রাসায়েল ও মাসায়েলঃ পর্ব ১

সাইয়েদ আবুল আ'লা (মওলানা মওদুদী) রচিত যে বইগুলো পড়ে আমি অভিভূত হই তার মধ্যে 'রাসায়েল ও মাসায়েল' অন্যতম।

রাসায়েল ও মাসায়েল আসলে তাফহীমাত নামক যে পত্রিকা উনি সম্পাদনা করতেন তার প্রশ্নোত্তরের সংকলন। এটি বাংলায় ৮ খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে। শেষের দুই খন্ড অবশ্য জাস্টিস মালিক গোলাম আলীর উত্তরের সংকলন।

অসাধারণ সব বুদ্ধিদীপ্ত ও রেফারেন্স সমৃদ্ধ উত্তরমালা।

ইন্টারনেটে এটা থাকা খুবই প্রয়োজন। তাই সিরিজ আকারে এখানে কিছু তুলে ধরার ইচ্ছা রাখি। টাইপে ভুল ত্রুটি থাকতে পারে। তাই ধরিয়ে দেয়ার অণুরোধ রইলো। আরবী টাইপ করতে পারিনা, তাই আরবী উদ্ধৃতিও দিতে পারছি না।

 

রাসায়েল ও মাসায়েল, খন্ড ১।

-------------------------------

কতিপয় হাদীস সম্পর্কে আপত্তি ও তার জবাব

প্রশ্নঃ

রসুলুল্লাহর (স) হাদীসকে আমি কোনো কট্টর আহলে হাদীসের চাইতে কম সম্মান করি না। তাই হাদীস অস্বীকারকারীদের ফেতনা থেকে সংরক্ষিত থাকার জন্যে আমি হামেশা আল্লাহর কাছে দোয়া চাই। কিন্তু এতদসত্ত্বেও কতিপয় হাদীস সম্পর্কে বারবার আমার মনে সন্দেহ দেখা দেয়। আশা করি আপনি ওই হাদীসগুলি এবং ও গুলি সম্পর্কে আমার সন্দেহসমূহ পর্যালোচনা করে হাদীসগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবেন এবং আমার পেরেশানী ও অস্থিরতা দুর করবেন। তাহলে আমি আপনার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞ থাকবো।

নৈতিক দিক দিয়ে ক্রটিপূর্ণ হাদীস  (1)    রসুলুল্লাহর (স) গোসল সম্পর্কে হযরত আয়েশাকে (রা) প্রশ্ন করা হলে জবারে তিনি একটি পাত্র আনান এবং সামনে একটি পর্দা ঝুলিয়ে দিয়ে নিজের ভাই ও একজন গায়ের মাহরাম পুরুষের উপস্থিতিতে গোসল করেন। -(বুখারী শরীফঃ প্রথম খন্ডঃ ৩৯ পৃষ্ঠা) (2)   ‘মুতা বিবাহ’ সম্পর্কে হযরত সাবরাতুল জাহানী (রা) বর্ণিত হাদীসও আপত্তিকর। তিনি বলেনঃ আমার জনৈক সাথীর সাথে আমি বনী আমেরের জনৈক মহিলার নিকট গেলাম এবং তাকে আমাদের খেদমত পেশ করলাম। -(মুসলিমঃ তৃতীয় খন্ডঃ ৪৪৩ পৃষ্ঠা)  (3)  হযরত জাবের (রা) রেওয়ায়েত করেন যে, রসুলুল্লাহ (স) ও হযরত আবু বকরের (রা) আমলে তাঁরা এক মুঠো আটার বিনিময়ে মেয়েদেরকে ব্যবহার করতেন এবং এ কাজ থেকে হযরত উমর (রা) তাঁদেরকে নিরস্ত করেন। -(মুসলিমঃ তৃতীয় খন্ডঃ ৪৪১ পৃষ্ঠা)

(4)    হযরত জাবের (রা) বলেনঃ যিলহজ্জ মাসের পাঁচ তারিখে এহ্রাম ভেঙে আমরা অত্যধিক নারী সহবাস করলাম এবং পাঁচ তারিখের পর যখন আমরা আরাফাতের জন্যে রওয়ানা হলাম তখন ‘তাকতুরু মাযাকীরুনাল মনী’ (অর্থাৎ আমাদের পুরুষাংগ থেকে বীর্য টপকাচ্ছিল)-(মুসলিমঃ তৃতীয় খন্ডঃ ২৭৩ পৃষ্ঠা)

বৃদ্ধি ও যুক্তি বিরোধী হাদীস

(5)   হযরত আবু যার গিফারীকে (রা) রসূলুল্লাহ (স) সূর্য সম্পর্কে বলেনঃ সূর্য অস্তমিতহবার পর আরশের নীচে সিজদানত হয় এবং সকাল পর্যন্ত পূণর্বার উদিত হবার জন্যে অনুমতি চাইতে থাকে। -(বুখারী শরীফঃ দ্বিতীয় খন্ডঃ ৩৭ পৃঃ)

(6)   হযরত আবু হুরায়রার (রা) বর্ণনা অনুযায়ী একবার জাহান্নাম আল্লাহর নিকট নিঃশ্বাস আটকে যাবার অভিযোগ করে এবং নিঃশ্বাস নেবার অনুমতি চায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, তুমি বছরে দুবার নিঃশ্বাস নিতে পারো। কাজেই এথেকেই গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের সৃষ্টি হয়েছে। -(বুখারী শরীফঃ দ্বিতীয় খন্ডঃ ১৪৩ পৃঃ)

(7)    পুরুষের বীর্য হয় সাদা এবং নারীর বীর্য হয় হলুদ। বীর্যপাতের পর উভয়েল বীর্য মিশ্রিত হয়্ এ মিশ্রিত পদার্থ যদি সাদাটে রংয়ের হয়, তাহলে পুত্র সন্তান জন্ম নেয় অন্যথায় কন্যা জন্মে। -(মুসলিম শরীফঃ প্রথম খন্ডঃ ৪৬৮ পৃঃ)

(8)   সংগম করার সময় নারীর পূর্বে পুরুষের বীর্যপাত হলে সন্তান পিতার ন্যায় হয় অন্যথায় মাতার ন্যায় হয়। -(বুখারী শরীফঃ দ্বিতীয় খন্ডঃ ১৪৯ পৃঃ)

নবীদের মর্যাদাহানিকর হাদীসঃ

(9)   হযরত আবু হুরাইরার (রা) বর্ণনা অনুযায়ী হযরত ইবরাহীমের (আ) খাত্না হয়েছিল ৮০ বছর বয়সে। -(বুখারী শরীফঃ দ্বিতীয় খন্ডঃ ১৫৫ পৃঃ)

(10)          হযরত আবু হুরায়রার (রা) বর্ণনা অনুযায়ী রসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ একদিন হযরত সুলায়মান (আ) বলেন যে, আজ রাতে তিনি নিজে একশো একজন বা নিরানববাই জন স্ত্রীর মধ্যে প্রত্যেকের সাথে মিলিত হবেন এবং প্রত্যেক স্ত্রীর গর্ভে একজন করে ঘোড়সওয়ার জন্ম নেবে, তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এক ব্যক্তি বললো, অবশ্যি এই সংগে ইনশাআল্লাহও বলুন। কিন্তু হযরত সুলায়মান এর কোনো তোয়াক্কা করলেন না। অতঃপর তিনি প্রত্যেক স্ত্রীর সাথে মিলিত হলেন কিন্তু তন্মধ্যে একজন চাড়া অঅর কেউ গর্ভবতী হলো না। -(বুখারী শরীফঃ দ্বিতীয় খন্ডঃ ৯৩ পৃঃ)

(11)            হযরত হুযাইফা (রা) বলেনঃ রসূলুল্লাহ (স) একটি আবর্জনাস্ত্তপের নিকট গেলেন এবং আমার সম্মুখে দাঁড়িয়ে পেশাব করলেন। -(বুখারীঃ প্রথম খন্ডঃ ৩৬ পৃষ্ঠা)

