মানব জীবনের পরীক্ষা - ১

সাধন কর ভজন কর মরতে জানলে হয়। এই কথাটির তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, এক ব্যক্তির পরবর্তী জীবনের ভাগ্য নির্ধারিত হয় মৃত্যুল পূর্ব মুহূর্তের পরিপ্রেক্ষিতে। এই জগতে আমরা দেখতে পাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, স্কুল কলেজের ছাত্রদের ভাগ্য নির্ধারিত হয় তাদের সেই কয়েক দিনের পরীক্ষার ফলের উপর। আমরা জানি, সকল ছাত্ররাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় না। কা্রা পরীক্ষায় ভাল ফল করতে পারে? যারা প্রতিদিন নিয়মিতভাবে পড়াশুনা করে ও শিক্ষকের নির্দেশ পালন করতে চায় না এবং যারা নিছক আনন্দ-স্ফূর্তিতে প্রতিদিনকার সময়টি অতিবাহিত করে, তারা পরীক্ষায় পাশ করতে পারে না। যদিও বা অনেকে নকল করে পাশ করে, প্রকৃতপক্ষে তা কর্মক্ষেত্রে কার্যকর হয় না।
এই জগতের তথাকথিত শিক্ষাগত পরীক্ষাতে পাশ করতে গেলে যদি নিষ্ঠা পরায়ণতার সঙ্গে পড়াশুনা এবং শিক্ষকের নির্দেশ পালনের প্রয়োজন হয়, তা হলে পরবর্তী জীবনের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য মৃত্যুর প্রাক্‌কালে যে পরীক্ষা তা কত গুরুত্বপূর্ণ, তা আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি। এই জগতে পরীক্ষা পাশের জাগতিক মান অস্থায়ী, তা মৃত্যুর সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায় এবং যথার্থ সুখ প্রদান করতে পারে না। সুতরাং, আমাদের সকলেরই সচেতন হওয়া উচিত মৃত্যুর সময় কিসের পরীক্সা এবং আমাদের কি কর্তব্য।
শাস্ত্রে উল্লেখ আছে, এই ব্রহ্মান্ডে নয় লক্ষ প্রকারের জলচর প্রানী, একাদশ লক্ষ ক্রিমিকীট, বিশ লক্ষ প্রকার বৃক্ষ ও পাহাড় পর্বত দেহধারী জীব, দশ লক্ষ পক্ষী, ত্রিশ লক্ষ পশু ও চার লক্ষ প্রকারের মনুষ্য।- মোট চুরাশি লক্ষ্য প্রকার যোনিভূক্ত জীবের ভিতকর মানব জীবন সুদুর্লভ। অঅর মান ব জীবেনেই সেই সুযোগ লাভ হয়, যার ফলে মৃত্যুর পূর্ব মূহূর্তে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করে চিন্ময় ভগবৎ
ধামে ফিরে যাওয়া যায়।, সেখান থেকে জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধিময় এই জড় জগতে ফির আসতে হয় না। ভগবদ্‌গীতায় ৮/৬ প্রতিপন্ন হয়েছে
যং যং বাপি স্মরন্‌ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্‌
তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্‌ভাবভাবিত॥ গীতা- ৮/৬
“দেহ ত্যাগ করার সময় যেভাবে ভাবিত হয়ে একজন চিন্তা করে, পরবর্তী জীবনে নিঃসন্দেহে সেই ভাবসম্পন্ন দেহ সে প্রাপ্ত হবে। “
