:যা দুর হ বাড়ি থেকে ! সখেদে বাঁজখাই গলায় চিল্লানি দিয়ে কিছুক্ষন অনবরত কাশতেই থাকে সলিম । উদ্দেশ্য ছোট ছেলে রাজু । খালি গায়ে সলিমের বুকের প্রতিটি হাড় গোনা যাচ্ছে । কিজন্য এত রাগ তা শুনতে না পেলেও ছেলেটির ছলছল চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে তার কোন একটা বায়না হয়ত পূরণ হয়নি । একজনের আশা ভঙ্গের করুণ চাহনীর পাশেই যেন দাঁড়িয়ে আছে অসহায় পিতার দিতে না পারার বেদনা । এ বেদনার রক্তক্ষরণ শুধু বাবারাই বুঝতে পারে । তাই অসহায়ত্ব লুকানোর জন্য কর্কশ কণ্ঠের নিস্ফল আস্ফালন ।
:ঈদের দিন ভাত খাওয়ার জন্য চাল কিনব কি দিয়ে তারই কূল কিনারা পাচ্ছি না আর লাল জামার জন্য কান্নাকাটি . . . বিড়বিড় করতে করতে ভাঙ্গাচোরা একটা ঘরে ঢুকে সলিম । একমাত্র কারন চোখের পানি না আবার রাজু দেখে ফেলে ।
:বলি আমাদের কি আর বড়লোকি সাজে ! তার পর আর বলতে না পেরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সলিম ।
সংসারটা এত কষ্টের ছিলনা সলিমের । গেল বছরে রাজুর মা এমন অসুখে পড়ল যে যম রাজুর মায়ের পাশাপাশি বেঁচে থাকার অবলম্বন জমিগুলোও নিয়ে গেল । রাবেয়া অবশ্য বলেছিল
আমার পিছনে সব নষ্ট করলে রাজুকে নিয়ে তোমার চলবে কিভাবে ? যেটুকু আছে দোহাই আর নষ্ট করিও না ।
কিন্তু রাবেয়ার জীবন যে সলিমের কাছে হাজার দোহাইর চেয়ে বড় ছিল ! তাই এক এক করে সব জমিই বন্ধক বা বিক্রীর ফলে হাতছাড়া হয়ে পড়ে । অনভ্যস্ত শরীরে অন্যের জমিতে কামলা খাটতে খাটতে নিজের শরীরটাও আর চলেনা । মেজাজটাও কেমন যেন খিটখিটে হয়ে গেছে । নাহলে কি আর বছর ছমাস আগে মা মরা ছেলেটিকে এভাবে বকা দিতে পারে ? কতইবা আর বয়স হবে রাজুর ৮ বছর সর্বোচ্চ ৯ বছর হতে পারে । মা মারা যাওয়ার পর তৃতীয় শ্রেণীতে উঠলেও আর স্কুলে যায়নি রাজু । সবসময় কেমন যেন মনমরা হয়ে থাকে । কে জানে হয়ত মায়ের চিন্তায় সবসময় অস্থির থাকে রাজু । আজ হঠাত্ পাশের বাড়ির শুভর লাল শার্ট দেখে কি মনে করে বাবাকে বলেছিল আর তার পর থেকেই গল্পের শুরু ।
বড়ই সুবোধ ছেলে সে কখনোই বাবা মায়ের অবাধ্য হয়নি । একটু বুঝিয়ে বললেই হত । এতদিন পর ছেলেটা কিছু চেয়েছে তা দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় অনেক কষ্ট বুকের ভিতর জ্বলতে থাকে সলিমের আর তার বহিপ্রকাশ হয়ে ক্ষিপ্ত কথার মাধ্যমে । তাই অনেক মন খারাপ রাজুর । বাবা আজকে তার উপর রাগ করেছে এ যেন সে ভাবতেই পারে না । সলিম ঘরে ঢোকার পর নদীর পাড়ে এসে বসে রাজু । নদীর সাথে একা একা কথা বলে দুঃখগুলোকে ভাগ করে নেয় । মা মারা যাবার পর এই নদীই তার একমাত্র বন্ধু । নদীর ঢেউগুলো তার বুকে চাপা কান্নাগুলোকে বয়ে নিয়ে যায় অনেক দুর । মাঝে মাঝে কষ্ট বেশী হলে ঢেউগুলো ঝপাত করে আছড়ে পড়ে তীরে , ভেঙ্গে যায় মাঠের ফসল ঘরবাড়ি !
:আচ্ছা বন্ধু বাবা আমায় বকল কেন ? আমি কি খুব পঁচা ?
: ছলাত্ ছলাত্ !