(12)          বুখারী শরীফে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের (যাঁকে কুরআন সত্যবাদী নবী বলে সম্বোধন করেছে) তিনটি মিথ্যা কথার উলে­খ করা হয়েছে। এ তিনটি মিথ্যাও এমন মারাত্নক পর্যায়ের যে, তার কারণে কিয়ামতের দিন তিনি শাফায়াত করতেও লজ্জা অনুভব করবেন। (মুসলিমঃ প্রথম খন্ডঃ ৩৭২ পৃষ্ঠা) এর মধ্যে দুটি ঘটনার উলে­খ তো কুরআনই করেছে। কিন্তু তৃতীয় ঘটনাটি অর্থাৎ হযরত ইবরাহীমের একজন ব্যভিচারী বাদশাহর ভয়ে নিজের স্ত্রীকে বোন বলে পরিচয় দেবার ব্যাপারটির উলে­খ কুরআনে কোথাও করা হয়নি।

ন্যায় নীতি বিরোধী হাদীস

(13)         উম্মে শরীক (রা) বর্ণিত হাদীস অনুযায়ী (বুখারীঃ দ্বিতীয় খন্ডঃ ৫০০ পৃষ্ঠা) রসূলুল্লাহ (স) গিরগিটি হত্যা করার হকুম দিয়েছিলেন। কারণ হযরত ইবরাহীমকে (আ) যে আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছিল গিরগিটি ফুৎকার দিয়ে তাকে প্রজ্বলিত করেছিল। প্রশ্ন হলো, একটি গিরগিটির ফুৎকারে আগুনকে প্রজ্বলিত করার শক্তি কোথেকে আসবে? উপরনতু একটি গিরগিটির অপরাধে দুনিয়ার সমস্ত গিরগিটিকে শাস্তি দেয়া কোন্ ধরনের ইনসাফ ?

(14)           এক রেওয়ায়েত অনুযায়ী মহিলা, গাধা ও কুকুর সামনে দিয়ে চলে গেলে নামায ভেঙে যায়। -(মুসলিমঃ দ্বিতীয় খন্ডঃ ১১১ পৃঃ)

(15)          কোন পানীয় দ্রব্যের মধ্যে মাছি পড়লে তাকে চুবানি দিয়ে বের করে আনো। কারণ তার একটি পাখায় থাকে রোগ এবং অন্যটিতে থাকে ওষুধ। -(বুখারীঃ দ্বিতীয় খন্ডঃ ১১৪ পৃঃ)       

উপরোক্ত হাদীসগুলির অধিকাংশ বুখারী শরীফ থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী বুখারী শরীফ হচ্ছে কুরআনের পর সবচাইতে নির্ভুল গ্রন্থ। ‘কুরআনের পর সবচাইতে নির্ভুল গ্রন্থ’ একথার অর্থ কি এই যে, কুরআনের ন্যায় বুখারী শরীফেরও প্রতিটি অক্ষর নির্ভুল ও অপরিবর্তনীয় ? -মেহেরবানী করে এ কথাটিও পরিষ্কার করে দেবেন। 

জবাবঃ আপনার প্রশ্নে জবাব দেবার পূর্বে একটি অভিযোগ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ আপনি বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফের খন্ড ও পৃষ্ঠার উলে­খ করে সেখান থেকে উদ্ধৃত হাদীসসমূহের বরাত দিয়েছেন। অথচ দুনিয়ার বিভিন্ন প্রকাশনী হতে এই গ্রন্থ দুটি বিভিন্ন সাইজে বহুবার মুদ্রিত হয়েছে এবং আপনার নিকট এদুটির যে সংস্করণ আছে অন্যের নিকটও যে তাই থাকবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কাজেই এ ধরনের গ্রন্থের বরাত দেবার সময় হামেশা তাদের অধ্যায়ের শিরোনাম উলে­খ করা উচিত, যাতে সংশি­ষ্ট হাদীসটিকে সহজে তালাশ করা যায়।         আপনার প্রশ্নগুলি দেখে মনে হয়, সম্ভবত আপনি নিজে ভালোভাবে ঐ কিতাব দুটি অধ্যায়ন করেননি এবং হাদীস ‘অস্বীকারকারীরা’ ফেত্না সৃষ্টি করার জন্যে ‘আপত্তিকর’ হাদীসসমূহের যে ফিরিস্তি প্রকাশ করেছে তা আপনার চোখেও পড়েছে এবং সেক্ষেত্রে আপনি কেবল এতটুকুন কষ্ট স্বীকার করেছেন যে, বুখারী ও মুসলিমের পৃষ্ঠা খুলে সেখানে ঐ হাদীসগুলি উদ্ধৃত হয়েছে এটুকু দেখে নিশ্চিত হয়েছেন। আমার এই সন্দেহের কারণ হচ্ছে এই যে, আপনি যে সমস্ত হাদীস পেশ করেছেন সেগুলির অধিকাংশ এমন পর্যায়ের যে, যদি আপনি কল্পিত সন্দেহযুক্ত হাদীসগুলির সংশি­ষ্ট সমগ্র অধ্যায় পড়ে নিতেন, তাহলে সেখানেই আপনার সন্দেহের জবাব পেয়ে যেতেন। বরং অনেক হাদীসের পুরোপুরি বাক্যটিও তো আপনি পড়েননি বলে মনে হয় এবং উলি­খিত ফেত্নাবাজ দলটি নিজেদের পক্ষ থেকে সেগুলিই আপনি নকল করে দিয়েছেন। এভাবে ঐ দলটি স্বল্প শিক্ষিত ও স্বল্পবুদ্ধি লোকদেরকে প্রতারিত করে আসছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আপনার ন্যায় উচ্চশিক্ষিত লোকও এত সহজে তাদের দ্বারা প্রতারিত হচ্ছেন ! আপনি কি জানেন না, হাদীস সম্পর্কে মত প্রকাশ করার জন্যে যে সামান্য ও হালকাভাবে পড়াশুনা করাকে আপনি যথেষ্ট মনে করছেন দুনিয়ার কোনো বিদ্যা, জ্ঞান ও শিল্প সম্পর্কিত বিষয়ের ব্যাপারে তাকে যথেষ্ট মনে করা হয় না? আপনি যে ভাবে হাদীসের কতিপয় কথাকে পূর্বাপর সম্পর্ক ও বিষয়বস্ত্ত থেকে আলাদা করে এবং তাদের একেবারেই হাল্কা অর্থ গ্রহণ করে তা উদ্ধৃত করেছেন অনুরূপভাবে দুনিয়ার প্রত্যেকটি বিদ্যা, জ্ঞান ও শিল্পকে নিছক হাস্যাস্পদ করার জন্যে তাদের সংশি­ষ্ট কিতাব থেকে উদ্ধৃতাংশ পেশ করা যেতে পারে।      

   এই সংক্ষিপ্ত ভূমিকার পর এখন আমি আপনার পেশকৃত হাদীসগুলির প্রত্যেকটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো। এর ফলে কেবল আপনিই নন বরং হাদীস ‘অস্বীকারকারীদের’ ফেত্না দ্বারা প্রতারিত অন্যান্য ব্যক্তিগণও হাদীস অনুসন্ধানের যথার্থ পদ্ধতি জানতে পারবেন। 

        (১) হযরত আয়েশার (রা) গোসল সম্পর্কিত হাদীসটি বুখারী শরীফের গোসল অধ্যায়ে ‘এক সা’ ও এই পরিমাণ পানিতে গোসল’ শিরোনামে উদ্ধৃত হয়েছে, এ হাদীসে হযরত আবু সালমা (রা) বলেনঃ আমি ও হযরত আয়েশার (রা) ভাই হযরত আয়েশার (রা) নিকট গেলাম। হযরত আয়েশার ভাই তাঁকে রসূলুল্লাহর (স) গোসল সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন। জবাবে হযরত আয়েশা একটি পাত্র আনালেন। পাত্রটিতে প্রায় এক সা ( প্রায় সাড়ে তিন সের) পরিমাণ পানি ধরে। তিনি গোসল করলেন এবং নিজের মাথায় পানি ঢাললেন। তখন তাঁর ও আমাদের মধ্যে একটি পর্দা লটকানো ছিল।        

এই হাদীস সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপনকালদদের প্রথম ভুল হচ্ছে এই যে, তারা আবু সালমার নাম দেখেই মনে করেন বুঝিবা তিনি কোনো গায়ের মাহরাম ব্যক্তি হবেন। অথচ তিনি ছিলেন হযরত আয়েশার দুধ ভাগ্নে। হযরত আবুবকরের (রা) কন্যা হযরত উন্মে কুলসুম (রা) তাঁকে দুধ পান করিয়েছিলেন। কাজেই হযরত আয়েশার নিকট যে দুই ব্যাক্তি মাসায়েল জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিলেন তাঁরা তাঁর মাহরাম ছিলেন, গায়ের মাহরাম ছিলেন না।        

