দায়ী ইলাল্লাহর গুনাবলী। পর্ব ৫ (সংশোধিত)

৫- জিহবার নিয়ন্ত্রণ
মানবদেহের এই অতি সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপুর্ণ অংগটি নিয়ে বহু প্রবাদ, কথা, ও কাহিনী রয়েছে প্রাচীন আরবী সাহিত্যে। যার কতক হচ্ছে এরকম:
اجتمع قيس بن ساعدة وأكثم بن صيفي ، فقال أحدهما لصاحبه: كم وجدت في ابن آدم من العيوب؟ قال : هي أكثر من أن تحصى، وقد وجدت خصلة إن استعملها الإنسان سترت عيوبه. فقال ما هي؟ قال: حفظ اللسان.

"কাইস ইবনু সায়িদাহ এবং আকছাম ইবনু ছইফি (প্রাচীন আরব পন্ডিত) একদিন এক বৈঠকে একে অপরকে সুধালেন: আদম সন্তানদের দোষ ত্রুটির সংখ্যা কত হতে পারে বলে তুমি মনে কর?
ওহ‍! এর সংখ্যা এত যে, শুমার করা মুশকিল। তবে একটি গুণ তাদেরকে প্রদান করা হয়েছে। যদি তা আদম সন্তানেরা প্রয়োগ করে তাহলে তার সমুদয় দোষ ত্রুটি ঢাকা পড়ে যাবে।
কি সেটি?
জিহবার নিয়ন্ত্রণ।

জিহবা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
"এমন কোন শব্দ তার মুখ থেকে বের হয় না যা সংরক্ষিত করার জন্য একজন সদা প্রস্তুত রক্ষক উপস্থিত থাকে না৷" (সুরা ক্কাফ 18)
অর্থাৎ এক দিকে আল্লাহ নিজে সরাসরি মানুষের প্রতিটি গতিবিধি এবং চিন্তা ও কল্পনা সম্পর্কে অবহিত । অপর দিকে প্রত্যেক মানুষের জন্য দু'জন করে ফেরেশতা নিয়োজিত আছে যারা তার প্রত্যেকেটি তৎপরতা লিপিবদ্ধ করছে । তার কোন কাজও কথাই তাদের রেকর্ড থেকে বাদ পড়ে না । অর্থাৎ আল্লাহর আদালতে যে সময় মানুষকে পেশ করা হবে তখন কে কি করে এসেছে সে বিষয়ে আল্লাহ নিজ থেকেই অবহিত থাকবেন । তাছাড়া সে বিষয়ে সাক্ষ দেয়ার জন্য এমন দুজন সাক্ষীও উপস্থিত থাকবেন যারা তার কাজ-কর্মের লিখিত নথিভুক্ত প্রমাণাদি এনে সামনে পেশ করবেন । লিখিত এ প্রমাণাদি কেমন ধরনের হবে তার সঠিক ধারণা করা আমাদের জন্য কঠিন । তবে আজ আমাদের সামনে যেসব সত্য উদঘটিত হচ্ছে তা দেখে এ বিষয়টি একেবারে নিশ্চিত মনে হয় যে, যে পরিবেশে মানুষ অবস্থান ও কাজ-কর্ম করে তাতে চতুর্দিকের প্রতিটি অণু-পরমাণুর ওপর তার কণ্ঠস্বর, ছবি ও গতিবিধির ছাপ পড়ে যাচ্ছে । এসব জিনিসের প্রত্যেকটিকে পুনরায় হুবহু সেই আকার -আকৃতি ও স্বরে এমনভাবে পেশ করা যেতে পারে যে, আসল ও নকলের মধ্যে সামান্যমত পার্থক্যও থাকবে না । মানুষ যন্ত্রপাতির সাহায্যে এ কাজটি অত্যন্ত সীমিত মাত্রায় করছে । কিন্তু আল্লাহর ফেরেশতারা এসব যন্ত্রপাতিরও মুখাপেক্ষী নয়, এসব প্রতিবন্ধকতায়ও আবদ্ধ নয় । মানুষের নিজ দেহ এবং তার চারপাশের প্রতিটি জিনিস তাদের জন্য টেপ ও ফিল্ম স্বরূপ । তারা এসব টেপ ও ফিল্মের ওপর প্রতিটি শব্দ এবং প্রতিটি ছবি অতি সুক্ষ্ম ও খুঁটিনটি বিষয়সহ অবিকল ধারণ করতে পারে এবং পৃথিবীতে ব্যক্তি যেসব কাজ করতো কিয়ামতের দিন তাকে তার নিজ কানে নিজ কণ্ঠস্বরে সেসব কথা শুনিয়ে দিতে পারে, নিজ চোখে তার সকল কর্মকাণ্ডের এমন জ্বলজ্যান্ত ছবি তাকে দেখিয়ে দিতে পারে যা অস্বীকার করা তার জন্য সম্ভব হবে না । এখানে একথাটিও ভালভাবে বুঝে নেয়া দরকার যে, আল্লাহ তা'আলা আখেরাতের আদালতে কোন ব্যক্তিকে কেবল নিজের ব্যক্তিগত জ্ঞানের ভিত্তিতে শাস্তি প্রদান করবেন না, বরং ন্যায় বিচারের সমস্ত পূর্বশর্ত পূরণ করে তাকে শাস্তি প্রদান করবেন । এ কারণে দুনিয়াতেই প্রত্যেক ব্যক্তির সমস্ত কথা ও কাজের পূর্ণাংগ রেকর্ড তৈরী করা হচ্ছে যাতে অনস্বীকার্য সাক্ষের ভিত্তিতে তার সমস্ত কর্মকাণ্ডের প্রমাণাদি পেশ করা যায় (সুরা ক্কাফ 18 আয়াতের এ ব্যাখাটি সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী রাহিমাহুল্লাহ প্রণীত তাফহীমুল কুরআন থেকে নেয়া)

