"হতবাক নির্বাক আমি (ছোট গল্প ২ পর্ব)"

২য়
ঘটনাঃ- সেই বোনের বড় ভাই বিয়ে করলো বাবা-মা ও আত্মীয় স্বজনদের পছন্দে! এই
পরিবারের সবাই ইসলামের মর্যাদা না বুঝলেও স্বামী দ্বীন ইসলাম বুঝার কারনে
মেয়েটা কষ্টের সাথে শশুরালয়ে নিজেকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করে! দিন তাদের
ভালোই কাটছিলো! শশুর-শাশুড়ী আর দেবরদের নিয়ে! মেয়েটা পর্দানশীল তাই
সংসারের পাশাপাশি আল্লাহর হুকুমকে প্রাধান্য দিতে সচেষ্ট হয়! স্বামীর
পরামর্শে প্রতিদিন বিকেলে শশুর-শাশুড়ীর সাথে খোশ গল্পের পাশাপাশি দ্বীনি
চর্চাও শুরু করেন! প্রতিদিন আল-কোরআন থেকে কয়েকটি আয়াত পড়েন অর্থ ও
ব্যাখ্যা সহকারে! সহীহ হাদীস থেকে হাদীস পড়েন! প্রতিদিন এক একজন সম্মানিত
সাহাবী (রাযিঃ) গণের জীবনী থেকে একটি করে ঘটনা পড়েন! প্রথম দিকে বউয়ের এসব
মানতে কষ্ট হলেও মেনে নেন সবাই! আস্তে আস্তে বউ শশুর-শাশুড়ীর খুবই প্রিয়
হয়ে যায়! দিন যেতে যেতে প্রায় চার মাস হয়ে যায় বিয়ের!

বউ শাশুড়ীকে
আস্তে আস্তে বুঝাতে থাকে ননদকে বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য! একটি ননদ, একটি বোন
তার এভাবে দুরে থাকা ঠিক নয়! আসা যাওয়া করুক সব ঠিক হয়ে যাবে! বউয়ের
পরামর্শ শুনতে শুনতে একদিন শাশুড়ী মেয়েকে বাড়িতে আসার অনুমতি দেন তার
স্বামীকে সাথে না আনার শর্তে! মেয়ে আসে বেড়াতে! একবার আসাতে প্রায় ছয়মাস
থাকে কিন্তু এসেই ভাবির পেছনে লাগেন! আবার চলে যান! প্রথমবার কোন সমস্যা
করতে না পারলেও, সমস্যা করার জন্য অব্যাহত থাকে তার চেষ্টা! এভাবে আস্তে
আস্তে প্রায় বছর খানেকই থাকা শুরু করে! আর যাওয়ার সময় ভাড়া সহ বছরের
খরচপাতি ভাইদের থেকেই নিয়ে যান!

ননদের থাকার দিনগুলো খুবই কষ্টের
সাথে পাড় করেন বউ! শাশুড়ী এতদিন বউয়ের তেমন কোন দোষই ধরেননি! ননদ আসার পর
থেকে শাশুড়ী নানান রকমের দোষ ধরা শুরু করেন! আর আস্তে আস্তে এই চর্চা বাড়তে
থাকে! এভাবে চলতে চলতে বড় ভাইয়ের সংসারে আসে নতুন মেহমান! একটি কণ্যা
সন্তান হয় তাদের! তারা খুশি হলেও শাশুড়ী-শশুর খুশি হতে পারেনি! তারপরও যার
সন্তান তারা তো আর ফেলে দিতে পারেনা! তারা আপন করে লালন-পালন করতে থাকে
প্রিয় সন্তানের!

এরপর দ্বিতীয় ছেলের বউ আসে সংসারে! সে অনেক ধনী
পরিবারের সন্তান! যোগ হয় পুরাতন কষ্টের সাথে নতুন কষ্ট! কথায় কথায় খোঁটা
দেয়া শুরু হয়! মেজু বউয়ের বাপের বাড়ি থেকে ঘরের সব ফার্ণিচার দিয়েছে!
রমাদ্বানের ঈদে সবাইকে কাপড়-চোপড় দেয়! কোরবানির ঈদে গরুর রান পাঠায়! শুরু
হয় বড় বউয়ের জীবনে কষ্টের আরেক অধ্যায়ের! স্বামী প্রবাসে থাকায় কতকিছু যে,
নির্মম ভাবে সইতে হয় তাকে! দেবরের বিয়ে উপলক্ষে ননদ ও আসে! এসেই শুরু করে
নিত্য নতুন নতুন ঝামেলা পাকানোর!