অতঃপর দ্বিতীয় ভূল এবং বাড়াবাড়ি হচ্ছে এই যে, হাদীসে কেবল ‘হিজাব’ অর্থাৎ পর্দার উলে­খ আছে কিন্তু আপত্তিকারীরা নিজেদের পক্ষ থেকে বাড়িয়ে বলে যে, সুক্ষ্ম পর্দা ছিল। এই বৃদ্ধির সপক্ষে যুক্তি পেশ করে তারা বলেন যে, পর্দা যদি সুক্ষ্ম না হতো এবং তার অন্তরাল থেকে হযরত আয়েশার গোসল দৃষ্টিগোচর না হতো, তাহলে মাঝখানে তা ঝুলিয়ে দিয়ে গোসল করায় লাভ কি ? অথচ কোন্ বিষয়ের অনুসন্ধানের জন্যে তারা দু’জন নিজেদের বোন ও খালার নিকট গিয়েছিলেন, একথা যদি আপত্তিকারীরা জানতেন, তাহলে তারা নিজেদের প্রশ্নের জবাব পেয়ে যেতেন এবং পর্দাটি মোটা ছিল কি পাতলা ছিল, একথা চিন্তা করার কোন প্রয়োজনই হতো না।        

আসলে গোসলের পদ্ধতি কি ছিল, একথা জানার প্রশ্ন সেখানে ছিল না। সেখানে প্রশ্ন ছিল যে, গোসলের জন্যে কতটুকু পানি যথেষ্ট ? অনেকে রসূলুল্লাহর (স) এ হাদীস শুনেছিলেন যে, তিনি গোসলের জন্যে এক সা’ (প্রায় সাড়ে তিন সের) পরিমাণ পানি নিতেন। এই সামান্য পরিমাণ পানিকে লোকেরা গোসলের জন্যে অকিঞ্চিত মনে করতো। তাদের বিভ্রান্তির কারণ ছিল এই যে, তারা নাপাকি থেকে পাক হবার জন্যে গোসল ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্যে গোসলের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেনি। হযরত আয়েশা তাঁদেরকে শিক্ষা দেবার জন্যে মাঝখানে একটি পর্দা ঝুলিয়ে দেন। এর ফলে দর্শকদ্বয় কেবল তাঁর মাথা ও চেহারা দেখতে পায়। অতঃপর পানি আনিয়ে তিনি নিজের মাথায় ঢালেন। এভাবে হযরত আয়েশা (রা) তাঁদেরকে একই সংগে দুটি কথা জানাতে চাচ্ছিলেন। এক, পবিত্রতা অর্জনের জন্যে যে গোসল করা হয় তাতে কেবল গাত্রে পানি ঢালাই যথেষ্ট। দুই, এজন্যে কেবল এক সা’ পরিমাণ পানি যথেষ্ট।        

 এই ব্যাখ্যার পর আপনি নিজেই চিন্তা করুন, অযথা একটি নির্ভরযোগ্য হাদীস অস্বীকার করার অতঃপর সমস্ত হাদীসের অনির্ভরযোগ্য হবার জন্যে একে প্রমাণ স্বরূপ গণ্য করার মতো কোনো আপত্তিকর বিষয় এতে আছে কি ?       

  (২-৩) হযরত সাবরাতুল জাহানী (রা) ও হযরত জাবের (রা) বর্ণিত হাদীস দুটি মুসলিম শরীফের ‘মুতা বিবাহ’ অধ্যায়ে উদ্ধৃত হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আপত্তিকারীরা নিছক আপত্তি করার জন্যে হাদীস তালাশ করতে থাকে এবং এ দুটি হাদীসকেও তাদের ফিরিস্তিতে জুড়ে নেয়। অন্যথায় যদি তারা মুতার তাৎপর্য ও স্বরূপ জানবার চেষ্টা করতো এবং এ ব্যাপারে ফকীহগণের মধ্যে কোন্ ধরনের বিতর্ক দেখা দিয়েছিল আর ঐ বির্তকের মীমাংসার জন্যে মুহাদ্দিসগণ মুতার বৈধতা ও হারাম হওয়া সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত হাদীসসমূহ কি উদ্দেশ্যে নিজেদের কিতাবসমূহে উদ্ধৃত করেছেন, একথাও জানবার চেষ্টা করতো, তাহলে হয়তো এ হাদীসগুলির ওপর তাদের কৃপাদৃষ্টি পড়তো না।        

 আসল ব্যাপার হচ্ছে এই যে, ইসলামপূর্ব জাহেলী যুগে বিবাহের যে সমস্ত পদ্ধতি প্রচলিত ছিল তন্মধ্যে ‘মুতা বিবাহ’ও অন্যতম। অর্থাৎ কোনো মহিলাকে কোনো কিছুর বিনিময়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে বিবাহ করা হতো। রসূলুল্লাহর (স) নীতি ছিলঃ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কোনো বস্ত্ত বা বিষয় নিষিদ্ধ হবার নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তিনি পূর্ব প্রচলিত পদ্ধতি বতিল করতেন না বরং সেগুলির প্রচলন সম্পর্কে খামুশ থাকতে অথবা প্রয়োজনকালে অনুমতি দিতেন। মুতার ক্ষেত্রেও এই একই ব্যাপারের পুনরাবৃত্তি ঘটে। প্রথম দিকে তিনি এ ব্যাপারে খামুশ থাকেন এবং পরে কোনো যুদ্ধ বা সফরকালে লোকেরা কামপ্রবৃত্তির তীব্রতা প্রকাশ করলে তিনি এর অনুমতি দেন। কারণ তখনও এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আসেনি। অতঃপর নিষেধাজ্ঞা এসে পৌঁছলে তিনি একে পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কিনতু এ নিষেধাজ্ঞা যথাসময়ে সমস্ত লোকের নিকট পৌঁছতে পারেনি এবং এর পরও কিছু লোক অজ্ঞতার কারণে ‘মুতা বিবাহ’ করতে থাকে। অবশেষে হযরত উমর (রা) তাঁর আমলে এ নিষেধাজ্ঞাটির ব্যাপক প্রচার করেন এবং পূর্ণ শক্তিতে এর প্রচলন বন্ধ করেন 

        এ বিষয়ে ফকীহগণের সম্মুখে বিভিন্ন প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। যেমন, রসূলুল্লাহ (স) কখনো কি এর সুম্পষ্ট অনুমতি দিয়েছিলেন ? দিয়ে থাকলে কি অবস্থায় ও কখন দিয়েছিলেন? তিনি কি এ সম্পর্কে কখনো নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন ? জারি করে থাকলে কখন জারি করেছিলেন এবং তার শব্দাবলী কি ছিল ? এ ছাড়া এটিকে কি রসূলুল্লাহ (স) নিজেই হারাম করেছিলেন, না হযরত উমর (রা) নিজ দায়িত্বে এর প্রচলন বন্ধ করেছিলেন এই ধরনের বিভিন্ন প্রশ্ন সম্পর্কে অনুসন্ধান চালাবার এবং যাচাই-পর্যালোচনা করার জন্যে ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ এ সম্পর্কিত বিভিন্ন হাদীস সংগ্রহ করার প্রয়োজন অনুভব করেন। এ প্রসংগে আপত্তিকারীরা আপত্তি করার জন্যে যে হাদীস দুটি বাছাই করে নিয়েছে ইমাম মুসলিম সে দুটিরও উলে­খ করেছেন।   

      এর মধ্যে একটি হচ্ছে জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বর্ণিত হাদীস। এতে তিনি বলেন যে, তাঁরা রসূলুল্লাহ (স) ও হযরত আবুবকর সিদ্দীকের (রা) আমলেও মুতা করতেন। অতঃপর হযরত উমর (রা) তাঁর আমলে এর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। অন্য হাদীসে হযরত সাব্রাতুল জাহানী (রা) বলেনঃ মক্কা বিজয়ের সময় রসূলুল্লাহ (স) এর অনুমতি দেন। কাজেই আমি নিজেই একটি চাদরের বিনিময়ে জনৈক মহিলার সাথে মুতা বিবাহ করি। কিন্তু ঐ একই যুদ্ধের সময় রসূলুল্লাহ (স) ঘোষণা করেন যে, আল্লাহ তাআলা মুতা বিবাহকে কিয়ামত পর্যন্ত হারাম করে দিয়েছেন। এ ছাড়া এই বিষয়ের বিভিন্ন দিকের ওপর আলোকপাত করে এ ধরনের বিভিন্ন হাদীস ইমাম বুখারী ও মুসলিম এবং অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ সংগ্রহ করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, মুহাদ্দিসগণ এ হাদীসগুলি সংগ্রহ না করলে ইসলামী আইন প্রণেতারা কিসের ভিত্তিতে মুতার বৈধতা ও অবৈধতার সিদ্ধান্ত করতেন ?   