: জানো বন্ধু মা মারা যাওয়ার পর থেকে কেউ আমাকে আদর করে না । শুভকে কতজন খেলতে নেয় আমার বল নেই দেখে কেউ খেলায় নেয় না । আমি কি করবো বলোতো বন্ধু . . . চোখের পানি ঝড়ে পড়ে অঝোর ধারায় । বুক ফেটে যায় কিন্তু কন্ঠ থেমে যায় রাজুর ।
:ছলাত্ ছলাত্ ।
তারপর থেকে এই নদী এই গ্রাম বাবা সলিম কেউ দেখেনি এই ছোট অভিমানী ছেলেটিকে । ওই যে কষ্ট পেয়ে নদীর তীর থেকে উঠে হাঁটা ধরে রাজু তারপর বাড়ির কাছের ষ্টেশন থেকে একদম কমলাপুর ।
এখন সে এই তিন চারমাসে পুরোদস্তুর শিশুশ্রমিক । রাস্তার পাশে থাকে কাজ পাইলে খায় না পাইলে অনাহারে থাকে । এভাবেই কেটে যাচ্ছে দিনগুলো ।মায়ের কথা বাবার কথা নদীর কথা খুব মনে পড়ে রাজুর প্রায় রাতেই সে খুব কাঁদে । মাঝে মাঝে একটি ভাইয়া এসে কোন কোন দিন পূর্ণিমা রাতে রাস্তার সব ছেলেকে একত্র করে চকলেট দেয় তারপর গল্প করে মাঝরাত পর্যন্ত । রায়হান নামের এই ভাইয়াটিকে খুব ভালো লাগে রাজুর যখন চকলেট দিয়ে আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় তখন হঠাত করে মায়ের কথা মনে করে ছোট্টমনটা ডুকরে কেঁদে ওঠে । অনেক দিন রায়হান ভাইয়ের খোঁজ নেই ।কিভাবে ভাইয়ার কাছে যাওয়া যায় চিন্তা করে কূল কিনারা পায়না রাজু । এরমধ্যে হঠাত্ একদিন ভাইয়া এসে হাজির । ভাইয়া অনেক শুকিয়ে গেছে । রাজু কাছে এসে বসলেও কিছু না বলে শুধু তাকিয়ে থাকে । ভাইয়া আজকে আর গল্প বলে না শুধু বলে জেলে ছিলাম এই রাতে ছাড়া পাইলাম সবাই ভয়ে আর একটু কাছে আসে ।
রাজু তুমি তো স্কুলে পড়ছ তাই না ?
হ্যাঁ ভাইয়া ।
তোমার সবচেয়ে কি পড়তে ভালো লাগত রাজু ।
বাংলা বইয়ে ছড়া কবিতা আর গল্প ।
জানো আমি কেন জেলে গেছিলাম ?
সমস্বরে না ভাইয়া । রাজুর গলাটা সবার মধ্যে একটু চড়া ।
ওরা বলতেছে আমাদের উর্দু পড়তে , ওরা বলতেছে মায়ের ভাষাকে ভুলে যেতে বাংলাকে ভুলে যেতে . . . . । আরো অনেক কথাই ভাইয়া বলল যেন অনেক উত্তেজিত হয়ে । তার কিছু রাজু বুঝলেও বেশীরভাগই বুঝল না রাজু । তারপর ভাইয়া চলে গেল । তাকে অনেক কথা বলার ছিল রাজুর ভালোলাগার কথা মায়ের কথা কষ্টের কথা কিন্তু সেগুলো অব্যক্তই থেকে গেল । সে যে আবার বাবার কাছে ফিরে যেতে চায় কিভাবে যাবে তাও শুনত ভাইয়ার কাছে । থাক এবার আসলে শুনব ।
তারপর দিন খুব সকালে ঘুম ভাঙ্গে রাজুর । ভার্সিটির থেকে একটু দুরে চৌধুরী বাড়ির সামনে আজ ভুখা কাঙ্গালদের দাওয়াত আছে কাল আউয়াল খবরটা দিয়েছিল । কয়েকজন মিলে সেদিকে হাঁটা ধরে । ভার্সিটির গেটে আসতেই দেখে বিশাল মিছিল । হাতের সাইনবোর্ড বানান করে পড়ে রাজু রাষ্টভাষা বাংলা চাই । কালকের রায়হান ভাইয়ের কথাগুলো মনে পড়ে রাজুর । হঠাত্ রায়হান ভাইকে একপলক দেখে সবাইকে ছেড়ে দৌড় দেয় রাজু । হারিয়ে যায় জনসমুদ্রের মাঝে । খুঁজে পায়না রায়হান ভাইকে তবে ঘাতকের নিষ্ঠুর গুলি ঠিকই খুঁজে নেয় রাজুর কষ্ট পেতে পেতে জর্জরিত কচি বুককে ।
সলিম জ্বর থেকে হঠাত্ স্বপ্ন দেখে চিত্কার করে জেগে ওঠেন ।
হিসাব করে দেখেন আজ ৮ ই ফাল্গুন (২১ ফেব্রুয়ারী ) ছোট বাবা রাজু চলে যাওয়ার চারমাস পূর্ণ হলো ।
রাজুকে হারানোর পর থেকেই বিছানায় শয্যাশায়ী সলিম ।
আর রাজপথে তাজা রক্তে প্লাবিত তার সোনামানিককে নিয়ে নিথর নিশ্চল নির্বাক হয়ে বসে আছে রায়হান নামের এক অচেনা ভার্সিটি পড়ুয়া যুবক ।
একুশের গল্প। অনেক আবেগের। ধন্যবাদ আপনাকে গল্পের জন্য।
"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com
শহীদ শব্দটি এখন একটি সাধারণ শব্দ। তাই কিসের জন্য শহীদ সে বিষয় উল্লেখ জরুরী হয়ে পড়ে এ শব্দটির ব্যবহারের জন্য।
গল্পটি যার স্মরণে, তিনি একজন মুসলমান, নামে বুঝে নিচ্ছি। তাই তার জন্য দো'আ করছি, আল্লাহ্ তাকে ক্ষমা করুন, মর্যাদা দিন।
"প্রচার কর আমার পক্ষ হতে, যদি একটি কথাও (জানা) থাকে।" -আল হাদীস
নতুন মন্তব্য করুন