সিয়াম সাধনার মাস মাহে রামাদান(৩)

بسم ا لله ا لر حمن ا لر حيم

মনীষীদের দৃষ্টিতে সিয়ামঃ
ইমাম গাযালী (রঃ): সিয়ামের উদ্দেশ্য ও মানব জীবনে এর প্রভাব সম্পর্কে ইমাম গাযালী (রঃ) বলেন:“ সিয়ামের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ খোদায়ী স্বভাবের একটি স্বাভাব নিজের মধ্যে সৃষ্টি করবে । এ গুনটি হচ্ছে সামাদিয়াত বা মুখঅপেক্ষাহীন হওয়া । মানুষ সাধ্যনুযায়ী ফেরেশতাদের অনুসরণে আত্মার কামনা-বাসনা থেকে মুক্ত হবে । কারণ ফেরশতারা কামনা-বাসনা থেকে পবিত্র এবং মানুষের মর্য়দা তো পশুর চেয়ে অনেক ঊর্ধে । তাছাড়া কামনা-বাসনাকে দমন করার জন্য তাকে বুদ্ধি ও বিবেক দান করা হয়েছে । অবশ্য ফেরশতা আর মানুষ পার্থক্য এখানে যে, মানুষের উপর কামনা-বাসনা বিজয়ী হয়ে যায় এবং এ থেকে পবিত্র হবার জন্য তাকে কঠিন মুজাহেদা করতে হয় ।যখন তার কামনা-বাসনা তার উপর বিজয়ী হয়ে যায়, যখন সে ‘আসফালা সাফেলীন’ বা সর্ব নিকৃষ্ট স্তরে পৌঁছে যায়, তখন তার মধ্যে আর পশুর মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না । আর যখন কামনা-বাসনা উপর সে বিজয়ী হয় তখন সে সর্বশ্রেষ্ট মর্য়দায় ভুষিত হয় এবং সে পৌঁছে যায় ফেরেশতা (স্বভাবের) জগতে”।

আল্লামা ইবনে কইয়্যেম (রঃ): এ কথাটাই আরো স্পষ্ট করে এভাবে বলেছেন আল্লামা ইবনে কাইয়্যেমঃ“সিয়ামের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ যেনো তার স্বভাব ও কামনার জিঞ্জির থেকে মুক্ত হতে পারে । তার জৈবিক চাহিদা শক্তির মধ্যে যেনো ভারসাম্য সৃষ্টি হয় এবং এরই মাধ্যমে যেনো চিরন্তন কল্যাণ ও সৌভাগ্যের পথে নিজেকে পরিচালিত করতে পারে এবং এ উদ্দেশ্যে নিজের আন্মাকে পরিশুদ্ধ করতে পারে । সিয়ামের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষের ক্ষুৎপিপাসার যন্ত্রণা যেনো তার কামনাকে নিয়ন্ত্রন করে এবং তার বিবেক-বুদ্ধিকে জাগ্রত করে দেয় । সে যেনো বুঝতে পারে, নিঃস্ব-ভুখা লোকদের কি বেদনা । নিজের প্রতি শয়তানের আক্রমণের পথকে যেনো সে সংকীর্ণ করে দিতে পারে । তার প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে যেনো সেসব আকর্ষণ থেকে মুক্ত রাখতে পারে যাতে দুনিয়া ও আখিরাতের অকল্যাণ রয়েছে । এ হিসাবে সিয়াম মুক্তাকীদের লাগাম, মুজাহিদদের ঢাল এবং নেক্কারদের যুহদ ও পরহেযগারী”।“সিয়াম মানুষের বাহ্যিক অঙ্গ এবং অভ্যন্তরীণ শক্তি হিফাযতে বড়ই প্রভাবশালী । মন-মগজে খারাপ চিন্তা ধূমায়িত হবার ফলে যেসব ক্ষতির আশংকা থাকে, সিয়াম তা থেকে মানুষকে হিফাযত করে । যা কিছু স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর সিয়াম সেসব দূরীভূত করে দেয় । কামনা-বাসনার পরিণতিতে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সেসব খাবাবীতে লিপ্ত হয়, সিয়াম সেগুলো দমন করে দেয় । সিয়াম স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং তাকওয়া ও পরহেযগারীর জন্য সাহায্যকারী”।আবদুল কাদের জিলানী (রঃ): মাহে রামাদান সম্পর্কে আবদুল কাদের জিলানী (রঃ)-এর উপদেশঃ“জেনে রাখো, রামাদানই পবিত্রতা অর্জন ও আত্মশুদ্ধির মাস । এ মাস খোদার অনুগত বান্দাহদের মাস । সেসব লোকদের মাস, যারা আল্লাহর স্মরণে অন্তরকে সিক্ত রাখে ।ঐসব লোকদের মাস, সত্য ও সবর যাদের ভূষণ । এ মাস যদি তোমার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে না পারে, গুনাহ থেকে তোমাকে বিরত রাখতে না পারে, বেদআতপন্থী ও বদকারদের সংশ্রব থেকে ফিরিয়ে রাখতে না পারে, তবে আর কোন জিনিস তোমাকে এসব জিনিস থেকে হেফাজত করবে? এরচেয়ে উত্তম কোনো জিনিস কি আছে, যা তোমার উপর প্রভাব ফেলতে পারবে? এমতাবস্থায় তোমার দ্বারা কোনো নেক কাজের আশা করা যায় না এবং তোমার পক্ষে কোনো বদ কাজ থেকে বিরত থাকারও সম্ভবনা দেখা যায়না । মুক্তি ও নাজাতের কোন উপায় তোমার নেই”।“রামাদান মাস তোমার দোস্ত! অশ্রু দিয়ে এই মাসকে বিদায় দাও । অন্তরের সমস্ত খারাবী দূরে নিক্ষেপ করো । বড় বেশী কান্নাকাটি করো । এতে সন্দেহ রয়েছে আগামী বছর রামাদান মাস তোমার ভাগ্যে জুটবে কিনা । অনেকের সিয়াম এমন আছে, যারা আর একটি রামাদান মাস পাবে না”।