     (৪) হযরত জাবের (রা) বর্ণিত এ হাদীসটি মুসলিম শরীফের হজ্জ অধ্যায়ে ‘ইহরাম প্রসংগে’ শিরোনামে উলি­খিত হয়েছে। এ শিরোনামে ইহ্রামের নিয়মাবলী সম্পর্কিত হাদীসসমূহ একত্র করা হয়েছে। এ প্রসংগে ইমাম মুসলিম হযরত জাবেরেও বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন। এতে তিনি বলেনঃ আমরা কেবল হজ্জের নিয়ত করে মদীনা থেকে বের হয়েছিলাম। ৪ঠা যিলহজ্জ তারিখে রসূলুল্লাহ (স) মক্কায় পৌঁছে বললেন যে, তোমাদের মধ্য থেকে যারা হাদী (কোরবানীর পশু) আনেনি ইহরাম খুলতে পারে এবং নিজেদের স্ত্রীদের সাথে মিলিত হতে পারে। এটা তাঁর নির্দেশ ছিলনা বরং তিনি বলতে চাচ্ছিলেন যে, তোমরা ইহরাম খুলে এমনটি করতে পারো। কাজেই আমরা কাবা শরীফের তাওয়াফ এবং সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করার পর নিজেদের স্ত্রীদের নিকট গেলাম। এসময় যারা ইহ্রাম খূলতে ইতস্তত করছিল রসূলুল্লাহ (স) তাদেরকে বুঝালেনঃ আমি তোমাদের চাইতে আল্লাহকে অধিক ভয় করি। যদি আমি হাদী সংগে করে না আনতাম, তাহলে তোমাদের সাথে আমিও ইহরাম খুলতাম। একথা শুনে সবাই নিশ্চিত হয়ে তাঁর নির্দেশ পালন করলো।         এ ঘটনা বর্ণনা করার পেছনে হযরত জাবেরের (রা) যে উদ্দেশ্য কার্যকর ছিল তা ছিল এই যে, এর পরও বহু লোকের মন থেকে এ সন্দেহ নির্মুল হয়নি যে, ইহরাম বেঁধে হজ্জের পুর্বে মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার মধ্যস্থলে দৌড়াদৌড়ি করার পর কোনো ব্যক্তি ইহরাম খুলতে পারে কিনা এবং হজ্জের জামানায় সে হারেম শরীফ থেকেই ইহরাম বাঁধতে পারে কিনা। এই সন্দেহ নিরসনের জন্যেই হযরত জাবের (রা) অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বলেনঃ রসূলুল্লাহর (স) জামানায়ও আমরা এমন অবস্থায় আরাফাতে পৌঁছেছিলাম যখন ‘তাকতুরু মাযাকিরুনাল মনী’। এই প্রকাশভংগীর কারণে যদি কেউ নাসিকা কুঞ্চন করতে চান, তাহলে করতে পারেন, তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু এর মাধ্যমে হযরত জাবের (রা) ঐ সন্দেহবাদীদেরকে যেকথা বলতে চাচ্ছিলেন তা ছিল এই যে, আরাফাতে পৌঁছবার মাত্র একদিন পূর্বে তাঁরা স্ত্রী সহবাস করেছিলেন অতঃপর সদ্য ইহরাম বেঁধে বের হয়েছিলেন। এসবকিছু তাঁরা রসূলুল্লাহর (স) নির্দেশ অনুযায়ী করেছিলেন। কাজেই এরপর আর কারুর সন্দেহ করার কোনো যুক্তিসংগত কারণ থাকতে পারে না।       

  (৫) হযরত আবু যার গিফারীর (রা) এ হাদীসটি বুখারী শরীফের সৃষ্টির প্রারম্ভ অধ্যায়ে ‘সূর্য ও চন্দ্রের গুণাবলী’ শিরোনামায় উদ্ধৃত হয়েছে। আপনি এর যে সংক্ষিপ্তসার পেশ করেছেন তা যর্থাথ নয়। এর সঠিক তর্জমা নিম্নরূপঃ        রসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ জানো, সূর্য অস্তমিত হয়ে কোথায় যায় ? আমি বললামঃ আল্লাহ  ও তাঁর রসূল ভালো জানেন। তিনি বললেনঃ সূর্য গিয়ে আরশের নীচে সিজদা করে এবং অনুমতি চায় (আবার পূর্ব দিক থেকে উদিত হবার) এবং তাকে অনুমতি দান করা হয়। এমন এক সময় আসবে যখন সে সিজ্দা করবে এবং অনুমতি চাইবে কিন্তু তাকে অনুমতি দেওয়া হবে না। তাকে নির্দেশ দেয়া হবে ফিরে যাও। তখন সে পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে। অতঃপর রসূলুল্লাহ (স) এ আয়াতটি পড়েনঃ
                   আরবি        অর্থাৎ সূর্য তার কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে এটি হচ্ছে সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ আল্লাহ নির্ধারিত।         এর মধ্যে আসলে যে বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, সূর্য প্রতিমুহূর্তে আল্লাহর হুকমের অনুগত। সে আল্লাহর হুকুমে উদিত হয় এবং তাঁরই হুকুমে অস্তমিত হয়। বলা বাহুল্য, আমরা নামাযের মধ্যে যেমন সিজ্দা করে থাকি সূর্য়ের সিজ্দা করা ঠিক সেই অর্থে, যে অর্থে কুরআনে দুনিয়ার প্রত্যেকটি বস্তুকে আল্লাহর সম্মুখে সিজ্দানত বলে উলে­খ করে। অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশের পূর্ণ অনুগত। আবার সূর্যের পশ্চিমও একটি নয় বরং কুরআনের দৃষ্টিতে সূর্যের পশ্চিম হচ্ছে বহু। কারণ প্রতি মুহূর্তে সে দুনিয়ার একটি স্থানে উদিত হয় এবং অন্য স্থানে অস্তমিত হয়। কাজেই অনুমতি নিয়ে উদিত ও অস্তমিত হবার অর্থ হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর অধীন থাকা আর কোনো সময় পশ্চিম থেকে উদিত হওয়াও কোনো আশ্চর্য ব্যাপার নয়। বিশ্বজাহানের আবর্তন ও মাধ্যাকর্ষণ নীতি এবং গ্রহ-নক্ষত্রের গতি যে কোনো মুহূর্তে ওলট-পালট হয়ে যেতে পারে। বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদগণের মধ্যে একজনও এই নীতিকে অপরিবর্তনীয় বলে স্বীকার করেন না এবং এব্যাবস্থার মধ্যে কোনো পরিবর্তন সূচিত হওয়া বা এর সম্পুর্ণ ওলট-পালট হয়ে যাওয়াকে অসম্ভব মনে করেন না। 

