মেধার মূল্যায়ন

যখন ছাত্রদের কোন অনুষ্ঠানে যাই তখন তাদের উপর খুব ইর্ষা হয়। আমি সেই ছোট্ট ছাত্র-ছাত্রী ভাই-বোনদেরকে বলি তোমাদের কি সৌভাগ্য, তোমরা আগামী দিনে কোথায় পড়বে তার দিক নির্দেশনা এই ছোট্ট ক্লাশেই পেয়ে যাচ্ছ, কিন্তু আমি যখন ইন্টারমেডিয়েট পাশ করি তখনও জানতামনা আমাকে কোথায় পড়তে হবে। এমনকি আমাকে তেমন কেউ পরামর্শটাও দেয়নি! তখন আমার ব্যক্তিগত চিন্তা ছিল যে হয় ডিগ্রী কলেজে পড়ব নয়তো সর্ব্বচ্চ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হব। এখন চিন্তা করি, দিক নির্দেশনার অভাবে আমার চিন্তা যেমন ছোট ছিল আমি এখন হয়েছিও অনেক ছোট। যার চিন্তা হয় ডিগ্রি কলেজ সে তো আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে না। সেসময়ে যদি কেউ একজন সঠিক দিক নির্দেশনা দিতেন তাহলে হয়তো আমার মত যারা আছেন তাদের অবস্থা এখনকার চেয়ে ভিন্ন হত। আর এজন্যই এখনকার ছোট্ট ছাত্র-ছাত্রী ভাই-বোনদের উপর আমার এত ইর্ষা। তাদেরকে যখন এই কথাগুলো বলি তখন তারা শুধু হাসে আর আমি নিজেকে বেশ বোকা মনে করি।

ছাত্র-ছাত্রী ভাই-বোনদেরকে বলি, আমি যেই পরামর্শগুলো দিচ্ছি তা শুনতে ভাল লাগলেও তোমরা হয়তো এই অনুযায়ী চলবে না কারন এই কথাগুলো বলার মত যেই যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ হওয়া দরকার আমি সেই রকম মানুষ হতে পারি নাই। এরপরও নিজেকে শান্তনা দিতে পারবো যে আমার যা বলার ছিল তা বলে দিয়েছি এখন বাকি বিষয় তোমাদের, সিদ্ধান্ত তোমাদেরকেই নিতে হবে, এই আশায় বলা।

আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে একটা ভাল পরামর্শ পর্যন্ত পাওয়া যায় না! আর ছাত্ররা সঠিক সময়ে যদি সঠিক পরামর্শটা না পায় তাহলে তারা নির্ঘাত বিপদে পড়বে। বিশেষ করে ইন্টারমেডিয়েট পাশ করার পরে।

আমাদের কেউ কাউকে ভাল পরামর্শ দিলেও আবার অনেকেই পরামর্শ দিয়ে হতাশ করে দেন। কথা বলার ভঙ্গিটাই তাদের ভিন্ন হয়। আমি যেদিন অনার্স কলেজে ভর্তি হই সেদিন কোন একজন বড় ভাই আমাকে বললেন- কিসে ভর্তি হয়েছ? বিষয়ের কথা শুনে আমার সেই ভাইটি আশ্চর্য হয়ে গেলেন আর আমাকে বললেন- ঐবিষয়ে ভর্তি না হয়ে এর চেয়ে যদি ইংলিশে ভর্তি হতে তাহলেই ভাল হত, তুমি কি ঐবিষয় থেকে পাশ করতে পারবে! সেদিন আমি খুব হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট সাবজেক্ট বেশ মজার মনে হয়েছিল।

সেদিন সেই বড় ভাইটি যদি আমাকে এরকম হতাশ না করে বরং বলতেন- দারুন একটা সাবজেক্টে ভর্তি হয়েছ, একটু ভাল করে পড়লেই এটাতে ফাস্ট কাশ পাওয়া যাবে, এখন থেকে পড়া শুরু করে দাও। তাহলে কিন্তু আমি সেদিন এত হতাশ না হয়ে বরং আনন্দের সাথেই পড়া শুরু করতে পারতাম। আর আমার রেজাল্টাও হয়তো আরও ভাল হত।