মুজাদ্দিদে আলফেসানী (রঃ): মহে রামাদানের ফযীলত ও বরকত সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী শাইখ আহম্মদ সরহিন্দী (রঃ) বলেনঃ“এ মাসে সর্বপ্রকার কল্যাণ ও বরকতের সমন্বয় ঘটেছে । গোটা বছর মানুষ যতো বরকত হাসিল করে, তা এ মাসে বরকতের তুলনায় এতোটা তুচ্ছ, যতোটা তুচ্ছ মহাসমুদ্রের তুলনায় এক ফোটা পানি । এ মাসে যে পরিমাণ অভ্যন্তরীণ শান্তি ও সুস্থতা লাভ করা যায়, গোটা বছরের জন্য তা যথেষ্ট । পক্ষান্তরে এ মাসের অশান্তি ও মানসিক অসুস্থতা গোটা বছরের উপর প্রভাব বিস্তার করে । ঐ সব লোকেরাই সৌভাগ্যবান, এ মাস যাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলো । পক্ষান্তরে ঐসব লোকেরাই ব্যর্থ ও বদনসীব, এ মাস অসন্তুষ্ট হলো যাদের প্রতি এবং যারা বঞ্চিত হলো সর্বপ্রকার কল্যাণ ও বরকত থেকে”।

অপর একটি পত্রে হযরত শাইখ বলেনঃ “ এ মাস যদি কোনো ব্যক্তি নেক আমলের তৌফিক লাভ করে, তবে গোটা বছর এ তৌফিক ও সৌভাগ্য তার সঙ্গদান করবে । আর এ মাসটি যদি তার মানসিক অধঃপতন ও আন্তরিকতাহীনভাবে কাটে, তবে গোটা বছরই এভাবে অতিবাহিত হবার আশংকা রয়েছ”।

আল্লামা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রঃ): রামাদান মাসের সিয়াম শোকরিয়া প্রকাশের উপায় সম্পর্কে মওলানা মওদূদী (রঃ) বলেনঃ
“রামাদান মাসের সিয়ামকে কেবল ইবাদত ও কেবল তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণ হিসেবে ফরয করা হয়নি । বরং কুরআনরূপে মানব জাতির পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে যে মহান নিয়ামত আল্লাহ তায়ালা এ মাসে দান করেছেন, সিয়ামকে সে নিয়ামতের শোকরিয়া আদায়ের উপায় হিসেবেও ঘোষণা করা হয়েছে । প্রকৃতপক্ষে বিবেকমান লোকের পক্ষে তার প্রতি কোনো নিয়ামত ও অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পন্থা একটাই হতে পারে । আর তা হচ্ছে, যে মহান উদ্দেশ্যে উক্ত নিয়ামত তাকে দান করা হয়েছে, সে উদ্দেশ্য বাস্তায়নের জন্য সে আপ্রাণ চেষ্টা সাধনা করে যাবে । আল্লাহতালা কুর’আন মজীদ আমাদেরকে এ জন্য দান করেছেন যেনো আমরা তাঁর সন্তোষ বিধানের পথ ও পন্থা জেনে নিয়ে সে অনুযায়ী চলি এবং গোটা দুনিয়াকেও সে পথে পরিচালিত করি । এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এ উদ্দেশ্যে নিজেদের প্রস্তুত করার সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে সিয়াম ।

তাই কুর’আন নাযিল হবার পবত্র মাসে আমাদের সিয়াম পালন শুধু ইবাদতই নয়, কেবল নৈতিক প্রশিক্ষণের নয়; বরং সে সঙ্গে কুর’আনের মতো মহান নিয়ামতের শোকরিয়া আদায়ের সঠিক উপায়ও বটে”।

