প্রবাসীদের হয়রানী শুরু হয় স্বদেশে আর তীব্র থেকে তীব্রতর হয় প্রবাসে

প্রবাস শব্দটা খুব ছোট হলেও এর অর্থ অনেক ব্যাপক। পরিবারের আপনজন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন রেখে মাতৃভুমি থেকে দূরে থাকাই প্রবাস। আরেকভাবে বলা যায় পরের দেশে বাস করাই প্রবাস। যেখানে থাকেনা নিজের স্বাধীনতা, থাকেনা নিজের ইচ্ছে মতো কিছু করার সাধ্য। সব কিছু করতে হয় কর্তাদের ইচ্ছা এবং রুচির প্রতি খেয়াল রেখে। যেকোন কিছুর বিনিময়ে কর্তাকে খুশি করে দুটু পয়সা রোজগার করাটাই একমাত্র উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আজ অনেক শক্তিশালি।
প্রবাসিদের ঘাম ঝরা রেমিটেন্সে তার অন্যতম কারণ। তারপরও বর্তমান সরকার প্রবাসীদের ব্যপারে একেবারে উদাসীন। আমাদের সরকারগুলোবৈদেশিক রিজার্ভ নিয়ে গর্ব করে কিন্তু বৈদেশিক রিজার্ভ অর্জনকারী মানুষগুলো নিয়ে চিন্তা করার সময় পায়না। শুধু নিজের জন্য নয় পরিবার আর দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সচল রাখার প্রত্যয়ে মাতৃভুমির মায়া ছেড়ে ভিটে-মাটি বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমায় একজন শ্রমিক। উদ্দেশ্য নৈতিকভাবে সাবলম্বী হওয়া। কিন্তু বিদেশ নামক সোনার হরিণের দেখা পেতে নিজ দেশেই তাকে পোহাতে হয় অসহনীয় যন্ত্রণা। রিক্রুটিং এজেন্সির হয়রানী থেকে শুরু হয় প্রবাস জীবনের যন্ত্রণা। ভিটে-মাটি বিক্রি করে উচ্চসুদে টাকা নিয়ে অনেক সময় বিদেশ যাওয়া সম্ভব হয়না রিক্রুটিং এজেন্সির অর্থলোভী মানুষরুপি পশুগুলোর কারণে। মেডিকেল চেক আপে গিয়েও নানা রকম হয়রানীর শিকার হতে হয় বিদেশগামী শ্রমিকদের। মেডিকেল আনফিট নাম করে হাতিয়ে নেয় লক্ষ লক্ষ টাকা। বিদেশগামীদের মেডিকেল চেক আপের জন্য নির্ধারিত ক্লিনিকগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে আনফিট করা হয়। ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদেরকে দেয়া হয় ফিট সার্টিফিকেট। অনেক শ্রমিক এই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার ভিসার টাকা বাজেয়াপ্ত করার হুমকি দেয়া হয়।
কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো এই আনফিট শ্রমিকগুলো দেশের নামিদামি ক্লিনিকে ঐটেষ্ট করালে এখানে সেই শ্রমিকের কোনো সমস্যা পাওয়া
যায়না। আমার পরিস্কার মনে আছে ২০০৫ সালের মাঝামাঝি আমার এক নিকট আত্মীয় সৌদি আরব আওয়ার জন্য তার ভাই ভিসা পাঠায় ফকিরাপুলের মিডলইষ্ট ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরস এর মালিক ফারুক সাহেবের কাছে। শুধু ভিসা প্রসেসিং করা বাবদ ফারুক সাহেবকে দেয়া হয় ৪৫ হাজার টাকা। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। ঐ ভিসার স্লিপে মেডিকেল চেক আপের জন্য নাম আসে বনানীর মদিনা মেডিকেল সেণ্টারের। সেই হিসাবে মিডল ইষ্ট ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরস নামের একটি অফিস থেকে ঐ ক্লিনিকে টেষ্ট করতে যেতে বলা হয় এবং সাথে এও বলে দেয়া হয় ক্লিনিকে স্যাম্পল দেয়ার পর ক্লিনিকের স্লিপটি যাতে তাদের অফিসে জমা দিয়ে দেয়া হয়। সে মতেই কাজ করেন আমার বিদেশগামি আত্মীয় রকিকুল ইসলাম। ক্লিনিকে বলা হয় মেডিকেল রিপোর্টের জন্য ৩/৪দিন পর ট্রাভেলস এজেন্সিতে যোগাযোগ করার জন্য। ৩/৪দিন পর ট্রাভেলস এজেন্সিতে যোগাযোগ করা হলে রফিকুল ইসলামকে বলা হয় আপনি মেডিকেলে আনফিট আপনাকে পুনরায় মেডিকেল চেক আপ করাতে হবে। রফিকুল ইসলাম পুনরায় চেক আপের জন্য ১৮০০ টাকা পরিশোধ করে পুনরায় স্যাম্পল দেয়। কিন্তু ঘটনার কোন পরিবর্তন নাই মানে আবারো আনফিট। আর আনফিট করা হয় এক্স-রেতে। রফিকুল ইসলাম নিজের কনফিডেন্সকে আরেকটু বাড়ানোর জন্য ইবনে-সিনা ইমেজিং সেন্টারে গিয়ে ওই এক্সরে করায় ইবনে সিনা থেকে রিপোর্ট দেয়া হয় অল আর নরমাল। ইবনে সিনার রিপোর্ট নিয়ে মদীনা ক্লিনিকে গেলে তারা রেগে গিয়ে বলে ইবনে সিনার রিপোর্ট দিয়ে সৌদি আরব চলে যান আমাদের কাছে আসলেন কেনো? উপায় অন্তর না দেখে ট্রাভেলস এজেন্সিতে যোগাযোগ করা হলে তারা মেডিকেলে ফিট করার শর্তে ৩০ হাজার টাকা দাবি করেন। দরকষাকষির এক পর্যায়ে ২৫ হাআর টাকায় রাজি হয় ফারুক সাহেব। ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ফারুক সাহেব বিনা পরিক্ষায় মেডিকেল ফিট রিপোর্ট যুক্ত করে পাসপোর্টে।
এতো গেলো এক রফিকুল ইসলামের। এমন অনেক রফিকুল ইসলাম হয়রানীর স্বীকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। নিজের দেশেই যেখানে হতে হয় হয়রানীর স্বীকার সেখানে বিদেশে হয়রানীতো স্বাভাবিক ব্যাপার। তাও হতাশ নয় টাকার মেশিন নামক প্রবাসী শ্রমিকরা। বিদেশে এসে তাকে পরিচিত হতে হয় বিভিন্ন ভাষা-ভাষীর মানুষের সাথে। শিখতে হয় বিভিন্ন দেশের ভাষা। দেশে থাকতে যেখানে একজন শ্রমিকের নাস্তা সারতো পান্তা ভাত আর কাচা মরিচ দিয়ে সেখানে বিদেশে খেতে হয় রুটি আর পেপসি। বাংলাদেশী একজন শ্রমিক সৌদি আরবের বিমানবন্দরে নামার পর সেখানেও নানাভাবে হয়রানীর স্বীকার হতে হয়। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা সেখান নানান প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় বাংলাদেশী নাগরিকদের। অন্য দেশের নাগরিক বাংলাদেশিদের পরে ইমিগ্রেশনে প্রবেশ করেও বেরিয়ে যায় অনেক আগে। ইমিগ্রেশনের মতো জায়গাতেই অনেক অনেক অফিসার বাংলাদেশী নাগরিকদেরকে আলীবাবা (চোর) বলে সম্বোধন করা হয়। সে সময় এসব কুরুচিপূর্ণ কথাগুলো নীরবে সহ্য করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকেনা।
২০১০ সালের প্রথম দিকের ঘটনা এটি। মুছা মজুমদার। দেশের বাড়ী কুমিল্লা। বিমানে একসাথে সীট পড়ার কথায় হয় আমার সাথে। সেদিনই আমার সাথে তার প্রথম পরিচয়। বিমান থেকে নেমে একসাথে ইমিগ্রেশনে প্রবেশ করি আমরা দুজন। বয়সে উনি আমার চাইতে অনেক সিনিয়র সৌদি আরবেও উনি এসেছেন আমার অনেক আগে। তাই উনাকে আমার সামনে দাড়ানোর অনুরোধ করলাম। আমরা যে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম সেই ডেস্ক এর অফিসারের ব্যবহার খুব ভালো মনে হচ্ছিলোনা। ডিউটি নয় যেনো সময় পার করার মহড়া দিচ্ছিলেন। ইয়া বাঙ্গালী বলে মুছা ভাইকে ডাকলেন অফিসার। কাছে যেতেই অফিসার উনার পাসপোর্ট হাতে নিয়ে বললেন এন্তা আলীবাবা (তুই চোর?)। মুছা ভাই উত্তর দিলেন লা (না)। অফিসার বললো কুল্লু বাঙ্গালী আলীবাবা এন্তা লেস কাল্লাম লা (সব বাঙ্গালী চোর তুই না করছিস কেনো)। মুছা ভাই উত্তর দিলো কুল্লু কুল্লু সৌদি মাফি সেম সেম, ই কয়েস ফি খারাব (সব সৌদি একরকম না ভালোও আছে খারাপ ও আছে। এই কথাটিই যেনো অফিসারের আতে ঘা লেগে গেলো। অনেক তর্ক-বিতর্কের পর এন্টি সীল না মেরে তাকে বের করে দিলো। গত কয়েকদিন আগে মুছা ভাই এর সাথে কথা বলে জানতেপারলাম ওই সীলের জন্য এখন উনি দেশে যেতে পারতেছেননা। আমার দেশের সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকদের কাছ থেকে অনেক আশারবাণীর শুনতে পায় প্রবাসী বাংলাদেশী নাগরিকরা। কিন্তু বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়না।সরকার যদি এই ব্যাপারগুলো গুরুত্বের সাথে না নেয়এবং এই সমস্যাগুলোর সমাধান না করে তাহলে সেদিন বেশী দূরে নয় যেদিন প্রবাসীদের ঘাম ঝরানো টাকা দেশে আসা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ নতুন শ্রম বাজার খুজে সময় নষ্ট না করে পুরাতন শ্রম বাজারে বাংলাদেশী শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখুন।

