প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় নিতে হবে আগাম প্রস্তুতি

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েই চলছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ জীবকুল ও
সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধের শক্তি মানুষের নেই, কিন্তু আগাম দুর্যোগ-প্রস্তুতি নিয়ে
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা এবং দুর্যোগ আক্রান্ত এলাকা থেকে লোকজন নিরাপদ স্থানে
সরিয়ে আনা সম্ভব। ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা
বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, হিমালয়ের বরফ গলার
কারণে নদীর গতিবেগ পরিবর্তন, বন্যা ইত্যাদি কারণে বাড়ছে
প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই বলে প্রতি
বছর হাজারো বসতি উজাড় হয়, লাখ লাখ মানুষ হয় গৃহহীন। ১৯৯৮
থেকে বাংলাদেশে প্রতি বছর দুর্যোগ মোকাবেলা করার প্রস্তুতি স্বরূপ ৩১ মার্চ  ‘জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি
দিবস’ পালিত হচ্ছে। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান
জার্মান ওয়াচ তাদের জরিপে বলেছে যে, বিশ্বে জলবায়ু
পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে
বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমেই বঙ্গোপসাগর উত্তাল হয়ে উঠছে। যার কারণে
সৃষ্টি হচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগ। জার্মান ওয়াচ তাদের গবেষণায়
বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বছরে ৮২৪১ জন
মানুষ মারা যাচ্ছে। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর উপকূলে আঘাত হানে সিডর নামক ঘূর্ণিঝড়;
সিডরের ক্ষয়-ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ২০০৮ সালের মে মাসে আবারো
আঘাত আনে নার্গিস। একই বছর অক্টোবর মাসে আঘাত আনে রেশমি নামের ঘূর্ণিঝড়, নভেম্বরে আসে খাইমুর তার পর নিসা। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড়ের মাত্রা ছিল আরো
বেশি। বিজলি আর আয়লা ঝড় আঘাত আনে উপকূলে। ক্ষয়-ক্ষতিও হয় ব্যাপক। সর্বশেষ ২০১৩
সালে মহাসেন আঘাত আনে উপকূলে। বাংলাদেশ এরূপ প্রলয়ঙ্কর দুর্যোগসমূহের কারণে বারবার
পিছিয়ে পড়ছে। ১৯৭০ সালে এক ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ে 
প্রায় ১০ লাখ লোক মারা গিয়েছিল যা ইতিহাসে বিরল। ১৯৭৬-এ বাকেরগঞ্জ নামক এক
সাইক্লোনে নিহত হয়েছিল প্রায় ২ লাখ মানুষ, ১৯৯১ সালের ঝড়ে
নিহত হয়েছিল ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল
চট্টগ্রাম বন্দর। সেসব দুর্যোগকবলিত দিনগুলোর কথা দেশের মানুষ কখনো ভুলবে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছেই। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে
তীব্র বন্যা। বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৮-৫৫% ভূখণ্ড বন্যাকবলিত হয়। অধিক বৃষ্টি,
নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভারত থেকে আসা পানি
প্রভৃতি কারণে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও আর
একটি ভয়ংকর দুর্যোগ দেখা দিয়েছে—সেটা হলো ‘ভূকম্পন’। ঘন ঘন ভূমিকম্প বড় এক ভূমিকম্পের আগাম পূর্বাভাস বলে অনেক
গবেষক বাংলাদেশকে সতর্ক করে দিয়েছেন। নেপালে ২০১৫ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটেছিল।
বাংলাদেশও এরূপ ভয়াবহ ভূমিকম্পের সম্মুখীন হলে ক্ষয়-ক্ষতি যেন নেপালের মতো না হয়, সে বিষয়ে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হচ্ছে। ২০১৬ সালে
জানুয়ারি থেকে জুলাই এই ৬ মাসে বজ্রপাতে মারা গেছে ১০০ জনের মতো। ঘন ঘন বজ্রপাতের
প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। যা ক্রমেই বাংলাদেশের আবহাওয়ার
জন্য হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশ সরকার দেশের সমূহ দুর্যোগ প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যক্রম
হাতে নিয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু
গণসচেতনতা ও আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব।


 

ছবি: 
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (টি রেটিং)