যদি কেউ মনে করে যে মৃত্যুর সময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ না করে, অন্য যে কোন বিষয় যথা- পিতা-মাতা, স্ত্রী-পুত্র-কণ্যা, বা জড় বিষয় চিন্তা করলে একই গতি হবে তা ঠিক নয়। এই শ্লোকে তা প্রতিপন্ন হয়নি। মৃত্যুর সময় কেউ যদি তার স্ত্রীকে চিন্তা করতে করতে দেহ ত্যাগ করে তবে সে একটি স্ত্রীদেহ প্রাপ্ত হবে, তা মনুষ্যকুলে হোক বা অন্য নিম্ন-যোনিভুক্ত কুলেই হোক না কেন, সেটি প্রকৃতির তিনটি গুনের প্রভাব অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। সাধারণত যারা সত্ত্বগুন-সম্পন্ন, মৃত্যুর পর তারা স্বর্গলোকবা তার উপরে ব্রহ্মলোকে দেহ লাভ করতে পারে। যারা রজোগুন-সম্পন্ন অবস্থায় দেহত্যাগ করে তারা এই পৃথিবীতে মানবদেহ লাভ করতে পারে। আরা যারা তমোগুনে অবস্থিত হয়ে দেহ ত্যাগ করে তারা আশি লক্ষ নিম্ন যোনিসম্পন্ন দেহ প্রাপ্ত হয়।
কারও যদি মাংসাহারে আসক্তি থাকে , তাহলে মানব শরূরে সে আর কতটুকুই বা খেতে পারে, ফলে তার পিপাসা নিবারিত হয় না। সুতরাং উপরোক্ত শ্লোক অনুযায়ী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বহিরঙ্গা মায়াশক্তি বা জড়া প্রকৃতি তাকে পরবর্তী জীবনে এমন একটি উপযুক্ত মরীর প্রদান করবে যাতে সে প্রচুর পরিমানে মাংস আহার করতে পারে। হয়ত সে একটি বাঘ বা সিংহের দেহ লাভ করতে পারে। তেমনই কেউ যদি মারোয়ারি মহিলাদের মতো মোটা হওয়ার বাসনা করে, তা হলে সে একটি হাতির দেহ লাভ করতে পারে। এভাবেই একজন ব্যক্তি তার সারা জীবনের কর্ম ও চিন্তা অনুযায়ী মৃত্যুর সময় সেই বিশেষ বিষয়ীটই স্মরণ করে, যার প্রতি সে সারা জীবনে বিশেষভাবে অনুরক্ত বা আসক্ত ছিল। কেউ যদি তার গৃহের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়, তাহলে সে তার গৃহে একটি আরশোলা, ইঁদুর বা বিড়াল হয়ে জন্মগৃহণ করতে পারে। কেউ যদি তার চেয়ারের প্রতি আসক্ত হয়, অর্থাৎ যে চেয়ারে বসে সে কর্মজীবনে বড় বড় পদমর্যাদা লাভ করেছে, সে হয়ত কর্মচক্রে সেই চেয়ারেই একটি ছারপোকা হয়ে জন্মগ্রহণ করেতে পারে। মানুষ এবাবেই কর্মফল অনুযায়ী উন্নত বা নিম্নদেহ লাভ করে। অর্থাৎ, সারাটা জীবনে অত্যনস্তআসক্ত হয়ে মানুষ যে জিনিসটি লাভ করবার জন্য সদাসর্বদা জল্পনা -কল্পনা বা মনন করে, মৃত্যুর সময়ে সে তাই স্মরণ করবে এবং অনুরূপ দেহ প্রাপ্ত হবে। একেই বলে কর্মচক্র, অর্থাৎ জন্ম, মৃত্যু জরা ও ব্যুধর মাধ্যমে চুরাশি লক্ষ যোনিতে পরিভ্রমণ।
আমরা অনেকেই শ্রীমদ্ভাগবতের একটি কাহিনী জানি। মহারাজ ভরত ছিলেন রাজর্ষি। তিনি সসাগরা পৃথিবীর রাজ ‍াচিলেন। তিনি একটি হরিণের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত পরায়ণ ছিলেন। অত্যধিক আসক্তির ফলে মহারাজ ভরত মৃত্যুর সময়ে সেই হরিণের চিন্তা করেছিলেন। ফলে মহারাজ ভরতকে পরবর্তী জীবনে একটি হরিণের গেহ লাভ করতে হয়েছির। মহান ভগবদ্ভক্ত হয়েও তিনি হরিণের দেহ লাভ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। যেহেতু তিনি রাজর্ষি ছিলেন, হরিণের দেহে তিনি পূর্ব জীবনের কথা স্মরণ করতে পেরেছিলেন। তেমনি অজামিল প্রথম জীবনে উন্নত ভগবৎভক্ত ছিলেন, কিন্তু পরে এক গণিকার প্রতি আসক্ত হয়ে মায়াগ্রস্থ হন। অজামিলের কনিষ্ট পুত্রের