বড় ভাবির রান্না মজা না, সেমাই
রান্না করলে বেশী চিনি দেয়, বেশী ঘুমায়, এমনিতেই মোটা আর দুপুরে খেয়েই
ঘুমায় আরো মোটা হয়ে যাবে! মাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায়, এত ঘুমাতে দিবেন
না, বেশী খেতে দিবেন না, কারো সাথে মিশতে দিবেন না, শুধু শুধু কসমেটিক কিনে
টাকা খরচ করতে দিবেন না! আর শাশুড়ীও মেয়ের কথায় যেন আনন্দের সাথে সবকিছু
বাস্তবায়িত করতে থাকে! আর বিয়ের মাসেই শাশুড়ী ছেলেকে কড়া ভাবে নিশেধ করে
দেয় বউকে ব্যাংক একাউন্ট খুলে না দিতে ও মোবাইল হাতে না দিতে! সে মতে
প্রবাসী স্বামী মোবাইল ও দেয়না বউকে আর একাউন্টও খুলে দেয়না! শশুরালয়ে
থাকলে শাশুড়ীর মোবাইলে কথা বলে আর বাবার বাড়িতে থাকলে বাবার মোবাইল দিয়ে
কথা বলে!

এভাবেই ধীরে ধীরে মেয়ে বেড়াতে আসলে শাশুড়ী নতুন নতুন
ঝামেলা করতে থাকে বউয়ের সাথে! সময়ের ব্যবধানে বাড়তে থাকে শাশুড়ীর সাথে
বউয়ের দুরত্ব! কত সুন্দর পরিবেশ ছিলো আগে কেউ নিয়মিত নামাজ না পড়লেও বউ
আসার পর থেকে সবাই নিয়মিত নামাজ পড়তে শুরু করে! বউ শাশুড়ীকে কোরআন পড়তে
উৎসাহ দেয়! এবং নিজে শিখিয়ে দিতে চেষ্টা করে! বউ যখনই কোরআন পড়তে বসতো শশুর
এসে চুপচাপ বসে বসে শুনতো! আর বলতো বড়বউ এলাকার লোকেরা আমার কাছে জানতে
চায় বেয়াইর বাড়ি থেকে কি নিয়েছেন? আপনার ছেলের মত পাত্রকে তো ঘরের আসবাব সহ
কেশটাকা দেয়ার দরকার ছিলো! তখন আমি বলে দেই আমি দুনিয়া ও আখেরাত দুইটাই
পেয়েছি আমার আর কি চাই পৃথিবীতে আমার ছেলের বউ নামাজ পড়ে, নিয়মিত কোরআন
তেলোয়াত করে, পর্দায় থাকে! আমি সদাই করে দুনিয়া আখেরাত দুইটাই পেয়েছি! বউ
বলে আব্বা আমার জন্য দোয়া করবেন!

সুখ বেশীদিন স্থায়ী হলোনা! কারন
বিবেগ সম্পন্ন ব্যক্তিরা অবিবেগের মত কাজ করলে কিভাবে সুখ স্থায়ী হবে? সময়
তার আপন গতিতে চলতে থাকে! বছর ঘুরে তিন বছর শুরু হয়ে যায় বিয়ের! মেয়ের বয়স
শুরু হয় দেড় বছর! ননদের কারনে শশুর-শাশুড়ীর সাথে কিছুটা দুরত্ব হলেও সন্তান
আসার পর থেকে আরো বাড়তে থাকে সেই দুরত্ব! শশুর মনের দিক থেকে ভালো হলেও
তিনি তো সারাদিন বাসায় থাকেনা! বাসায় যারা থাকে তারাই সারাদিনের
কর্মকান্ডের কল কবজা নাড়তে থাকেন! শাশুড়ী এবার পুরোদমে বউয়ের পিছনে লাগে!
যেকোন কাজেই ভুল ধরতে থাকে! খেতে গেলে বলে বউ ভাত বেশী খায়, তরকারি বেশী
খায়! কাপড়-চোপড়, তেল সাবান, সবকিছুতেই বউ কষ্ট করতে থাকে! স্বামীকেও জানাতে
পারেনা এই দূর্ভোগের কথা কারন মোবাইল নাই!

ওদিকে স্বামীর ইকামার
সমস্যার কারনে সময়মত বাড়িতে আসতে পারেনা! আর এদিকে বউও শশুরালয়ে থাকতে
চায়না! লোকটা বউকে নিজ বাপ-মায়ের সাথে থাকার জন্য রাগারাগি-ঝগড়া-ঝাটি করতে
থাকে বউ খুব জোর করে কিছুদিন থাকে! এরপর আবার চলে যায় বাপের গরীবালয়ে!
গরীবালয়েই যেন সে খুব শান্তিতে থাকে! কারন এখানে কেউ খাবারের জন্য কিছু
বলেনা! শশুরালয়ে খাবারের কষ্টের কারনে কোলের শিশুটি পর্যন্ত ক্ষুধায় কষ্ট
পেতে থাকে! এমন কি সেই পবিত্র শিশুটি সু-চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত হয়! দুই
আড়াইশত টাকা ভিজিট দিয়ে ডাক্তার দেখায় না শশুরালয়ের লোকজন! বউও কষ্ট করতে
থাকে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর! লিষ্টি দেয় তেল, সাবান, কাপড় ধোয়ার
পাউডার, লিষ্টি জমা হতে থাকে শশুরের পকেটে আর একসময় সেটা স্থান পায় কাপড়
ধোয়ার সময় টয়লেটে! বউ সবকিছু মুখ বুঝে সহ্য করে শুধু স্বামীর উত্তম
ব্যবহারের কারনে!

