The three questions

লিও টলষ্টয় (জন্ম ১৮২৮ খৃ)। বিশ্ব সাহিত্যের সবচেয়ে খ্যাতিমান লেখক। ঈসায়ী ধর্মের বিকৃতি যখন চরম পযায়ে ঠিক সেই সময়টিতে তিনি রাশিয়ার তুলা প্রদেশে পলিয়ানা নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। আসমানী কিতাবের মনগড়া অসংগত ব্যাখ্যা, পাদ্রীদের অধার্মিক আচরণ ইত্যাদির কঠোর সমালোচক ছিলেন তিনি। একারনে যাজকগন ঘোষণা করে যে “টলষ্টয়কে খৃষ্টধর্ম থেকে বহিস্কার করা হলো। তিনি আর খৃষ্টান বলে গণ্য হবেননা”। এর জওয়াবে তিনি বলেন: “যারা গড ও যীশুকে নিয়ে ব্যবসা করে তিনি তাদের চেয়ে ঢের বেশী ধার্মিক খৃষ্টান”। (উইকিপিডিয়া) 

জীবন ও জগত সম্পর্কে নাবী রাসুলগন যে শিক্ষা পেশ করেছেন, লেখকের অনেক গল্পে, আংশিক হলেও তা মুর্ত হয়ে উঠেছে। বোধকরি একারনেই প্রতিটি পাঠকের হৃদয়ে তিনি আকর্ষিত হয়েছেন।

আমার আলোচিত The three questions পাঠকনন্দিত গল্পগুলোর একটি। নতুন প্রজন্মের জন্যে এর মুল কাহিনীটি সংক্ষেপে নীচে তুলে ধরলাম।  

একদিন এক রাজা তার রাজ্যময় ঘোষণা করে দিল যে, “তার ৩টি প্রশ্নের জওয়াব যে ব্যক্তি দিতে পারবে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। প্রশ্ন ৩টি হলো:

১- সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ সময় কোনটি? ২- সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ মানুষ কে? ৩- সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কাজ কোনটি?  

বহু লোক এল। জ্ঞানী গুণী কেউই বাদ রইলোনা। কিন্তু কারুর উত্তরই রাজার মনপুত নয়। 

অবশেষে এক ব্যক্তি তাকে এক দরবেশের খবর দিলো। জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় যার সুনাম ছিলো সবত্র। 

রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি সেই দরবেশের কাছে যাবেন। তবে পরিচয় গোপন রেখে। ছদ্ধবেশে যাবেন। 

দরবেশ বাস করতেন এক জনমানবহীন এলাকায়। রাজা তার দেহরক্ষীদেরকে একটি গোপন স্থানে পাহাড়ায় বসিয়ে তিনি একা সেখানে পৌছলেন। দরবেশ কোদাল দিয়ে মাটি খনন করছিলেন। তিনি রাজাকে দেখে সালাম বিনিময় করলেন এবং পুনরায় মাটি কাটতে লাগলেন। দরবেশ খুবই ক্লান্ত ছিলেন এবং মাটি কেটে জোড়ে জোড়ে নিশ্বাস নিচ্ছিলেন। রাজা বললেন: হে মহাত্বা, কোদালটি আমাকে দিন এবং আপনি খানিক বিশ্রাম নিন। দরবেশ রাজাকে ধন্যবাদ জানিয়ে মাটিতে বিশ্রামের জন্য বসলেন। এবার রাজা মাটি খনন করছেন।

কাজের এক ফাকে রাজা বললেন: হে মহাত্বা, আমি আপনার নিকট ৩টি প্রশ্নের জওয়াব জানতে এসেছি: 

১- সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ সময় কোনটি? ২- সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ মানুষ কে? ৩- সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কাজ কোনটি?  