        অবশ্যি এ হাদীসে উদয়াস্তকে সূর্যের আবর্তনের ফল মনে করা হয়েছে, পৃথিবীর আবর্তনের ফল মনে করা হয়নি। এ সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপনকারীদের দুটি কথা ভালোভাবে জেনে রাখা উচিত। এক, আল্লাহর নবীগণ বিজ্ঞান, জ্যোতিবিদ্যা ও রসায়নবিদ্যা সম্পর্কিত বিষয়াবলীর জ্ঞান দান করার জন্যে দুনিয়ায় আসেননি বরং সত্যের নিগুঢ় তত্ব বর্ণনা করার এবং চিন্তা ও কর্মের পরিশুদ্ধির জন্যে দুনিয়ায় এসেছিলেন। পৃথিবী ঘুরে না সূর্য ঘুরে একথা ব্যক্ত করা তাঁদের কাজ ছিল না। বরং তাঁরা ব্যক্ত করতে চাচ্ছিলেন যে, একই আল্লাহ পৃথিবী ও সূর্যের মালিক, শাসক ও পরিচালক এবং প্রত্যেকটি বস্ত্ত প্রতি মুহূর্তে তাঁরই বন্দেগী করছে। দুই, প্রচারকের সমকালীন বস্ত্ত-বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে হাজার বছর পরের বস্ত্ত-বিজ্ঞানবকে সত্যের নিগূঢ় তত্ত্ব শিক্ষা দানের মাধ্যমে পরিণত করা প্রচার টেকনিকের পরিপন্থী। সত্যের যে নিগূঢ় তত্ত্ব হৃদয়ংগম করাবার দায়িত্ব তাঁর ওপর বর্তায়, তাকে যথাযথরূপে হৃদয়ংগম করাবার জন্যে তাঁকে অবশ্যি নিজের যুগের জ্ঞান বিজ্ঞানের সাহায্য গ্রহণ করতে হয়। অন্যথায় শত শত বছর পর মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান যে পর্যায়ে উপনীত হবে তার ভিত্তিতে যদি তিনি সত্যের বাণী প্রচার করতে থাকেন, তাহলে তাঁর সমকালীন লোকেরা তাঁর শিক্ষাকে শিঁকেয় তুরে রেখে তিনি কী আশ্চর্য ও বিস্ময়কর কথা বলছেন, সে আলোচনায় মও হয়ে উঠবে। তিনি যে শিক্ষা প্রচার করছিলেন, তাতে একজন ও প্রভাবিত হবে না। এখন আপনি নিজেই চিন্তা করুন, কোনো নবীর শিক্ষা যদি তাঁর সমকালীন লোকেরা বুঝতে না পারে এবং তাঁর যুগের লোকদের মধ্যেই যদি তা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম না হয়, তাহলে পরবর্তী যুগের লোকদের নিকট তা কেমন করে পৌছবে ? আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে যদি উপরোলি­খিত হাদীসটি অর্থ এমনভাবে বর্ণনা করা হতো যার ফলে শ্রোতা সূর্যের পরিবর্তে পৃথিবীর আবর্তনকে উদয়াস্তের কারণ মনে করতো, তাহলে অবশ্যি আজকের যুগের লোকেরা একে একটি অলৌকিক তত্ত্ব মনে করতো, এতে সন্দেহ নেই কিন্তু আপনার মতে তৎকালীন লোকেরা এই অলৌকিক তত্ত্বকে কিভাবে স্বাগতম জানাতো ? উপরন্তু এই তত্ত্বের মাধ্যমে যে প্রকৃত সত্য তাদের মন-মস্তিষ্কে অনুপ্রবেশ করানো আসল উদ্দেশ্য ছিল, তাতে কতদুর সাফল্য অর্জিত হতো ? আর সেই যুগের লোকেরাই যখন এই ধরনের ‘‘অলৌকিক তত্ত্বের’’ বদৌলতে ঈমান আনা থেকে বঞ্চিত থাকতো, তখন এই অলৌকিক তত্ত্ব আপনাদের নিকট পৌঁছুতই বা কেমন করে এবং আপনাদের নিকট না পৌঁছলে তার ওপর বাহ্বা দেবার সুযোগই বা আপনারা পেতেন কেমন করে ?       

 (৬) হযরত আবু হোরাইরা (রা) বর্ণিত এ হাদিসটি বুখারী শরীফের নামাযের সময় অধ্যায়ে ‘গ্রীষ্মকালে ঠান্ডার মধ্যে যোহরের নামায পড়া’ শিরোনামে উদ্ধৃত হয়েছে। এর সংক্ষিপ্তসারও আপনি যথার্থভাবে বিবৃত করেননি। এর সঠিক তরজমা নিম্নরূপ। রসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ গরমের সময়ে যোহরের নামায ঠান্ডা করে পড়ো (অর্থাৎ দেরী করে পড়ো, যখন রৌদ্রের প্রাখর্য কমে যায়)। কারণ গ্রীষ্মের প্রাখর্য হচ্ছে জাহান্নামের ফূৎকার। জাহান্নাম তার রবের নিকট অভিযোগ করে, হে আমার রব ! আমার অংশগুলি পরস্পরকে খেয়ে ফেলছে। তার রব তাকে দু’বার নিঃশ্বাস নেবার অনুমতি দেন ! একবার শীতকারে এবং অন্যবার গ্রীষ্মকালে। গ্রীষ্মকালে তোমরা যে তীব্রতম উত্তাপের সম্মুখীন হও জাহান্নামের উষ্ণশ্বাস ঠিক সেই পর্যায়ের উত্তপ্ত হয়। অনুরূপভাবে শীতকালে তোমরা যে তীব্রতম শীতের সম্মুখীন হও জাহান্নামের শীতল শ্বাস ঠিক তেমনি হিমশীতল হয়।’’        

 এ হাদীসটি সম্পর্কে আপত্তি করার পূর্বে একটি বিষয় চিন্তা করুন যে, এ হাদীসটি বর্ণনা করার পেছনে রসূলুল্লাহর (স) কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে ? তিনি কি একজন ভূ-বিজ্ঞানীর ন্যায় ঋতু পরিবর্তনের কারণ বর্ণনা করতে চাচ্ছিলেন ? অথবা একজন নবী হিসেবে উত্তাপের কষ্ট অনুভবকারীদের মনে জাহান্নামের ধারণা সৃষ্টি করতে চাচ্ছিলেন ? কুরআন ও রসূলুল্লাহর (স) জীবন সম্পর্কে যে ব্যক্তি সামান্য চিন্তাও করেছে সে নির্ধ্বিধায় বলে দেবে যে, রসূলুল্লাহ (স) প্রথম দলের নন দ্বিতীয় দলের অন্তর্ভূক্ত। আর গ্রীষ্মের তীব্রতা যখন চরমে পৌঁছে, তখন যোহরের নামায ঠান্ডা করে পড়ার হুকুম দিয়ে তিনি যা কিছু বলেছেন তার মাধ্যমে তিনি মানুষকে জাহান্নামের ভয় দেখাতে এবং যে সব কাজ মানুষকে জাহান্নামের দিকে পরিচালিত করে সেগুলি থেকে তাকে বিরত রাখতে চাচ্ছিলেন। এ দিক দিয়ে তাঁর এ বাণী তাবুক যুদ্ধের সময় অবতীর্ণ কুরআনের এ বাণীর সাথে সামঞ্জস্যশীলঃ
                   আরবী

        অর্থাৎ ‘‘তারা বললোঃ এই ভীষণ গরমের মধ্যে জিহাদে রওয়ানা হয়ো না ! হে নবী ! তুমি তাদেরকে বলে দাও, জাহান্নামের আগুন এর চাইতেও গরম।’’ কুরআন যেমন এখানে বিজ্ঞানের কোনো বিষয় বর্ণনা করছেনা অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহর (স) এ হাদীসও বিজ্ঞানের শিক্ষা দান করার জন্যে উক্ত হয়নি। কুরআন দুনিয়ার গরমকে জাহান্নামের সাথে তুলনা করেছে। এর কারণ হচ্ছে এই যে, এর পটভূমিকায় এমনসব লোক ছিল যারা এই গরমের ভয়ে ভীত হয়ে জিহাদে যেতে গড়িমসি করছিল। অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহরও (স) দুনিয়ার তীব্রতম উষ্ণতা ও তীব্রতম শৈত্যকে মাত্র জাহান্নামের দুটি ফুৎকারের সমান বলার কারণ হচ্ছে এই যে, তার সম্মুখে এমন অনেক লোক ছিল যারা শীতকালে ফজরের এবং গ্রীষ্মকালে যোহরের নামাযের জন্যে বের হতে ভয় করছিল। মুসনাদে আহমদে জায়েদ ইবনে সাবেতের (রা) এ বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছেঃ

                   আরবী

        অর্থাৎ ‘রসূলুল্লাহর (স) সাহাবাগণের জন্যে যোহরের নামাযের চাইতে কঠিন নামায আর কিছুই ছিল না।’ গ্রীষ্মকালের দুপুরে যে ব্যক্তি কোনোদিন আরবে অবস্থান করেছেন তিনি এ কথার সত্যতা স্বীকার করবেন।         অতঃপর হাদীসের আসল শব্দের আলোচনায় আসুন।