ননদ যতদিন থাকেনা ততদিন শাশুড়ী কিছুটা নমনীয়
ব্যবহার করে! আর যখনই ননদ আসে তখনই শুরু হয় নির্যাতনের ষ্টীম রুলার! ননদ
বেচারি স্টার প্লাস ও স্টার জলসা দেখিয়ে দেখিয়ে মাকে শিখিয়ে দেয় বউদের
কিভাবে চালাতে হবে! শাশুড়ী এই চ্যানেল দেখে দেখে ডিগ্রী অর্জন করে বউয়ের
সাথে করতে থাকে সেই চ্যানেলের বাস্তবায়ন! বউকে মেপে মেপে খাবার দেয়া,
মানুষের কাছে সমালোচনা করা, এমন কি ছোট্ট শিশুটিও একটির বেশী দুইটি ডিম
খেতে চাইলে ননদ বলে বেশী বেশী খাইয়ে আপনার মত মোটা করবেন না ভাতিজিকে!
বাচ্চাটাও খুব কষ্ট পেতে থাকে মায়ের খাবারের অভাব হয় বলে! হঠাৎ একদিন
বাচ্চাটার খুবই পেটে সমস্যা শুরু হয়! দেবর, শশুর শুধু এলাকার ডাক্তারকে বলে
ঔষধ এনে দেয় কিন্তু সে ঔষধ খেয়ে বাচ্চাটি সুস্থ হয়না বরং আরো বেড়ে যায়
এভাবে সাতদিন চলে যায়!

তারা ভালো ডাক্তার দেখায়না বেশি ভিজিট দিয়ে!
এভাবে শিশু বাচ্চাটি অবস্থা করুণ হতে থাকে! আর চলতে পারেনা! বউ আর চুপ
থাকতে পারেনা! সে শাশুড়ীকে বলে আম্মাজান এলাকায় শিশু বিশেষজ্ঞ থাকলে ওকে
দেখান কেন যে পেট ভালো হচ্ছেনা? কয়েক বোতল ঔষধ তো খাওয়ালাম কোন কাজই তো
হলোনা! শাশুড়ী বলে উঠে এত টাকা ভিজিট দিয়ে ডাক্তার দেখানোর দরকার নাই,
দেবরকে বললে বলে আপনি বেশী বুঝেন, ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করেই তো ঔষধ
এনেছি অপেক্ষা করতে থাকুন! সুস্থ হবে ইনশা-আল্লাহ! বড়বউ খেয়াল করে তার
ছোট্ট মেয়েটা আস্তে আস্তে কেমন যেন নিথর হয়ে পড়ছে, আর সে নিজেও মেয়ের সেবা
করতে করতে প্রায় দূর্বল হয়ে পড়েছে! নিজে যতই দূর্বল হোক না কেন মেয়ের
হাসিমাখা মুখটা দেখলে তার সেই দূর্বলতা দুর হয়ে যায়! আজকে মেয়েটা
প্রতিদিনের চেয়ে বেশী দূর্বল! তাই সে হাসতেও পারছেনা! মায়ের মনে তো কষ্টের
শেষ নেই! কি হতে যাচ্ছে? সে আর ভাবতে পারেনা!

বউ আর চুপ থাকতে
পারেনা! সে মনে মনে প্রমাদ বকতে থাকে কেন যে প্রবাসীর সাথে বিয়ে হলো? না
দেখলো টাকার মুখ, না পেলো পোষাক-আষাক, আর না পেলো মোবাইল নিজের সন্তানের এই
কঠিন মূহূর্ত্বেও তার বাবাকেও জানাতে পারেনা আসল খবর! কারন শাশুড়ীর কড়া
নিষেধ ছেলেকে ভালো আছি বৈ অসুস্থতার কথা বলা যাবেনা তাতে করে ছেলে স্টোক
করবে! তাই আজকে বউ বড় বড় আওয়াজে বলে আমি আর কাউকেই অনুরোধ করবোনা! বলবোনা
আমার মেয়েকে ডাক্তার দেখানোর কথা! আজকে শশুরের এলাকা থেকে ভিক্ষা করতে করতে
যাবো শহরে কেউ কি পাঁচ টাকা করেও দেবেনা? যদি বলি আমার মেয়ে অসুস্থ তাকে
একজন শিশুবিশেষজ্ঞ দেখাবো অবশ্যই মানুষে দয়া করবে আর সেই টাকা দিয়ে আমি
আমার মেয়েকে ডাক্তার দেখাবো! মোবাইল না থাকার কারনে বউয়ের বাপের বাড়িতেও
খবর জানাতে পারেনা! বড়ই কষ্টের সেইদিন গুলো! সেই কথার পরে বউকে বাপের
বাড়িতে যাওয়ার জন্য রিকসায় তুলে দেয় দেবর!

চলছে চলবে.........।

ছবির জন্য কৃতজ্ঞতায় গুগল!

বিষয়: বিবিধ

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 1 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 1 (টি রেটিং)