মুল লেখা

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)

সরকার দায়িত্ব পালন করে না, কারণ জানে যে রেমিটেন্সে টান পড়বে না। সরকার খুব ভালো করে জানে এই মানুষগুলোকে টাকা দেশে পাঠাতেই হবে। তাই জিম্মী করে যতটুকু ছিবড়ে বের করে নেয়া যায়।

তবে কিছু যায়গায় দ্বিমত আছে।

পরিবার আর দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সচল রাখার প্রত্যয়ে মাতৃভুমির মায়া ছেড়ে ভিটে-মাটি বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমায় একজন শ্রমিক।

দেশের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য কেউ প্রবাসে আসে বলে এখন পর্যন্ত কাউকে দেখি নি। এইটা বাই প্রোডাক্ট।

আর প্রবাসে যে হয়রানির শিকার হতে হয় তার সিংহভাগ দায়ভার যৌথভাবে প্রবাসী এবং সরকারের।

প্রবাসীদের নিয়ে আরো লেখালেখি হওয়া প্রয়োজন। তাহলে সচেতনতা বাড়তে পারে।
আপনার অভিজ্ঞতার কথা লিখুন, লিখুন কিভাবে হয়রানি এড়ানো যেতে পারে।

লেখায় পাঁচ তারা Smiling

সুন্দর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
ব্যাক্তি ছাড়া যেমন দেশ নয় তেমনি দেশ ছাড়া ব্যাক্তিনয়।একজন ব্যাক্তি দেশের জন্য ভালো কিছু করলে যেমন দেশের সুনাম বাড়ে তেমনি দেশের একজন লোক খারাপ করলে  তার দায়ভার দেশকে নিতে হয়।তাই দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে প্রবাসীরা গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করে যাচ্ছে।

সালাম

 

কাউকে  বিশেষ করে  কোন  মুসলমানকে  প্রমাণ  ছাড়া  চোর  সম্বোধন  করা  , তার সাথে  খারাপ  ব্যবহার করা  ইসলামী  ভ্রাতৃত্ববোধের  বিরোধী ।  এসব  সমস্যা  নিয়ে    আরবীতে     বিভিন্ন  সাইটে   লেখা  দরকার  ।  যারা  বাংলা বা ইংরেজী থেকে  আরবীতে  অনুবাদ  করতে  পারেন  ,  তাদের  এগিয়ে আসা  উচিত ।   প্রবাসীরা  আরবভাষীর  কারো সাহায্য নিয়ে   বিভিন্ন  পত্রিকায়  বা   কর্তৃপক্ষের  কাছে   চিঠি  পাঠান । 

শেষ নবী বলে গিয়েছেন ,  কোন  অনারবের  উপর  আরবের   শ্রেষ্টত্ব  নেই  - এসব  কথা  তাদের  মনে করানো  দরকার । 

 

 

মেডিকেল  রিপোর্ট  যখন  দু' জায়গায়  দু'রকম  আসলো ,  তখনই   স্থানীয় কোন পত্রিকায়  যোগাযোগ করে  অভিযোগ  প্রকাশ করলে ভাল হতো ।    পত্রিকায়  কিছু  ছাপা হলে   কর্তৃপক্ষ   সামান্য হলেও  নাড়াচাড়া  করে । 

আসলে সমস্যাগুলোকে যদি আমরা কোন একদিকে ইঙ্গিত করতে চাই তাহলে পারবো না কখনোই। বহুমাত্রিকতা এসে যোগ দিয়ে দিয়ে বর্তমান অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। তাই সমাধানও ব্যাপক সময় সাপেক্ষ। অবশ্য যদি সমাধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। এখন তো সমস্যার চেয়ে সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা না করাটাই মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

t

নতুন মন্তব্য করুন

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
Smileys
:);):(:D}:):P:O8)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)