                   আবরী

        (উত্তাপের প্রাখর্য জাহান্নামের ফূৎকার)- এর অর্থ অবশ্যি এ নয় যে, জাহান্নামের ফূৎকারে দুনিয়ার উত্তাপ সৃষ্টি হয়। বরং এর অর্থ এও হতে পারে যে, দুনিয়ার এই উত্তাপ জাহান্নামের ফূৎকারের ন্যায় বা ঐ জাতীয়। কারন আরবী ভাষায় ‘মিন’ শব্দটি এক জাতীয় বা এক ধরনের বস্ত্ত বিবৃত করার জন্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, কুরআনেও এর বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। যেমনঃ

                   আবরী

        আর শেষ বাক্যটিতে একথা বলা হয়নি যে, জাহান্নামের ঐ দুটি ফূৎকারের কারণ দুনিয়ায় গ্রীষ্মকাল ও শীতকাল সৃষ্টি হয়। বরং সেখানে আসল শব্দ হচ্ছেঃ

                   আরবী

        অর্থাৎ তার রব তাকে দু’বার নিঃশ্বাস ফেলার অনুমতি দেন। একবার শীতকালে এবং আর একবার গ্রীষ্মকালে। তোমরা যে তীব্রতম গরম অনুভব করো গ্রীষ্মকালের শ্বাসটি ঠিক তদ্রুপ এবং তোমরা যে তীব্রতম শীত অনুভব করো শীতকালের শ্বাসটি ঠিক তদ্রুপ। 

        (৭-৮) এ হাদীস দুটি মুসলিম শরীফের হায়েয অধ্যায়ে নারী ও পুরুষের বীর্যের স্বরূপ শিরোনামে এবং বুখারী শরীফের ইল্‌ম, গোসল, আদম ওনবী অধ্যায়ে বিভিন্ন শিরোনামে উল্লেখিত হয়েছে। কিন্তু এগুলির অর্থও আপনি ভুল বর্ণনা করেছেন। আসলে বিভিন্ন হাদীসে যে কথাটি বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে এইঃ      

  উম্মে সলীম (রা) এসে রসূলুল্লাহকে (স) জিজ্ঞেস করেনঃ পুরুষরা স্বপ্নে যা কিছু দেখে মেয়েরাও যদি স্বপ্নে তাই দেখে (অর্থাৎ যদি স্বপ্নদোষ হয়) তাহলে কি করবে ? রসূলুল্লাহ (স) জবাব দেনঃ তাহলে গোসল করবে। একথা শুনে হযরত উম্মে সাল্‌মা (রা) জিজ্ঞেস করেনঃ মেয়েদেরও এমন হয় ? তাঁর বক্তব্য ছিল এই যে, মেয়েদেরও কি স্বপ্নদোষ ও বীর্যপাত হয় ? রসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ

আরবী        ‘‘অবশ্যি ! নয়তো সন্তান মায়ের মতো হয় কেমন করে ? পুরুষের বীর্য হয় ঘন এবং সাদাটে আর নারীর বীর্য হয় পাতলা এবং হলুদ। অতঃপর তাদের মধ্য থেকে যে শক্তিশালী হয় বা যে অগ্রবর্তী হয় সন্তান তারি মতো হয়।’’     

   অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে, জনৈক মহিলার প্রশ্নে হযরত আয়েশাও (রা) অনুরূপ বিষ্ময় প্রকাশ করলে রসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ

আরবী        ‘সন্তানের মায়ের ন্যায় হবার পেছনে কি এছাড়া অন্য কোনো কারন থাকতে পারে ? যখন নারীর বীর্য পুরুষের বীর্যের ওপর আধিপত্যশার্লী হয়, তখন সন্তান মাতামহের খান্দানের লোকদের অনুরূপ। হয়। আর যখন পুরুষের বীর্য নারীর বীর্যের ওপর আধিপত্যশালী হয়, তখন সন্তান পিতামহের খান্দানের লোকদের অনুরূপ হয়।’     

   অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে, জনৈক ইহুদী আলিম রসূলুল্লাহর (স) নিকট সন্তান সম্পর্কে প্রশ্ন করলে জবাবে তিনি বলেনঃ

আরবী        ‘‘পুরুষের বীর্য সাদাটে এবং নারীর বীর্য হলুদ হয়। যখন এ দুটি মিলিত হয় এবং পুরুষের বীর্য নারীর বীর্যেব ওপর আধিপত্যশালী হয় তখন আল্লাহর হুকুমে পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করে। আর যখন নারীর বীর্য পুরুষের বীর্যের ওপর আধিপত্যশালী হয়, তখন আল্লাহর হুকুমে কন্যা সন্তান জন্মলাভ করে।’’        জানি না আপনি কোন্ শব্দটি থেকে এ অর্থ গ্রহণ করেছেন যে, ‘‘এই মিশ্রিত পদার্থটি সাদাটে হলে পুত্র সন্তান জন্মে অন্যথায় কন্যা সন্তান জন্মে’’। উপরন্তু আপনি কোন্ বাক্যটির এ তর্জমা করেছেন যে, ‘‘যদি মিলনের সময় নারীর পূর্বে পুরুষের বীর্যপাত হয়, তাহলে সন্তান পিতার ন্যায় হয় অন্যথায় মাতার ন্যায় ? ’’ আসল হাদীসে যে কথা বলা হয়েছে তার বুদ্ধি-জ্ঞান বিরোধী হবার ব্যাপারে যদি কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকে, তাহলে পেশ করা হোক। 

        (৯) এই ধরনের হাদীস বুখারী শরীফের আম্বিয়া, অনুমতি প্রার্থনা ও আকীক অধ্যায়ে উলি­খিত হয়েছে্ কিন্তু সর্বত্র ‘ইখতাতানা’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে এই যে, হযরত ইবরাহীম (আ) স্বহস্তে নিজের খাতনা করেছিলেন। আর কোনো ব্যক্তি নিজেই যখন একাজ করতে পারেন, তখন ৮০ বছরের এক বৃদ্ধ ডাক্তার ডাকয়য়ে একাজ সমাধা করেছেন, এ অর্থ কেন গ্রহণ করা হয়? উপরন্তু মুসনাদে আবী লায়লার উলি­খিত হাদীসে এর যে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় তা ব্যাপারটিকে একেবারেই পরিষ্কার করে দেয়। অর্থা হযরত ইবরাহীম (আ) নিজে নিজেই একজটি সমাধা করেছিলেন। মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে যখন ইবরাহীমকে (আ) খাত্না করার হুকুম দেয়া হয়, তখন তিনি কুদুম (কর্মকারের একটি অস্ত্র) নিয়ে স্বহস্তে খাত্না করে নেন। এর ফলে তাঁর ভীষণ কষ্ট হয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে ওয়াহী নাযীল হয়ঃ ‘হে ইবরাহীম ! তুমি চটপট কাজটা সমাধা করলে, নয়তো আমি নিজেই তোমাকে এর উপযোগী যন্ত্রের সন্ধান দিতাম। তিনি বললেনঃ হে আমার রব ! তোমার হুকুম তামিল করতে বিলম্ব হবে, এটা আমার পসন্দ হলো না।                                                         (ফতহুল বারীঃ ৬ষ্ঠ খন্ডঃ ২৪৫ পৃঃ) 