একদিন শুনলাম যে এক ভাই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বানিজ্য অনুষদে ভর্তি হয়েছে কিন্তু সে সেখানে পড়বে না। শুনে খুব খারাপ লাগলো। তখনই আমি তার বাড়িতে গিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করলে সে বললো যে, তার স্যার (বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর) নাকি তাকে বলেছেন দৈনিক আট-দশ ঘন্টার কমে পড়লে এই বিষয়ে পাশ করা যাবে না! বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বড় ভাইয়েরাও নাকি এমন কথা বলেছেন, এতে সে হতাশ! আমি তাকে বললাম দুই-তিন ঘন্টা করে পড়লেই হবে কোন সমস্যা নাই ক্যাম্পাসে যাওয়া দরকার। কিন্তু যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর তাকে হতাশ করেছেন তাই শত চেষ্টা করেও আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো গেল না, এখন সে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে ইসলামের ইতিহাসে অনার্স করছে!

কিন্তু সেদিন যদি সেই স্যার তাকে এরকম হতাশ না করে বরং আশার বাণী শোনাতেন তাহলে নিশ্চই একজন মেধাবী ছাত্রের এভাবে পতন হত না।

তাই আমি সকলকে অনুরোধ করবো- যখন কাউকে পরামর্শ দিবেন তখন আপনার কথায় যেন সে একটা আলোর পথ খুঁজে পায় সে বিষয়ে খেয়াল রাখবেন। মনে রাখবেন আপনি পারেন একজনকে ভাল পরামর্শ দিয়ে অনেক উপরে তুলতে আবার খারাপ পরামর্শ দিয়ে অনেক নিচে নামাতে।

এখন আসুন আর একটা বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করি। আমাদের সমাজে অনেক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী আছেন। আর এই মেধাবীরাই কোন একদিন আমাদের দেশ পারিচালনার ভার তাদের কাঁধে তুলে নিবেন। কিন্তু এখন থেকেই যদি তাদের মেধার মূল্যায়ন করা না যায় তাহলে তারাও কোন একসময়ে সমাজ ও দেশের প্রতি হতাশ হয়ে বিদেশে পাড়ি জমাবেন।

আজকে যদি আমরা শুধু আমাদের পাবলিক বিশ্বাবদ্যালয়গুলোর দিকে তাকাই তাহলে কি দেখব, দেখব প্রতি বছর অনেক মেধাবী মুখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আমরা কয়জনেরই বা খবর রাখি! জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও প্রতি বছর অনেক ছাত্র-ছাত্রী ফাস্টকাশ পাচ্ছেন- যদিও এখান থেকে ফাস্টকাশ পাওয়া অনেক কঠিন কাজ- তারাও একপর্যায়ে কোথাও জানি হারিয়ে যাচ্ছেন! এছাড়াও অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়তো আছেই।

আমরা জানি যে দেশে জ্ঞানীদের (মেধাবী) মূল্যায়ন করা হয় না সে দেশে জ্ঞানীদের জন্ম হয় না। আমরা কিন্তু সেই মূল্যায়নটা করতে পারছিনা। যার কারনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত এত নামকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর এত মেধাবী ছত্র-ছাত্রী বের হওয়ার পরেও আমরা তাদেরকে হারিয়ে ফেলছি। বিদেশে তাদের প্রচুর মূল্য থাকার কারনে তারা সেখানেই চলে যাচ্ছেন। মেধাবীদেরকে তৈরী করে আমাদের দেশ আর তাদের নিকট থেকে ফায়দা লুটায় অন্য দেশ!

