"তাকওয়া-ই আল্লাহর নিকটতম করে"

আমরা সাধারনত ভালো কাজগুলো করি আল্লাহকে খুশি করতে ও আমাদের চিরমুক্তির লক্ষে। কিন্তু আমাদের সব কাজে কি আমরা তা বাস্তবায়ন করতে পারি? পারিনা। কারন একটি বিষয়ে আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করি তাকওয়া অবলম্বন করি আবার আরেক কাজে তা পারিনা। এটা হরহামেশা হয়েই থাকে। তাই আমাদের নিজেকে আগে তাকওয়াবান হতে হবে তারপর আল্লাহর কাছে কল্যাণের আশা করতে হবে। আমাদের জীবনের প্রত্যেকটা কাজে আল্লাহর ভয় থাকতে হবে শুধুমাত্র ভয় থাকলেই চলবেনা আল্লাহর ভয়ে নিজেকে সবরকম গুনাহ থেকে বিরত রাখতে হবে। নিজেকে আগে গুনাহ থেকে পবিত্র রাখতে পারলেই আল্লাহর কাছে ক্ষমার পাবারও আশা করতে পারবো। তাই তাকওয়া বিষয়ে আমাদেরকে জানতে হবে। নিজে মানতে হবে ও অন্যকে জানাতে হবে ও মানারো জন্য উৎসাহ দিতে হবে। আমরা জেনে নেই তাকওয়ার বিষয়গুলো। মহান আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের সকলকে তাকওয়ার পথে পরিচালিত করুন ও প্রতিষ্ঠিত রাখুন।

১. কোরআনের হেদায়াত পেতে হলে তাকওয়া প্রয়োজন। (সুরা বাকারা-২)
*ذَلِكَ الْكِتَابُ لاَ رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ
এ সেই কিতাব যাতে কোনই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য।

২. তাকওয়া ব্যতীত ইবাদাত কবুল হয়না। (সুরা হজ্ব-৩৭)
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ*
এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া।

৩. তাকওয়া সত্য মিথ্যার পার্থক্যের মানদন্ডের ব্যবস্থা করে। (সুরা আনফাল-২৯)
يٰۤاَيُّهَا الَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنۡ تَتَّقُوۡا اللّٰهَ يَجۡعَل لَّكُمۡ فُرۡقَانًا وَّيُكَفِّرۡ عَنۡكُمۡ سَيِّاٰتِكُمۡ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ‌ؕ وَاللّٰهُ ذُوۡ الۡفَضۡلِ الۡعَظِيۡمِ*
হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করার পথ অবলম্বন করো তাহলে আল্লাহ তোমাদের কষ্টিপাথর দান করবেন এবং তোমাদের পাপগুলো তোমাদের থেকে দূর করে দেবেন এবং তোমাদের ত্রুটি -বিচ্যুতি ক্ষমা করবেন৷ আল্লাহ অতিশয় অনুগ্রহশীল৷  

৪.তাকওয়া পৃথিবীর সমস্ত নাজ-নেয়ামতের চেয়েও মহামূল্যবান। (সুরা আলে ইমরান-১৫)
قُلْ أَؤُنَبِّئُكُم بِخَيْرٍ مِّن ذَٰلِكُمْ ۚ لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجٌ مُّطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ
বলো, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেবো, ওগুলোর চাইতে ভালো জিনিস কি? যারা তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করে তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে বাগান, তার নিম্নদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হয়৷ সেখানে তারা চিরন্তন জীবন লাভ করবে৷ পবিত্র স্ত্রীরা হবে তাদের সংগিনী এবং তারা লাভ করবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ৷ আল্লাহ তার বান্দাদের কর্মনীতির ওপর গভীর ও প্রখর দৃষ্টি রাখেন।

৫. তাকওয়া মহান আল্লাহর নিকট বান্দার একমাত্র মর্যাদার মাপকাঠি। (সুরা হুজরাত-১৩)
اِنَّ اَكۡرَمَكُمۡ عِنۡدَ اللّٰهِ اَتۡقٰٮكُمۡ‌ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَلِيۡمٌ خَبِيۡرٌ‏
তোমাদের মধ্যে যে অধিক পরহেজগার সে-ই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদার অধিকারী৷