সিয়ামের সমাজিক উপকারিতা সম্পর্কে তিনি বলেনঃ
“আল্লাহতালা সকল মুসলমানের জন্য একই মাসে সিয়াম ফরয করে দিয়েছেন, যেনো আলাদা আলাদা সিয়াম পালন না করে সবাই মিলে একসঙ্গে সিয়াম পালন করে । এর মধ্যে অসংখ্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে । সব ইসলামী জনপদে এ মাসটি পবিত্রতার মাস হিসাবে গণ্য হয়ে থাকে । সারা মুসলিম দুনিয়া তখন ঈমান, খোদাভীতি, খোদার আনুগত্য, পাক-পবিত্র আচরণ ও সৎকর্মে পরিপূর্ণ হয়ে যায় । এসময় সর্বপ্রকান দুষ্কর্ম দমিত হয়, সৎকর্মকে উৎসাহিত করা যায় । সৎলোকেরা সৎকর্মে পরস্পরকে সহায়তা করে থাকেন । অসৎ লোকেরা দুষ্কর্ম করতে লজ্জাবোধ করে । ধনীর মধ্যে দরিদ্রকে সাহায্য করার উৎসাহ সৃষ্টি হয় । আল্লাহর পথে বেশী বেশী সম্পদ ব্যয় করা হয় । সকল মুসলমান একউ অবস্থায় ফিরে আসে এবং এ একই অবস্থায় এসে তারা অনুভব করে যে, মুসলমান সব এক জামায়েতের অন্তর্ভুক্ত । এ হচ্ছে তাদের মধ্যে ভ্রতৃত্বের সমবেদনা ও অভ্যন্তরীণ ঐক্য প্রতিষ্ঠার কার্য়করী পন্থা”।

শহীদ সায়্যিদ কুতুব : মাহে রামদানের সহজ সরল জীবন ব্যস্থাহ সম্পর্কে শহীদ সায়্যিদ কুতুব বলেনঃ
‘আল্লাহতালা চান তোমাদের জন্যে সহজ অবস্থা এবং তিনি কোনো কঠোরতা তোমাদের জন্যে চান না’।

দ্বীন-ইসলামের আকীদা বিশ্বাসের ভিত্তিতে যে সকল বিধান দেয়া হয়েছে সেগুলোর সব কয়টিতেই এই মহান মূলনীতি বিরাজমান । অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা বান্দার জন্যে সব কিছু সহজ করে দিতে চান, কোনো কঠোরতাই তিনি চান না ।

একথা স্মরণ রেখে যখন কেউ আল্লাহর হুকুম পালন করে তখন তার মন সজীবতায় ভরে যায়, জীবনের সকল কাজেই সে দেখতে পায় আল্লাহর হুকুম পালন করা কত সহজ ও সুন্দর । প্রত্যেক মুসলিম (আত্মসমর্পণকারী) ব্যক্তি তাঁর হুকুম পালন করতে গিয়ে নিজের মধ্যে এমন সহিষ্ঞুতার ট্রেনিং পায় যে সে কোনো কিছুতেই আর কষ্ট বা জটিলত অনুভব করে না ।

সিয়াম পালন করার কারণে কষ্ট সহ্য করার যে প্রশিক্ষণ সে পায় তার ফলে আল্লাহর সকল বিধান সকল ফরয কাজ সহ অন্যান্য সমস্ত কাজ পরিপূর্ণ নিপুণতার সাথে আদায় করা তার কাছে এমন সহজ অনুভূত হয় । যেন মনে হয়, পানির শ্রোতের মতো সব কিছু সাবলীল গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে এবং ধীর গতিতে গাছের বৃদ্ধির মতো নিশ্চিন্ত মনে ও পরিপূর্ণ নিশ্চয়াতা এবং তৃপ্তির সাথে সব কিছু সম্পন্ন হচ্ছে । সাথে সাথৈ তার চেতানান মধ্যে আল্লাহর রহমত এবং মোমেনদের জন্যে তিনি যে সর্বদা সহজ অবস্থা এবং কোনো অবস্থাতেই কঠোরতা চান না একথা সদা সর্বদা জগরুক থাকে ।

“তার গভীর অনুভূতি সক্রিয় হয়ে ওঠে । আল্লাহ তায়ালা তার অন্তরে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের মর্য়দা প্রতিষ্ঠিত করে দেন, আর তখন সে স্বতস্ফূর্তভাবে আল্লাহের শ্রেষ্ঠত্বের গান গাইতে থাকে এবং  সর্বত্র আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে ।সাথে সাথে নেয়ামত লাভ করায় সিয়াম পালন কারির অন্তর প্রাণ কৃতজ্ঞতাভারে নুয়ে পড়ে । এর ফলে সার্বিকভাবে আল্লাহর আনুগত্য অন্তরের মধ্যে পয়দা হয়ে যায় । সিয়াম আলোচনায় একেবারে শেষে এই কথাটাই বলা হয়েছে, ‘যেন তোমরা আল্লাহর ভযে বাছবিচার করে চলতে পারো’”।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)

জাযাকাল্লাহ্ খায়ের। সময়োপযোগী ও তথ্যবহুল ধারাবাহিক।

-

আমার প্রিয় একটি ওয়েবসাইট: www.islam.net.bd

ধন্যবাদ আপনাকে ।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)