দরবেশ প্রশ্ন শুনলেন কিন্তু কোন কথা বললেননা। কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখালেন না। কিছুক্ষণ পর রাজাকে বললেন: এবার আপনি বিশ্রাম নিন, কোদালটি আমাকে দিন। দরবেশ আবার মাটি কাটা শুরু করলেন।  

রাজা পুনরায় তার প্রশ্ন উত্থাপন করলেন। কিন্তু দরবেশ এবারও নিরুত্তর। গাছের আড়ালে তখন অস্তায়মান সুয। সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসছিলো। রাজা এবার অনেকটা নিরাশ হয়ে বললেন: হে মহাত্বা, আপনি যদি আমার প্রশ্নের জওয়াব না দেন, তাহলে বলুন আমি ফিরে যাই। 

দরবেশ এবার ঘাড় উচু করে দুরে ইশারা করে বললেন: ঐদিকে দেখুন, কে যেন আসছে। 

রাজা দেখলেন: একটি লোক দুহাতে পেট চেপে ধরে তাদের দিকেই দৌড়ে আসছে। কাছে এসেই লোকটি মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেল। লোকটির পেটে ক্ষত ছিল, খুব সম্ভব বল্লমের আঘাত। রাজা ও দরবেশ দু’জনেই লোকটির চিকিৎসা করে তাকে সারিয়ে তুললেন।

রাত হয়ে গিয়েছিল। রাজা প্রায় নিজের অজান্তেই সেখানে ঘুমিয়ে পড়লেন। সকাল হলে দেখলেন: সেই লোকটি, যাকে তিনি ও দরবেশ মিলে সারিয়ে তুলেছেন, তার দিকে অপলক চেয়ে আছে। রাজাকে সে বললো: আপনি আমাকে ক্ষমা করুন মাননীয় রাজা।

রাজা অবাক হয়ে বললেন: আমিতো আপনাকে চিনিনা, কখনো দেখিনি। ক্ষমা করার মতো কোনো ঘটনাও ঘটেনি।

এবার সেই আগন্তক বললো: হে রাজা, আমি জেনেছিলাম, আপনি এ জংগলে আসবেন। তাই আপনাকে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে আমি আপনার পিছু নেই। আমার পরিকল্পনা ছিল আপনি যখন ফিরে যাবার জন্য রওনা হবেন, তখন আমি আপনাকে আক্রমণ করবো। কিন্তু আপনি ফিরতে দেরী করলেন। আমিও গোপন স্থান থেকে বের হলাম। তৎক্ষণাত আপনার দেহরক্ষীরা আমার দিকে বল্লম ছুড়ে মারলো।     

শত্রুর সাথে এতো অল্পায়াসে সবকিছু মিটমাট হতে দেখে রাজা যারপর নাই খুশী হলেন। তিনি তাকে শুধু ক্ষমাই করলেননা। তার দাবীগুলোও মেনে নিলেন এবং নিজের কাছে তাকে একটি চাকরীও দিলেন।

রাজা এবার ফিরে যাবেন। শেষবারের মতো তিনি আবারও দরবেশের নিকট গিয়ে তার প্রশ্নগুলোর কথা তাকে স্মরণ করালেন। 

দরবেশ রাজাকে অবাক করে দিয়ে বললেন: যে প্রশ্নের জওয়াব পেতে আপনি আমার নিকট এসেছিলেন তা আপনি পেয়ে গেছেন।  

কিভাবে?

দরবেশ বললেন:

আপনি যদি আমাকে মাটি খননে সাহায্য না করে প্রাসাদে ফিরে যাবার জন্য রওয়ানা হতেন তাহলে এ ব্যক্তি আপনাকে হত্যা করতো। সুতরাং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ সময় ছিল সেটি, যখন আপনি আমাকে মাটি কাটায় সাহায্য করছিলেন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ মানুষ ছিলাম আমি, যেহেতু আমাকে সাহায্য করার কারনেই আপনি প্রাণে বেচে গেছেন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কাজ ছিল মাটি খননে আমাকে সাহায্য করা, কারন এ কাজে ব্যস্ত না থাকলে ভয়াবহ এক বিপদে আপনি আক্রান্ত হতেন।   

আরও শুনুন: আপনি যখন লোকটির ক্ষতস্থান বেধে দিচ্ছিলেন তখন সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ সময় ছিল সেটি, আর ঐ ব্যক্তিটিই ছিল ঐ সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ মানুষ। আর তাকে বাচতে সাহায্য করাই ছিল আপনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ যেহেতু সে না বাচলে আপনাদের মধ্যে সন্ধিও হতোনা।   

দরবেশ একটু বিরতি দিয়ে আবার বললেন: সুতরাং স্মরণে রাখবেন: আপনার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো বর্তমান মুহুর্তটি। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি হলো ঐ ব্যক্তি যার সাথে আপনি এই মুহুর্তে আছেন। আর, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো তার জন্য কল্যাণকর কিছু করা, কারন এ উদ্দেশ্যেই আমাদেরকে এ পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)