৬. তাকওয়া দুনিয়া ও আখেরাতের সমস্ত নেয়ামতের দরজা খুলে দেয়। (সুরা আরাফ-৯৬)
وَلَوۡ اَنَّ اَهۡلَ الۡقُرٰٓى اٰمَنُوۡا وَاتَّقَوۡا لَفَتَحۡنَا عَلَيۡهِمۡ بَرَكٰتٍ مِّنَ السَّمَآءِ وَالۡاَرۡضِ وَلٰكِنۡ كَذَّبُوۡا فَاَخَذۡنٰهُمۡ بِمَا كَانُوۡا يَكۡسِبُوۡنَ‏
যদি জনপদের লোকেরা ঈমান আনতো এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করতো, তাহলে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর রবকত সমূহের দুয়ার খুলে দিতাম৷ কিন্তু তারা তো প্রত্যাখ্যান করেছে৷ কাজেই তারা যে অসৎকাজ করে যাচ্ছিলো তার জন্যে আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি৷  

৭. তাকওয়াধারীদেরকে আল্লাহ অগনিত রিযিক প্রদান করেন। (সুরা তালাক-৩)
وَّيَرۡزُقۡهُ مِنۡ حَيۡثُ لَا يَحۡتَسِبُ‌ؕ وَمَنۡ يَّتَوَكَّلۡ عَلَى اللّٰهِ فَهُوَ حَسۡبُهٗؕ اِنَّ اللّٰهَ بَالِغُ اَمۡرِهٖ‌ؕ قَدۡ جَعَلَ اللّٰهُ لِكُلِّ شَىۡءٍ قَدۡرًا
এবং এমন পন্থায় তাকে রিযিক দেবেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না৷ যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর নির্ভর করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট৷ আল্লাহ তাঁর কাজ সম্পূর্ণ করে থাকেন৷ আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের জন্য একটা মাত্রা ঠিক করে রেখেছেন৷
৮. তাকওয়া অবলম্বনকারিদের সকল সমস্যা মহান আল্লাহ দূর করে দেন। (সুরা তালাক-২)
وَمَنۡ يَّتَّقِ اللّٰهَ يَجۡعَل لَّهٗ مَخۡرَجًاۙ‏
যে ব্যক্তিই আল্লাহকে ভয় করে চলবে আল্লাহ তার জন্য কঠিন অবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় সৃষ্টি করে দেবেন৷

৯. তাকওয়া অবলম্বনকারিদের সকল কাজকে আল্লাহ সহজ করে দেন। (সুরা তালাক-৪)
وَمَنۡ يَّتَّقِ اللّٰهَ يَجۡعَل لَّهٗ مِنۡ اَمۡرِهٖ يُسۡرًا‏
যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার কাজ সহজসাধ্য করে দেন৷
১০. তাকওয়াবানদের গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হবে। (সুরা তালাক-৫)
وَمَنۡ يَّتَّقِ اللّٰهَ يُكَفِّرۡ عَنۡهُ سَيِّاٰتِهٖ وَيُعۡظِمۡ لَهٗۤ اَجۡرًا‏
যে আল্লাহকে ভয় করবে আল্লাহ তার গোনাহসমূহ মুছে ফেলবেন এবং তাকে বড় পুরষ্কার দেবেন৷

১১. তাকওয়া অবলম্বনকারিদেরকেই আল্লাহ ভালো বাসেন এবং তাদের সাথেই থাকেন। (সুরা তাওবা-৪, বাকারা-২৯৪)
اِنَّ اللّٰهَ يُحِبُّ الۡمُتَّقِيۡنَ
কারণ আল্লাহ তাকওয়া তথা সংযম অবলম্বকারীদেরকে পছন্দ করেন৷

১২. তাকওয়া অবলম্বনকারিদের জন্যই জান্নাত তৈরী করা হয়েছে। (সুরা ইমরান-১৩৩)
﴿وَسَارِعُوا إِلَىٰ مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ﴾
দৌড়ে চলো তোমাদের রবের ক্ষমার পথে এবং সেই পথে যা পৃথিবী ও আকাশের সমান প্রশস্ত জান্নাতের দিকে চলে গেছে, যা এমন সব আল্লাহভীরু লোকদের জন্য তৈরী করা হয়েছে,

হে আল্লাহ! আমাদের সবাইকে এই তাকওয়ার মাসে মুত্তাকী হিসেবে কবুল কর। আমিন!

