরীক্ষা করার জন্য যে, কার কর্ম ভাল” (সুরা আল মুলক ১-২)।

“লোকেরা কি মনে করে নিয়েছে ‘আমরা ইমান এনেছি’ কেবলমাত্র এটুকু বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে, আর পরীক্ষা করা হবেনা”? (সুরা আল আনকাবুত ২)

আবার কোথাও বলা হয়েছে, “আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করবো, কখনো ভয়-ভীতি, কখনো ক্ষুধা-অনাহার, কখনো জান মাল, কখনোবা ফল-ফসলাদির ক্ষতির মাধ্যমে ......” (সুরা আল বাকারা ১৫৫)।

কোথাও বলা হয়েছে: “প্রতিটি জীবকেই মরণের স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, আর (হে মানুষ), আমি তোমাদেরকে ভালো এবং মন্দ এ উভয় অবস্থায় ফেলে পরীক্ষা করবো .....” (সুরা আল-আম্বীয় ৩৫)।  

আপনি যদি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাক্কী জীবন গভীর মনোনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করেন, তাহলে মানবজাতীর পরীক্ষাপবের এ ব্যাপারটি সম্পর্কে একটি ধারণা পেয়ে যাবেন। যেমন, আল্লাহ চাইলে তখন আকাশ থেকে ঘোষণা দিতে পারতেন: হে মানবমন্ডলী, কী সত্য, আর কী মিথ্যা, কারা ভ্রান্তপথে চলছে, আর কারা সঠিক পথে তা দেখিয়ে দেবার জন্যে আমি আমার এ রাসুলকে পাঠিয়েছি। তোমাদেরকে ৩ দিন সময় দেয়া হলো – এ রাসুলের আহবান তোমরা মেনে নাও, তার আনুগত্য করো। ৩ দিন পর যেখানে যত অবাধ্য ও বিদ্রোহী আদম সন্তান পাওয়া যাবে তাদের সকলেরই রুহ কবজ করে জাহান্নামে পাঠানো হবে ......।

অথবা তিনি তার রাসুলের সাথে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন কতক মালাইকা দিতে পারতেন, যারা অবাধ্য লোকদের দফারফা করতো ।

কিংবা অন্য কোন পন্থা আল্লাহ অবলম্বন করতে পারতেন যেখানে ত্যাগ-তিতিক্ষা, দু:খ বেদনা আর যুদ্ধের কোন প্রয়োজন বা প্রশ্নই উঠতোনা।

এভাবে, আপন কুদরত মোতাবেক কোন একটি মুজেযা (Miracle) ঘটিয়ে তিন চার দিনের ব্যবধানেই মাক্কা বা মাদিনাতে একটি ইসলামী রাষ্ট্র আল্লাহ প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। 

কিন্তু তিনি তা করলেননা। কোন মিরাকল বা এজাতীয় কোন পন্থা সেখানে অবলম্বন করা হলোনা। সকলের অগোচরে তিনি তার রাসুলের নিকট অহী পাঠালেন। মানুষ তাকে অবিশ্বাস করতে শুরু করলো, মুষ্টিমেয় কতক লোক ছাড়া। অবিশ্বাসীরা বললো: অবশেষে চল্লিশ বছর বয়সে আল আমীন পাগল হয়ে গিয়েছে/তাকে জিনে ধরেছে/কোনও জিন তার কাছে এ কালাম নিয়ে আসে . . .। আবার কেউবা বললো: মাক্কায় এতো গন্য মান্য নেতৃবৃন্দ থাকতে মুহাম্মাদের মত লোককে আল্লাহ নাবী করে পাঠিয়েছেন? এটি অসম্ভব....। আরও কত কি।

এখানেই শেষ নয়।।। এ নাবীর যারা অনুসারী হলো তাদের উপর অত্যাচার নিযাতনের পাহাড় ভেংগে পড়লো। রক্ত ঝরানো হলো। জীবন বাচাতে অনেকে দেশত্যাগ করলেন।  