জিহবা সম্পর্কে রয়েছে বহু ভীতিজনক ও হ্রদয় স্পর্শকারী হাদিস।
রাসুল সা: বলেছেন: ''কিয়ামাতের দিন মানুষের কাছে উন্মুক্ত আমলনামা নিয়ে আসা হবে। (সে তা পড়বে) সে বলবে, হে আমার প্রভু আমি দুনিয়াতে অমুক অমুক নেক কাজ করেছিলাম কিন্তু তা এতে লিখা নেই। তখন আল্লাহ বলবেন: মানুষের গীবাত করে তোমার আমলনামা থেকে ঐ নেকী তুমি মুছে দিয়েছ। (বর্ণনাকারী আবু উমামা রা: - তারগীব ও তারহীব)

হাদিসে আরও এসেছে:
'' যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মাঝখানে যা আছে তার (অর্থাত জিহবা) এবং দুই পায়ের মাঝখানে যা আছে তার (যৌনাংগ) জামিন হতে পারবে আমি তার জন্য জান্নাতের জামিন হব''। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

আর একটি হাদিসে এসেছে:
"আদম সন্তানেরা যেসমস্ত বাক্যাবলী উচ্চারণ করে তার সমুদয় দায়ীত্ব তার। হাশর দিবসে তার কৈফিয়ত সে এক এক করে দেবে। তবে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত কথাবার্তা এবং আল্লাহর তাসবীহ ছাড়া।" (বর্ণনাকারী উম্মু হাবিবা রাদিয়াল্লাহু আনহা) 

এ জিহবার অপপ্রয়োগের কারনেই মানুষে মানুষে হানাহানি, ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ, স্বামী স্ত্রীতে বিচ্ছেদ ঘটে। পৃথিবীর ইতিহাস বলে, মানুষ আগমনের শুরু থেকে এখানে স্বামী স্ত্রীতে যত তালাক সংঘঠিত হয়েছে তার প্রায় অর্ধেকের পেছনে কার্যকর ছিল এই অঘটন ঘটনের নায়ক জিহবা। কথায় বলে: ''বল্লমের ঘা শুকায় কিন্তু জিহবার ঘা শুকায়না''। হাজারো ত্যাগ, হাজারো উপকার মুখের একটি তিক্ত কথায় এক নিমেষে শেষ হয়ে যায়। 1914 এবং 1939 সালে যে বড় বড় দুটি বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গেল তার প্রাথমিক কারনও ছিল এ জিহবা অর্থাত অসংযত বাক।

এ জিহবা দিয়ে মানুষ খোটা দেয় আর সকল নেক কাজকে ধ্বংস করে ফেলে। আল্লাহ বলেন:
হে ঈমানদারগণ!তোমরা অনুগ্রহের কথা বলে বেড়িয়ে ও কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান খয়রাতকে সেই ব্যক্তির মতো নষ্ট করে দিয়ো না যে নিছক লোক দেখাবার জন্য নিজের ধন-সম্পদ ব্যয় করে – (সুরা আল বাকারা 264)।
এ জিহবার গোনাহ এত, যে, তা লিখতে গেলে ভলিউম ভলিউম বই হবে।
আবার এ জিহবাই আদম সন্তানকে জান্নাতের পাথেয় সঞ্চয়ে সহায়তা করে। এ জিহবা দিয়ে সে সত্যের সাক্ষ্য দেয়, সত্যকে মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠত করে। করে আল্লাহর তাসবীহ। ঘোষণা করে আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্বের। আল্লাহর খলিফা হিসেবে যে দায়ীত্ব নিয়ে সে এ ধরায় এসেছে এ জিহবাই তাকে সে দায়ীত্ব ও কর্তব্য পালনে সহায়তা করে।
অতএব এটা অনুমিত যে, এ জিহবা একটি শক্তি। এ জিহবা একটি আমানাত। যে দায়ী ইলাল্লাহ এ  শক্তি   ও আমানাতের যথাযথ প্রয়োগ ও হেফাজত করেন তিনি তত কামিয়াব।
 
চলবে।

  

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3.3 (3টি রেটিং)

কিছু আরবী আসেনি। মন্তব্যে দেয়ার চেষ্টা করুন।
জাযাকাল্লাহ্ খায়ের।

শেষ?

বিসর্গ ব্লগে ধর্মীয় লেখালেখি একটু বেশী দেখা যায়।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3.3 (3টি রেটিং)