এক মুসলিম তার অপর মুসলিম ভাইয়ের সাথে কথা না বলে থাকার শাস্তি সম্পর্কিত হাদীস গুলোঃ-

১. আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘তোমরা পরষ্পর সম্পর্ক-ছেদ করো না, একে অপরের বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন হয়ো না, পরষ্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করো না, পরষ্পর হিংসা করো না। তোমরা আল্লাহর বান্দা, ভাই ভাই হয়ে যাও। কোন মুসলিমের জন্য এটা বৈধ নয় যে, সে তার ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি কথাবার্তা বলা বন্ধ রাখবে।’’(বুখারী ও মুসলিম)

২. আবূ আইয়ূব রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘কোন মুসলিমের জন্য এটা বৈধ নয় যে, সে তার ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি কথাবার্তা বলা বন্ধ রাখে। যখন তারা পরস্পর সাক্ষাৎ করে, তখন এ এ দিকে মুখ ফিরায় এবং ও ওদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর তাদের দু’জনের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি সেই হবে, যে সাক্ষাৎকালে প্রথমে সালাম পেশ করবে।’’
(বুখারী ও মুসলিম)
৩. আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘প্রত্যেক সোম ও বৃহস্পতিবার আমল সমূহ পেশ করা হয়। সুতরাং প্রত্যেক সেই বান্দাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়, যে আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে অংশীদার স্থাপন করেনি। তবে সেই ব্যক্তিকে নয়, যার সাথে তার অন্য মুসলিম ভাইয়ের শত্রুতা থাকে। [তাদের সম্পর্কে] বলা হয়, এদের দু’জনকে সন্ধি করা পর্যন্ত অবকাশ দাও।’’(মুসলিম)

৪. আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘কোন মুসলিমের জন্য এ কাজ বৈধ নয় যে, তার কোন মুসলিম ভাইয়ের সাথে তিন দিনের ঊর্ধ্বে কথাবার্তা বন্ধ রাখবে। সুতরাং যে ব্যক্তি তিন দিনের ঊর্ধ্বে কথাবার্তা বন্ধ রাখবে এবং সেই অবস্থায় মারা যাবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’’ (আবূ দাঊদ বুখারী-মুসলিমের শর্তাধীন সূত্রে)

৫. আবূ খিরাশ হাদরাদ ইবনে আবূ হাদরাদ আসলামী, মতান্তরে সুলামী সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন যে, ‘‘যে ব্যক্তি তার কোন (মুসলিম) ভাইয়ের সঙ্গে বছরব্যাপী বাক্যালাপ বন্ধ করবে, তা হবে তার রক্তপাত ঘটানোর মত।’(আবূ দাঊদ বিশুদ্ধ সূত্রে)

