শেকড়ের সন্ধানে

পরজীবী লতাগুল্ম যেভাবে অন্য গাছের উপর ভর করে বেড়ে উঠে আমরাও তেমন অন্যের গর্বে নিজেদের গর্বিত করার চেষ্টা করছি। নিজের পরিচয় নিয়ে মানুষ যখন সন্দেহে ভোগে তখনই বিজাতিয় সংস্কৃতি আর ধর্মের বেড়াজালে মানুষ নিজেকে নিরাপদ মনে করে। আমরা সম্ভবত সেই সময়টাই অতিক্রম করছি। কথায় ছিল বাঙালী আজ যা চিন্তা করে সমস্ত ভারত আগামীকাল তা করে।। কিন্তু আজ আমরা হয়ত চিন্তা করতেই ভুলে গেছি। নিজেদের গর্বের ইতিহাস ভুলে আজ ধর্ম আর ভিনদেশী সংস্কৃতিতে মেতে আছি আমরা। বাঙালীর ধর্ম কি? প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মতত্ত্ব নয়, বিজ্ঞানে যেমন হাইড্রোজেন-অক্সিজেনের ধর্ম পড়ি আমরা, সেই আসল ধর্ম নিয়ে ভাবতে হবে। অক্সিজেন নিজে জ্বলেনা কিন্তু অপরকে জ্বালায়। বাঙালীর ধর্মও অনেকটা অক্সিজেনের মতো। বাঙালীর ইতিহাসের মতো বাঙালীর ধর্মও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়নি। প্রথমেই ভাবা যাক ধর্ম বলতে আমরা কি বুঝতে চাচ্ছি? অনেকগুলো আচার,নানাবিধ বিশ্বাস আর সর্বোপরি প্রাকৃতিক-জাগতিক প্রয়োজনের যোগফলই একটি ধর্ম। "মিথ্যাবাদী পরিসংখ্যান" দিয়ে বাংলাদেশের ৮০ ভাগ মুসলমান, ১৫ভাগ হিন্দু...
এইভাবে বাঙালীর ধর্ম বের করা ভুল। আমরা কেমন মুসলমান, কেমন হিন্দু সেটি জানতে পারলেই আমরা আমাদের আদিধর্মের ধারনা পাবো। ধর্ম মানুষকে বিবর্তিত করে হয়ত কিন্তু তার চাইতে অনেক বেশি বিবর্তিত করে মানুষ ধর্মকে। আমাদের মূল ধর্ম ইসলাম কিন্তু আমাদের ইসলাম আর ইসলামের উৎপত্তিস্থল সৌদিআরবের ইসলামে ব্যাপক ফারাক। শুধু ইসলাম কেনো, বাংলার হিন্দু ধর্ম কি ভারতের মূলধারার হিন্দু ধর্মের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? তাহলে দূর্গাপূজা নিয়ে এত উৎসব ইন্ডিয়াতে হয়না কেনো? বৌদ্ধধর্মের বজ্রযান-সহযান তো এই বাংলার মানুষেরই অবদান। জন্মান্তরবাদ, বাউলমত কাদের মস্তিষ্ক হতে নির্গত? এই বাংলার মানুষের। বাংলা বেশিরভাগ সময়ই শাসিত হয়েছে বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজাদের দ্বারা। আর একচ্ছত্র শাসনে না থাকলে ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতির ঐক্য গড়ে উঠেনা। এটিই আমাদের সবচাইতে বড় দূর্ভাগ্য। ইতিহাসের নামে আমরা যা পড়ে এসেছি তা শাসকের বীরত্বের ইতিহাস, দাপটের ইতিহাস, বাঙালীর অধিকার হরণের ইতিহাস। দুই হাজার বছরের ইতিহাসে আমরা মাত্র একজন বাঙালী রাজা (শশাংক) দেখতে পাই। বাংলার ইতিহাসে নেই বাংলার গতরখাটা মানুষদের কথা। বাংলার কামার-কুমার, মেথর-জেলে, তাতী-কুঠার অথবা হাড়ি-ডোম-চন্ডাল-শূদ্র যাদের বাস ছিলো গ্রামের শেষমাথায়, যাদের ছোঁয়াও ছিলো হারাম তাদের ইতিহাস কই? বাংলা সর্বকালেই ছিলো ইতিহাসের জারজ পূত্র। এই বাংলাকে বলা হতো "পান্ডব বর্জিত"। বাঙালীকে সর্বদাই ভীরু,চোর,কাপুরুষ,অলস,ঝগড়াটে,অকর্মন্য বলে রায় দিয়েছে বিদেশীরা। এটাই আমাদের ইতিহাস। আমাদের গর্ব করতে বলা হয়েছে আর্য-রক্তের,তুর্কি-মুঘলদের বীরত্বের। ভুলে গিয়েছি সেইসকল বাঙালীদের যারা বর্ণবাদীদের বাধ্য করেছে মাথা ঠুকে বাংলার দেবতাদের মেনে নিতে। শিকড় থেকে শিখরে প্রোথিত আমাদের বাঙ্গালিত্ত্ব। শিকড় নড়বরে হলে শুকিয়ে
যায় বৃক্ষের শাখা প্রশাখা, তাই আমাদের শিকড় আকরে ধরেই এগুতে হবে। বীর বাঙ্গালী তার
বীরত্ত্বের ছাপ রেখে যাচ্ছে সারা বিশ্বে। যেখানে পরিচয় একটাই আমরা বাঙালী। আমরা
বীরের জাতি, আমাদের সত্তাকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারেনি আর পারবেও না।

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None