এসকল কিছুর পশ্চাতে কারন মাত্র একটি। তা হচ্ছে – মানবজাতীর পরীক্ষা।  

প্রশ্ন উঠতে পারে, আল্লাহ তো কাফিরদের কুফরি আর ইমানদারদের ইমান সম্পর্কে অবগত, এ অবগতির ভিত্তিতেই তো তিনি শাস্তি দিতে পারবেন, পরীক্ষা করে আবার তা জানার প্রয়োজন কেন৷ এর জওয়াব হচ্ছে, যতক্ষণ এক ব্যক্তির মধ্যে কোন জিনিসের কেবলমাত্র যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতাই থাকে, কাযত তার প্রকাশ হয় না, ততক্ষণ ইনসাফ ও ন্যায়নীতির দৃষ্টিতে সে কোন পুরস্কার বা শাস্তির অধিকারী হতে পারে না। যেমন এক ব্যক্তির মধ্যে আমানতদার হবার যোগ্যতা আছে এবং অন্যজনের মধ্যে যোগ্যতা আছে আত্মসাৎ করার। এরা দু'জন যতক্ষণ না পরীক্ষার সম্মুখীন হয় এবং একজনের থেকে আমানতদারী এবং অন্যজনের থেকে আত্মসাতের প্রকাশ না ঘটে ততক্ষণ নিছক নিজের অদৃশ্য জ্ঞানের ভিত্তিতে আল্লাহ একজনকে আমানতদারীর পুরস্কার দিয়ে দেবেন এবং অন্যজনকে আত্মসাতের শাস্তি দিয়ে দেবেন, এটা তার ইনসাফের বিরোধী। অমুক ব্যক্তির মধ্যে চুরির প্রবণতা আছে, সে চুরি করবে অথবা করতে যাচ্ছে, এ ধরনের জ্ঞানের ভিত্তিতে আল্লাহ শাস্তি বিধান করবেননা। বরং সে চুরি করেছে - এ প্রমাণের ভিত্তিতে তিনি বিচার করবেন। এভাবে অমুক ব্যক্তি উন্নত পযায়ের মু'মিন ও মুজাহিদ হতে পারে অথবা হবে এ জ্ঞানের ভিত্তিতে আল্লাহ তার ওপর অনুগ্রহ ও নিয়ামত বর্ষণ করেন না বরং অমুক ব্যক্তি নিজের কাজের মাধ্যমে তার সাচ্চা ঈমানদার হবার কথা প্রমাণ করে দিয়েছে, আল্লাহর পথে চেষ্ঠা, সাধনা করে দেখিয়ে দিয়েছে - এরি ভিত্তিতে তিনি পুরস্কার নির্ধারণ করবেন। 

কুরআন পাঠককে আরও জানতে হবে যে, এ কুরআনে রয়েছে দু’ধরণের আয়াত।

একটি ‘মুহকামাত’ এবং অপরটি ‘মুতাশাবিহাত’। (দ্রষ্টব্য: সুরা আলে ইমরান ৭) 

মুহকামাত আয়াত হচ্ছে ঐসকল আয়াত যেগুলোর ভাষা সুস্পষ্ট, অর্থ নির্ধারণে যেখানে কোন প্রকার সংশয়-সন্দেহের অবকাশ নেই, যা দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য উপস্থাপন করে এবং যেগুলোর অর্থ বিকৃত করার সুযোগ কম। মুহকামাত এ আয়াতগুলো হচ্ছে 'কিতাবের আসল বুনিয়াদ' । অর্থাৎ যে উদ্দেশ্যে কুরআন নাযিল করা হয়েছে এ আয়াতগুলো সেই উদ্দেশ্য পূর্ণ করে। এ আয়াতগুলোর মাধ্যমে দুনিয়াবাসীকে ইসলামের দিকে আহবান জানানো হয়েছে। এগুলোতেই শিক্ষা ও উপদেশের কথা বর্ণিত হয়েছে। ভ্রষ্টতার গলদ তুলে ধরে সত্য-সঠিক পথের চেহারা সুস্পষ্ট করা হয়েছে। দ্বীনের মূলনীতি এবং আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদাত, চরিত্রনীতি, দায়িত্ব-কর্তব্য ও আদেশ-নিষেধের বিধান এ আয়াতগুলোতেই বর্ণিত হয়েছে। কাজেই কোন সত্যানুসন্ধানী ব্যক্তি কোন্ পথে চলবে এবং কোন পথে চলবেনা, একথা জানার জন্য যখন কুরআনের স্মরণাপন্ন হয় তখন এ মুহকামাত আয়াতগুলোই তার পথ প্রদর্শন করে।

'মুতাশাবিহাত' হচ্ছে ঐসকল আয়াত যেগুলোর অর্থ গ্রহণে সন্দেহ-সংশয়ের ও বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে দেবার অবকাশ রয়েছে। এসব আয়াতের প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য কেবলমাত্র আল্লাহ তায়ালাই অবগত। এর তাফসীর বা অর্থ অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হওয়া মোটেই বৈধ নয়, এ কাজ যারা করে তাদের সম্পর্কেই আল্লাহ বলেছেন যে “ ... যাদের মনে বক্রতা আছে তারা ফিতনা সৃষ্টির উদ্দ্যেশে সবসময় মুতাশাবিহাতের পিছনে লেগে থাকে এবং তার অর্থ করার চেষ্টা করে। অথচ সেগুলোর আসল অর্থ আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেনা”।   

ঋণ স্বীকার: তাফহীমুল কুরআন

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None