নাম ছিল নারায়ন এবং তিনি সেই পুত্রের প্রতি অত্যধিক আসক্ত ছিলেন। মৃত্যুর সময়ে প্রত্রকে লক্ষ্য করে নারায়ন নাম উচ্চারণ করেছিলেন ফলে ভগবানের নাম উচ্চারিত হওয়ায় তিনি পরম গতি বৈকুন্ঠধাম প্রাপ্ত হয়েছিলেন। মানব জীবনেই একমাত্র কর্মফলের অধীন। স্বর্গ বা আরও উর্ধ্বলোকে পুণ্যফল বোগী পুণ্যাত্মারা অথবা এই পৃথিবীত বা নিম্নলোকে পাপফল ভোগেী নিম্ন যোনী প্রাপ্ত জীবদের নতুন করে কর্মফল সঞ্চয়ের কোন সুযোগ নেই কারণ তারা কর্মফল বোগ করে চলেছে। স্বর্গলোক বা উর্ধ্বলোকের অধিবাসীরা উন্নত জড় সুখভোগ করার সাথে সাথে পুণ্যক্ষয়ে বৃষ্টিআকারে তাদের সচ্চিদানন্দময় অণূসদৃশআত্মা এই জগতে পতিত হয়ে যখন মানবজীবন পুনঃপ্রাপ্ত হয় তখনই সে পাপ বা পুণ্যফলে আবার এই জ[ জগতে আবদ্ধ হয়। তেমনই নিম্নযোনিভুক্ত জীবেরা পাপকর্ম অনুসারে পাপফল বোগ করতে করতে একটির পর একটি ক্রম-উন্নত দেহ প্রাপ্ত হয়ে যখন আবর মানবজীবন লাভ করে, তখনই সে আবার পাপ-পুণ্য কর্মফল চক্রে আবদ্ধ হয়।
কেউ যদি মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করে, সে যে কোন একটি কলেছে পড়াশুনা করতে পারে অথবা কেউ যদি এম. এ. পাশ করে সে পি এইচ.ডি. কোর্সে রিসার্চ করতে পারে , তার নিম্নে যারা পড়াশুনা করছে তারা তার সুযোগ পায় না। তেমনই এই মানবজীবন এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান যেখান থেকে সে পরবর্তী জীবনের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। কেউ ইচ্ছা করলে সনাতন ভগবৎ-রাজ্যে ফিরে যেতে পারে, যেখানে জন্ম, মৃত্যুর আবর্তন ন্বে আর তা সম্ভব একমাত্র মনুষ্য জীবেনেই। এই জড় জগৎ ছাড়া আর একটি উন্নত চিৎ জগত রয়েছে। তা ভগবৎ গীতায় প্রতিপন্ন হয়েছে-
পরস্তস্মাত্তু ভাবোঅন্যোঅব্যক্তোঅব্যক্তাৎ সনাতনঃ।
যঃ স সর্বেষু ভূতেষু নশ্যৎসু ন বিনশ্যত॥ি
‘এই ব্যক্ত ও ‍অব্যক্ত জড় জগতের অতীত আর একটি অব্যক্ত জগৎ রয়েছে যে জগৎ নিত্য ও অপ্রাকৃত। সেই পরম ধাম কখনও ধ্বংস প্রাপ্ত হয় না। যখন এই জগতের সব কিছু ধ্বংস প্রাপ্ত হয়, তখনও সেই ধাম অবিকৃত অবস্থায় নিত্যকাল বিরাজমান থাকে। ‘
সুতরাং চিৎ-জগৎ হচ্ছে সনাতন, চেতনাময় ধাম যেখানে এই জড় জগতের মতো হেয় প্রতিফলন নেই। সেখানে সব কিছুই সর্বোৎকৃষ্ট অবস্থায় বিরাজিত। এই জড় জগৎ হচ্ছে চিৎজগতের বিকৃত প্রতিফলণ। সেখানে যে জিনিসটি সর্বোৎকৃষ্ট এখানে তা সব নিকৃষ্টভাবে বিরাজিত। যেমন উদাহরণ স্বরূফ বলা যায় চিৎ জগতে সর্বোৎকৃষ্ট রস হচ্ছে অপ্রাকৃত মাধূর্যময়েী পরকীয়া রস, যা ভগবান ‍শ্রীকৃষ্ণ পরস্ত্রী গোপীদের সঙ্গে উপপতির ভূমিকায় লীলঅবলাস করে থাকেন। কিন্তু এই জড় জগতে এই ধরণের আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয়। একজন পরপুরুষের অপর এক স্ত্রীর সঙ্গেঅবৈধভাবে মেলামেশা এই জগতে তা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। অর্থাৎ চিৎজগতে যা প্রেমের পরাকাষ্ঠারূপে প্রতিভাত, এ জগতে তা বিকৃতভাবে ‍াতীব নিন্দনীয় কামরূপে বিরাজিত। চিৎ জগত ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গ‍া শক্তির প্রকাশ,আর এই জড় জগৎ তার বহিরঙ্গা মায়াশক্তির প্রকাশ।