       (১০) এ বিষয়বস্ত্ত সম্বলিত হাদীস বুখারী শরীফের আম্বিয়া, জিহাদ এবং ঈমান ও নজরানা অধ্যায়ে উলি­খিত হয়েছে। এ হাদীসগুলির কোনোটিতে হযরত সুলায়মানের (অঅ) স্ত্রীর সংখ্যা বলা হয়েছে ৬০, কোনোটিতে বলা হয়েছে ৭০, কোনোটিতে বলা হয়েছে ৯০, কোনোটিতে বলা হয়েছে ৯৯, আবার কোনোটিতে বা হয়েছে ১০০। প্রত্যেকটি হাদীস পৃথক পৃথক ব্যক্তিদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। এত বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে যে হাদীস মুহাদ্দিসগণের নিকট পৌঁছেছে, তাকে একেবাইে ভিত্তিহীন বলা বড় কঠিন। কিন্তু মনে হয় রসূলুল্লাহর (স) বক্তব্য অনুধাবন করতে হযরত আবু হুরায়রার (রা) কোনো ভুল হয়ে থাকবে অথবা তিনি রসূলুল্লাহর (স) কথা পুরোপুরি গুনতে পাননি। সম্ভবত রসূলুল্লাহ (স) একথা বলে থাকবেন যে, হযরত সুলায়মানের (আ) বহু স্ত্রী ছিল, ইহুদীরা তাদের সংখ্যা ৬০, ৭০, ৯০, ৯৯ ও ১০০ পর্যন্ত বলে থাকে; আর হযরত আবু হুরায়রা (রা) মনে করে থাকবেন যে, এটি রসূলুল্লাহ (স) হযরত সুলায়মানের বক্তব্যকে এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ ‘‘আমি আমার প্রত্যেক স্ত্রীর সাথে মিলিত হবো এবং প্রত্যেকের গর্ভে একজন করে মুজাহিদ জন্ম নেবে।’’ আর হযরত আবু হুরায়রা (রা) মনে করেছেন যে, ‘‘এক রাতে মিলিত হবো।’’ বহু হাদীস থেকে এ ধরনের ভুল বুঝার দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে এবং অন্য একাধিক হাদীস এই ভুল বুঝার নিরসন করেছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর সুযোগ ঘটেনি। ‘বাচনিক’ হাদীসের ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যাপার সংঘটিত হওয়া মোটেই বিষ্ময়কর নয়। এই জাতীয় কতিপয় দৃষ্টান্ত খাড়া করে সমস্ত হাদীসকে অনির্ভরযোগ্য গণ্য করা কোন সুবিবেচক ব্যক্তির কাজ হতে পারে না।    

     আর ‘ইনশা আল্লাহ’ সম্পর্কে বলা যায় যে, হযরত সুলায়মান (আ) জেনে-বুঝে ইনশা আল্লাহ বলেননি, একথা কোনো হাদীসেই উক্ত হয়নি। কাজেই এতে নবীদের অমর্যাদার কোনো কারণ দেখা যায় না। ‘‘জনৈক ব্যক্তি বললো, এই সংগে ইনশা আল্লাহও বলুন, কিন্তু তিনি এর পরোয়া করলেন না’’- একথা আপনি কোনো হাদীসে দেখেছেন ? হাদীসে যে শব্দগুলি উলি­খিত হয়েছে তা হচ্ছে নিম্নরূপঃ আরবী        অর্থাৎ তাঁর সাথী তাঁকে বললোঃ ইনশা আল্লাহ, কিন্তু তিনি বললেন না।’ এর অর্থ হচ্ছে এই যে, হযরত সুলায়মানের মুখ থেকে যখন একথা বের হলো, তখন নিকটে উপবিষ্ট তাঁর জনৈক সাথী নিজেই বললোঃ ইনশা আল্লাহ’ এবং হযরত সুলায়মান তার বলাটাকেই যথেষ্ট মনে করলেন, নিজে আর তার পুনরাবৃত্তি করলেন না।      

   (১১) এ হাদীসটি বুখারী শরীফের উযু অধ্যায়ে বিভিন্ন শিরোনামে উদ্ধৃত হয়েছে এবং হাদীসের অন্যান্য গ্রন্থেও এর উলে­খ আছে। কিন্তু কোনো হাদীসেই হযরত হোযায়ফার (রা) মুখ নিঃসৃত এ শব্দগুলি উলি­খিত হয়নি যে, ‘‘রসূলুল্লাহ (স) আমার সম্মুখে দাঁড়িয়ে পেশাব করেন।’’ আপনি বলতে পারেন, এ বাক্যটি আপনি কোথায় পেলেন ? তাঁর আসল শব্দাবলী হচ্ছে নিম্নরূপঃ আমি ও রসূলুল্লাহ (স) চলে যাচ্ছিলাম, পথে রসূলুল্লাহ (স) একটি দেয়ালের পেছনে অবস্থিত একটি আবর্জনা স্তূপের দিকে গেলেন। তিনি দাঁড়ালেন-যেমন তোমাদের কেউ দাঁড়ায় - অতঃপর পেশাব করলেন। আমি দূরে সরে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে ইশারা করলেন এবং আমি তাঁর পেছনে এসে দাঁড়ালাম। অবশেষে তাঁর পেশাব করা শেষ হলো। এথেকে জানা যায় যে, রসূলুল্লাহ (স) দেয়াল ও আবর্জনা স্তূপের মধ্যস্থলে দাঁড়িয়ে পেশাব করেন। এভাবে সামনে পেছনে উভয় দিক থেকে অন্তরাল সৃষ্টি হয়। এবং তিনি হযরত হোযায়ফাকে (রা) পেছনে দাঁড় করান, কারণ এ অবস্থায় দেখা যাবার সকল সম্ভাবনাই তিরোহিত হয়।       

  এখানে একথাও উলে­খযোগ্য যে, নির্ভরযোগ্য হাদীসসমূহ থেকে জানা যায়, রসূলুল্লাহ (স) হামেশা বসে বসে পেশাব করতেন। কিন্তু এসময় কোনো অসুবিধার কারণে তিনি দাঁড়িয়ে পেশাব করেন। হযরত আবু হোযায়ফার (রা) সময়ে অনেক লোক দাঁড়িয়ে পেশাব করাকে চরম অবৈধ বলে গণ্য করতে শুরু করেছিল, তাই তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করেন।        

(১২) এ হাদীসটি বুখারীর কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া ও মুসলিমের বাবু ইছ্বাতিশ শাফায়াতে রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য হাদীস গ্রন্থেও উদ্ধৃত হয়েছে। এইসব হাদীসের সনদ এবং বিপুল সংখ্যক বর্ণনা পরস্পরার প্রতি দৃষ্টি দিলে হযরত আবু হুরায়রাহ রাদিয়ালল্লাহ আনহুই যে এই হাদীসগুলির মূল বর্ণনাকারী, সে ব্যাপারে কারোর সন্দেহ থাকে না। কেননা এত বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারীর ব্যাপারে বিশেষ করে যখন তাদের অধিকাংশই এবং বেশীর ভাগই নির্ভরযোগ্য ছিলেন এ ধারণা করা যেতে পারে না যে, তাঁরা একজন সাহাবীর নাম নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি মিথ্যা হাদীস রচনা করে থাকবেন। আর হযরত আবু হুরায়রাহ (রা) সম্পর্কে আমরা এ সন্দেহ করতে পারি না যে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কোনো বেঠিক কথা সম্পৃক্ত করে দেবেন। কিন্তু আমাদের জন্য এই বর্ণনাকারীদেরকে মিথ্যুক মনে করা যতটা কঠিন তার চেয়ে অনেক বেশী কঠিন একথা মনে করা যে, একজন নবী মিথ্যা বলে থাকবেন অথবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাউযুবিলল্লাহ একজন নবীর বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার মিথ্যা অপরাদ দিয়ে থাকবেন। তাই নিবার্যভাবে আমরা একথা মনে করতে বাধ্য যে, এ ব্যাপারে নিশ্চয়ই কোনো ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে যে কারণে নবী সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­ামের উক্তি সঠিকভাবে উদ্ধৃত হয়নি। এর প্রমাণ হচ্ছে, এই হাদীসে ইবরাহীমের যে তিনটি মিথ্যার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে দুটি তো মোটেই মিথ্যা নয় এবং তৃতীয় মিথ্যাটি আসলে বণী ইসরাঈলদের মিথ্যা, যা তারা বাইবেলে এক জায়গায় নয় বরং দু জায়গায় হযরত ইবরাহীমের সাথে সম্পৃক্ত করেছে।       

  প্রথম ঘটনাটি কুরআন মজীদে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু তাদের কোনোটিকে আল্লাহ মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করেননি এবং ঘটনার প্রকৃত চিত্র থেকে তাদের মিথ্যা হবার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। প্রথম ঘটনাটি হচ্ছে, যখন হযরত ইবরাহীমের গোত্রের ও পরিবারের লোকেরা নিজেদের একটি মুশরিকী অনুষ্ঠানসর্বস্ব মেলায় যাবার জন্য শহর থেকে বের হতে থাকে, তখন তিনি ******** (আমি অসুস্থ) এই ওজর পেশ করে তাদের পেছনে শহরে থেকে যান। একে মিথ্যা গণ্য করতে হলে প্রথমে কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে একথা জানা প্রয়োজন যে, সে সময় হযরত ইবরাহীম (আ) একেবারেই সুস্থ ছিলেন এবং তাঁর কোনো রকম অসুস্থতা ছিল না। কিন্তু আল্লাহ ও রসুল কেউই একথা জানাননি। তাহলে কিসের ভিত্তিতে একে মিথ্যা গণ্য করা হবে ?      