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

সালাম 

5 নম্বর তথ্য জানা ছিল না । যাজাকিললাহ খায়ের ।

তাকওয়া অর্থ সতর্কতা, সচেতনতা। অতএব, আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানি থেকে বাঁচতে প্রয়োজন সার্বক্ষণিক সতর্কতা ও সচেতনতা। সদাসর্বদা সাবধান ও সজাগ থাকতে পারলেই কেবল আল্লাহর দ্বীন ও নৈতিকতার প্রতি অটল অবিচল থাকা সম্ভব। চলার পথে পিচ্ছিল জায়গা দিয়ে হাটতে গেলে যেমন সাবধানে চলতে হয়, তেমনি জীবন চলার পথে পদস্খলন থেকে বাঁচার জন্যও সর্বদা সাবধানতা বজায় রাখতে হয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে তাকওয়া অর্থ হল আল্লাহর ইচ্ছার জন্য নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দেয়া, নিজের ইচ্ছার উপরে আল্লাহর ইচ্ছাকে অগ্রাধিকার দেয়া।
তাকওয়া শব্দের সবচেয়ে উপযুক্ত (appropriate) বাংলা প্রতিশব্দ হল "মান্য করা"। কারণ, এ শব্দের দ্বারা আদেশ পালন করা, সমীহ করা, ভক্তি করা সবই বুঝায়।  সম্মান ও আনুগত্যকেন্দ্রিক যে ভয়, তাই তাকওয়া।
তাকওয়া সহজে বোঝানো যায় একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে:- একজন ডায়াবেটিস রোগীর মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু তিনি তা স্পর্শ করছেন না। এখানে ক্ষতির ভয়ে অর্থাত রোগ বৃদ্ধির ভয়ে তিনি নিজের চাহিদা ও কামনাকে দমন করছেন। ঠিক তেমনি আল্লাহর ভয়ে মানুষ যখন কোন নিষিদ্ধ তথা পাপ কাজের দিকে ইচ্ছা বা আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও তা থেকে বিরত থাকে, তাই তাকওয়া।
এক্ষেত্রে আল্লাহর ভয় আবার দুই রকম হতে পারে:- আল্লাহর আযাবের ভয়; আর আল্লাহর মর্যাদা ও ব্যক্তিত্বের প্রতি সমীহ এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হবার ভয়। আল্লাহর আযাবের ভয় বলতে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত সম্ভাব্য পার্থিব শাস্তির ভয়ও হতে পারে, আবার পারলৌকিক শাস্তির ভয়ও হতে পারে। কারণ, আল্লাহ মানুষের পাপের কারণে পরকালে যেমন শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন, তেমনি দুনিয়াতেও নানাভাবে শাস্তি দিয়ে থাকতে পারেন। আর আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা, সম্ভ্রমবোধ এবং আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতার কারণে যখন আল্লাহর হুকুম অমান্য করার প্রবণতা রোধ করা হয়, তখন সেটা হয় উঁচু স্তরের তাকওয়া। এ স্তরের মুত্তাকী ব্যক্তি নিছক নিজে আযাব-গযব বা বিপদে পড়ার ভয়ে নয়, বরং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের মানসিকতা থেকেই আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলে।
আযাবের ভয়ে যে তাকওয়া, সেটা হল minimum requirement, যেটি না হলেই নয়। আর আল্লাহ তাআলার সম্মান ও মর্যাদার দিকে দৃষ্টি দিয়ে এবং আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহের কথা চিন্তা করে ন্যায়নীতি ও বিবেকের তাড়নায় যে তাকওয়া করা হয়, সেটা হল আরো উন্নত স্তরের তাকওয়া।
তাকওয়ার দুটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায় হল যেসব কাজে আল্লাহর অসন্তুষ্টি হয় সেগুলো পরিত্যাগ করা। যেমন- চুরি-ডাকাতি, যেনা-ব্যভিচার, জুলুম-দুর্ব্যবহার ইত্যাদি।
আর তাকওয়ার দ্বিতীয় পর্যায় হল, যেসব কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল হয় না বা যেসব কাজ থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের কোন সম্ভাবনা নেই, সেসব কাজ বর্জন করা। যেমন- দ্বীনী বা দুনিয়াবি কোন প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ জরুরী জ্ঞানার্জন ছাড়া নিছক সার্টিফিকেট ও নাম-যশ-সুনাম অর্জনের জন্য যে লেখাপড়া ও চেষ্টা-সাধনা করা হয়।
প্রথম পর্যায়ের তাকওয়া হচ্ছে সকলের জন্য অপরিহার্য ও ফরয, এ নিয়ে কারো কোন দ্বিমত নেই। আর দ্বিতীয় পর্যায়ে তাকওয়া রক্ষা করে চলতে পারলেই উত্তম।