পূর্বেই বলে রাখি আমি কোন খেলার বিরোধী নই। এরপর বলছি, আজকে খেলোয়ারদেরকে যেভাবে মূল্যায়ন করা হয় তার সিকি ভাগও যদি মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদেরকে মূল্যায়ন করা হত তাহলে আমাদের দেশ আরও অনেক উন্নত হত। আজকে দু'একটা ম্যাচ বা সিরিজ জেতার কারনে খেলোয়ারদেরকে লক্ষ লক্ষ টাকা, ফ্লাট, গাড়ি সহ কত কিছুই না দেওয়া হচ্ছে কিন্তু যারা ক্লাশ ওয়ান থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত ফাস্টক্লাশ পাচ্ছেন তাদেরকেতো খেলোয়ারদের এক দশমাংশও দেওয়া হচ্ছেনা! খেলোয়াররা দেশের উন্নয়নের অংশিদার বা পরিপুরক কিন্তু শুধু তাদের দ্বারাই দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

আজকে যদি দেখি সময়ের মূল্যায়ন কে বেশি করে তাহলে দেখা যাবে ছাত্ররা, আর সময়ের অপচয় সবচেয়ে কে বেশি করে তাহলে দেখা যাবে খেলোয়াররা।
আজকে যদি বলা হয় সারা বিশ্বের নেতৃত্ব কে দিচ্ছে তাহলে সহজেই বলা হবে "ইহুদীরা"। আবার যদি বলা হয় আজকে সারা বিশ্বে খেলার জগতে সবচেয়ে কে পিছিয়ে আছে তাহলেও উত্তর আসবে "ইহুদীরা"!
তার মানে ইহুদীরা শুধু খেলে খেলে সময় অপচয় করে না। আর আমরা খেলি এগারজন আর খেলা দেখি এগারহাজার, এভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা আমরা অপচয় করছি!

কেউ কেউ হয়তো বলবেন যে, ইহুদী নয় খ্রীষ্টানরাই বিশ্বের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এটা আপত দৃষ্টিতে সত্য মনে হলেও আসলে সত্য নয়। আজকে বারাক ওবামাও ইহুদীদের কাছে বন্দি। ইহুদীরা যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে মাত্র একমাস তারা তাদের আমেরিকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখবে তাহলে পুরো আমেরিকাই অচল হয়ে যাবে। এজন্য টুইন টাওয়ার ইহুদীরা ভেঙ্গেছে এটা প্রমানিত হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকা ইহুদীদেরকে টু শব্দটি পর্যন্ত করেনি! ইহুদীরা আমেরিকার ঘাড়ের উপর চেপে বসে কত কুকামই না করছে কিন্তু তাদের ব্যাপারে আমেরিকা একেবারেই নিশ্চুপ!
অন্যরা পারমানবিক চুল্লি বা অস্ত্র তৈরী করলে শুধু নয় বরং করতে চাইলেই আমেরিকা লাফ দিয়ে উঠে বিশ্ব বিবেককে নিজের পক্ষে আনার হাজারও চেষ্টা করে, সম্মেলন থেকে ওয়াক আউট করে কিন্তু বলুনতো ইহুদীদের ব্যাপারে এরকম একটি নজিরওকি আমরা দেখতে পাই!?

এর নামই হল মেধার খেলা। তারা তাদের মেধাবীদেরকে মূল্যায়ন করে বিধায় তারা আজকে পৃথিবীর রাজা আর আমরা মেধাবীদেরকে মূল্যায়ন করি না তাই আমরা তাদের প্রজা! কথাগুলো শুনতে খারাপ লাগলেও বাস্তবতা এটাই।

মহানবী হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) সময়ে যদি কেউ যুদ্ধ বন্দি হয়ে আসতো যিনি শিক্ষিত, তখন তিনি সেই যুদ্ধবন্দিকে "দশজন মানুষকে" শিক্ষিত করে দিবে এই শর্তে ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতেন এবং পরে মুক্ত করেও দিতেন। আর আজ আমরা কিভাবে শিক্ষিতদেরকে-মেধাবীদেরকে- মেরে ফেলা যায় সেই ফন্দি আটি!

তাই আসুন, আমারা আমাদের সাধ্যানুযায়ী ছাত্রদেরকে ভাল পরামর্শ দেই এবং মেধাবীদেরকে মূল্যায়ন করার মাধ্যমে আমাদের দেশটাকে একটা সোনার বাংলাদেশে পরিণত করার কার্যকরি পদপে গ্রহণ করি।

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None