যেহেতু আমরা শ্রীকৃষ্ণের অংশ ও নিত্যদাস, তাই আমাদের নিত্য আবসস্থল হচ্ছে চিৎ জগতে বৈকুন্ঠলোকে বা গোলকে। এই জগেতের পরীক্সায় পাশকরত কয়েক বছর পড়াশুনা করতে হয়, তেমনই এই জড় জগৎরূপ কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে চিৎ জগতে উত্তীর্ণ হতে হলে তাকে পরীক্ষায় পাশ করতে হয়। আর সেই পরীক্ষার প্রস্তুতি কয়েক বছরের নয়, তা হচ্ছে সারাটা মানব জীবনের প্রস্তুতি। মানব জীবনের উদ্দেশ্য তখনই সার্থক হয়, যখন সে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে আত্মসমর্পণ করে চিৎ জগতে ফিরে যায়। সেই সম্বন্ধে ভগবদ্‌গীতায় ৮/৫ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে লক্ষ করে সমগ্র বদ্ধ জীবরকে উপদেম দিয়েছেন-
অন্তকালে চ মামেব স্মরন্মুক্তা কলেবরম্‌।
যঃ প্রয়াতি স মদ্‌ভাবং যাতি নাস্ত্যত্র সংশয়ঃ॥
মৃত্যুকালে দেহত্যাগের সময়ে যে আমাকে স্মরণ করে, সে তৎক্ষনাৎ আমার ভাব প্রাপ্তহয়, এতে কোন সন্দেহ নেই।
এটিই হচ্ছে যথার্থ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, অর্থাৎ মৃত্যুল পূর্ব মূহূর্তে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্মরণ করা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণেকে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে কে স্মরণ করতে পারে ? কর্মী, জ্ঞানী এমনকি যোগীরাও মৃত্যুল পূর্ব মুহূর্তে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করতে পারে না। একমাত্র সম্পূর্ণরূপে শরণাগত শুদ্ধ ভক্তই মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সচ্চিদানন্দ দিব্য রূপকে  স্মরণ করতে পারেন।
কারও হৃদয়ে বিন্দুমাত্র জড় কামনা-বাসনা থাকা পর্যন্ত সে মৃত্যুর সময়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করতে পারে না। যিনি তার মনসহ সমগ্র ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্ণরূপে সারা জীবন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত করেছেন তিনিই একমাত্র জড় কলুষ থেকে মুক্ত হতে পারেন। এই জড় কলুষ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য একমাত্র পন্থা যুগধর্ম হরিনাম মহামন্ত্র কীর্তন করা
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে॥
সুতরাং আমাদের সকলের কর্তব্য মানব-জীবনের এই অপূর্ব সুযোগটি গ্রহণ করা, যাতে মৃত্যুর সময়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করে আমরা চিন্ময় ভগবৎ-রাজ্যে ফিরে যেতে পারি।
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (3টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (3টি রেটিং)