প্রথম পর্যায়ের তাকওয়া অবলম্বনকারী ব্যক্তি শুধু আল্লাহ কর্তৃক হারাম ঘোষিত ও সুনিশ্চিতভাবে আল্লাহর অসন্তুষ্টি উদ্রেককারী বিষয় থেকেই নিজেকে বিরত রাখেন, কিন্তু জীবনের বাদবাকি কাজগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে কোন কাজে আসছে কিনা, জীবনের মূল্যবান সময়গুলো আল্লাহর আনুগত্যের পথে ব্যয়িত হচ্ছে কিনা, সে ব্যাপারে বেখবর থাকেন। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ের তাকওয়া অবলম্বনকারী ব্যক্তি সুস্পষ্ট হারামগুলো বর্জন করা এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেও মনোযোগী হন। তিনি নিজের জীবনের সকল কাজকর্মই যথাসম্ভব আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে করতে সচেষ্ট হন এবং প্রতিটি কাজ করার আগেই ভাবেন এর দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কাজটা হাসিল হবে কিনা। এটা করতে গিয়ে যে কাজগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে সহায়ক হবে না বলেই মনে হয় সেগুলো বাদ দিয়ে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে যেসব কাজ সহায়ক হবে সেগুলোতেই নিজেকে ব্যস্ত ও নিয়োজিত রাখেন।
এই দ্বিতীয় পর্যায়ের তাকওয়া আবার প্রথম পর্যায়ের তাকওয়াটি বজায় রাখার সহায়ক। প্রথম পর্যায়ের তাকওয়াটি নিরাপদ ও অটুট রাখতে হলে দ্বিতীয় পর্যায়ের তাকওয়াটিও অর্জন করে নেয়া ভাল। কারণ, দ্বিতীয় পর্যায়ের তাকওয়া সুরক্ষিত না থাকলে প্রথম পর্যায়ের তাকওয়াটিও অরক্ষিত হয়ে পড়তে পারে। হারাম বর্জনকে নিশ্চিত করতে হলে যেসব হালাল বস্তুও হারামের দরজা ও রাস্তা খুলে দিতে পারে সেসব হালালকেও পরহেয করে চলার প্রয়োজন হতে পারে। যেমন- চুরি করা, যেনা করা বা মানুষকে কষ্ট দেয়া হারাম। পক্ষান্তরে পরীক্ষায় ফার্স্ট হতে চাওয়াটা বা সন্তানকে ফার্স্ট বানাতে চাওয়াটা কোন হারাম কামনা নয়। কিন্তু এই দ্বিতীয় বিষয়টি অনেক সময় মানুষকে প্রথম বিষয়টিতে জড়িয়ে ফেলতে পারে। যেমন ধরুন, পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করার জন্য আপনাকে নকল করার বা কোন শিক্ষকের সাথে অবৈধ আর্থিক লেনদেন করার প্রয়োজন হল, যা মূলত একটি চুরি। কিংবা পরীক্ষায় নম্বর ভাল পাওয়ার জন্য বিপরীত লিঙ্গের কোন শিক্ষকের অনৈতিক বাসনা পূরণ করতে রাজি হতে হল, কিংবা বিপরীত লিঙ্গের কোন শিক্ষার্থী বন্ধুর কাছ থেকে নোট-সাজেশন বা ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সংগ্রহ করতে গিয়ে অবৈধ কাজে লিপ্ত হতে হল, অথবা বিপরীত লিঙ্গের কোন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হল। এছাড়া লেখাপড়ায় অতিরিক্ত ভাল করতে গিয়ে নিজের উপর অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক চাপ দেয়া, নিজের শরীরেরর ক্ষতি করা হয়- আর জরুরী কারণ বা প্রয়োজন ছাড়া নিজের ক্ষতি করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। আর যদি নিজের সন্তানকে পরীক্ষায় ফার্স্ট বানাতে গিয়ে তার উপর অতিরিক্ত চাপ দেয়া হয়, তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্টে ফেলা হয়, এমনকি মেজাজ খারাপ করে মৌখিক দুর্ব্যবহার ও শারীরিক শাস্তি প্রদান করা হয়, তাহলে তো এটা স্পষ্টতই জুলুম। আর বলাবাহুল্য, মানুষের উপর বিশেষত শিশুদের উপর জুলুম ও দুর্ব্যবহার করা ইসলামের দৃষ্টিতে সবচাইতে বড় হারাম ও গর্হিত কাজ।
অতএব, প্রথম পর্যায়ের তাকওয়া অবলম্বনকারী ব্যক্তি এই দ্বিতীয় পর্যায়ের তাকওয়ার ব্যাপারে সচেতন ও সজাগ না থাকলে মনের অজান্তে প্রথম পর্যায়ের তাকওয়া থেকেও বিচ্যুত হয়ে পড়তে পারে যেকোন সময়ে এবং চুরি, যেনা, জুলুম ইত্যাদি তাকওয়ার পরিপন্থী যেকোন কর্মে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাই তো বলা হয়, "সাবধানের মাইর নাই।" তাকওয়ার বিপরীত আচরণ তথা অবাধ্যতা ও স্বেচ্ছাচারিতাকে দূরেই থামিয়ে দেয়া উচিত, কাছেই ঘেঁষতে দেয়া উচিত না। ফেতনা থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই তো বুদ্ধিমানের কাজ। তাই তো পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন পাপ কাজের বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা এভাবে বলেছেন যে- "এগুলোর কাছেও যেও না।"

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)