  দ্বিতীয় ঘটনাটি হচ্ছে এই যে, হযরত ইবরাহীম (আ) যখন নিজের জাতির মূর্তি মন্দিরে প্রবেশ করে শুধুমাত্র বড় মূর্তিটি চাড়া বাকি সম্সত মূর্তি ভেঙ্গে ফেরেন, তখন জাতির লোকেরা এ ব্যাপারে তাঁকেই সন্দেহ করে। কাজেই তাঁকে ডাকা হয়। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয় আমাদের খোদাদের সাথে এই ব্যবহার তুমি করেছো ? তিনি জবাব দেনঃ

আবরী        (বরং একাজ এদের এই বড়টাই করেছে। এই আহত মূর্তিগুলোকে জিজ্ঞেস করো, যদি এরা কথা বলতে পারে।) এই বাক্যের শব্দগুলো পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছে যে, হযরত ইবরাহীম (আ) মিথ্যা বিবৃতি হিসেবে নয় বরং শিরকের বিরুদ্ধে একটি প্রমাণ হিসেবে এই বাক্যটি বলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রশ্নকারীদেরকে এই সত্যটি সম্পর্কে সজাগ করে দেয়া যে, তোমাদের এসব কেমন ধরনের খোদা, যারা নিজেদের বিপদের কাহিনীটুকু পর্যন্ত বলতে পারে না ? আর তোমাদের এই বড় খোদাটাই বা কেমন যার ব্যাপারে তোমরা নিজেরাই জানো যে, সে কোনো একটা কাজ করার ক্ষমতা রাখে না ? তত্ত্বকথা বুঝার সামান্য ক্ষমতা আছে এমন একজন সাধারণ লোকও তো একে মিথ্যা বলতে পারে না । এ ক্ষেত্রে আমরা নবী সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­াম সম্পর্কে কেমন করে এই কুধারণা করি যে, তিনি একে মিথ্যা বলেছিলেন ?     

    আর তৃতীয় ‘‘মিথ্যাটি’’ সম্পর্কে বলতে হয়, সেটি আসলে বাইবেলে নবীদের নামে যে সব মনগড়া কাহিনী  তৈরি করা হয়েছে তার মধ্যে একটি। বাইবেলের আদি পুস্তকে এ ঘটনাটি এক জায়গায় নয় বরং দু’জায়গায় বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম ঘটনাটি মিসরের এবং তা বাইবেলের ভাষায়ঃ‘‘আর আব্রাম যখন মিসরে প্রবেশ করিতে উদ্যত হন, তখন নিজের স্ত্রী সারাকে কহিলেন, দেখ, আমি জানি, তুমি দেখিতে সুন্দরী, এ কারণ মিসীয়েরা যখন তোমাকে দেখিবে, তখন তুমি আমার স্ত্রী বলিয়া আমাকে বধ করিবে, আর তোমাকে জীবিত রাখিবে। বিনয় করি, এই কথা বলিও যে, তুমি আমার ভগিনী। .................. মিস্রীয়েরা ঐ স্ত্রীকে পরমা সুন্দরী দেখিল। .................. সেই স্ত্রী ফরৌনের  বাটিতে নীত হইলেন। ................ কিন্তু আব্রামের স্ত্রী সারার জন্য সদাপ্রভু ফরৌন ও তাঁহার পরিবারে উপরে ভারী বারী উৎপাত ঘটাইলেন। তাহাতে ফরৌন আব্রামকে ডাকিয়া কহিলেন, আপনি আমার সহিত একি ব্যবহার করিলেন ? উনি আপনার স্ত্রী একথা আমাকে কেন বলেন নাই ? উহাকে আপনার ভগিনী কেন বলিলেন ? আমিত উহাকে বিবাহ করিতে লইয়াছিলাম।’’(১২ঃ ১১-১৯)       

 মজার ব্যাপার হচ্ছে, বাইবেলের নিজেরই বক্তব্য অনুসারে সে সময় হযরত সারার বয়স ছিল ৬৫ বছর। এরপর দ্বিতীয় ঘটনাটি বর্ণনা করা হয়েছে ফিলিস্তীনের দক্ষিণ এলাকার। সেটি হচ্ছেঃ‘‘আর আব্রাহাম আপন স্ত্রী সারার বিষয়ে কহিলেন, এ আমার ভগিনী; তাহাতে সরারের রাজা অবীমেলক লোক পাঠাইয়া সারাকে গ্রহণ করিলেন। কিন্তু রাত্রিতে ঈশ্বর স্বপ্ন যোগে অবীমেলকের নিকটে কহিলেন, দেখ, ঐ যে নারীকে গ্রহণ করিয়াছ তাহার জন্য তুমি মৃত্যুর পাত্র, কেনান সে এক ব্যক্তির স্ত্রী।.......পরে অবীমেলক আব্রাহামকে ডাকাইয়া কহিলেন, আপনার কাছে কি দোষ করিয়াছি যে, আপনি আমাকে ও আমার রাজ্যকে এমন মহাপাপগ্রস্ত করিলেন?’’ (২০ঃ ২-৯)বাইবেলের নিজের বর্ণনা অনুযায়ী এ সময় হযরত সারার বয়স ছিল ৯০ বছর। এ দুটি কাহিনী নিজেই বলে দিচ্ছে, এগুলি একেবারেই মিথ্যা এবং আমরা কোনো ক্রমেই কল্পনা করতে পারি না যে, নবী সাল­াম এ গুলিকে সত্য বলেছেন।এখন প্রশ্ন হতে পারে, যদি এ তিনটি কথা বুদ্ধির দৃষ্টিতে বেঠিক হয়ে থাকে, তাহলে মুহাদ্দিসগণ, নিজেদের কিতাবে এগুলি সংযুক্ত করলেন কেন? এর জবাব হচ্ছে, বুদ্ধিবৃত্তির সম্পর্ক হচ্ছে হাদীসের মূল বিষয়বস্ত্তর সাথে এবং রেওয়ায়েত বা বর্ণনার সম্পর্ক হচ্ছে পুরোপুরি সনদ বা বর্ণনা পরম্পরার সাথে। বর্ণনাকারী তথা মুহাদ্দিসগণ যে দায়িত্বভার গুহণ করেছিলেন তা মূলত এই ছিল যে, নির্ভরযোগ্য উপায়ে নবীর (স) যামানার সাথে সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে একত্র করবেন। এ দায়িত্ব তাঁরা পালন করেছেন। তারপর বুদ্ধিবৃত্তিক বিশে­ষণকারীদের কাজ হচ্ছে, তারা মূল বিষয়বস্ত্ত বিশ্লেষণ করে ঐ রেওয়ায়েতগুলি থেকে কাজের কথা তথা প্রয়োজনীয় বিষয় বের করে নেবেন। যদি মুহাদ্দিসগণ বিশে­ষণের কাজে লেগে যেতেন এবং বিষয়বস্ত্তর সমালোচনা করে এমন সব রেওয়ায়েত প্রত্যাখ্যান করে যেতে থাকতেন যেগুলির বিষয়বস্ত্ত তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত রায় অনুযায়ী সঠিক নয়, তাহলে আমরা আজ এমন বহুতর হাদীস থেকে যেতাম যা হাদীস লিপিবদ্ধকারীদের দৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয় ছিল কিন্তু অন্য বহু লোকের দৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় হতো। তাই মুহাদ্দিসগণ সনদ সমালোচনার মধ্যেই বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে নিজেদের কর্মতৎপরতা সীমাবদ্ধ রেখেছেন এবং বিষযবস্ত্ত বিশে­ষক ও সমালোচকদের জন্য নির্ভরযোগ্য সূত্র মাধ্যমে তথ্যাদি একত্র করে দিয়েছেন, এটিই সঠিক ছিল।

(১৩) এ হাদীসটি বুখারী শরীফের সৃষ্টির প্রারম্ভ অধ্যায়ে ‘মুসলমানের সর্বোত্তম সম্পদ হচ্ছে সংকীর্ণ পার্বত্য এলাকায় বিচরণকারী তার মেষ’ শিরোনামে এবং নবীগণের কথা অধ্যায়ে আল্লাহর বাণীঃ ‘আল্লাহ ইবরাহীমকে বন্ধু বানিয়ে নিলেন’ শিরোনামে উলি­খিত হয়েছে। এই বিষয়বস্ত্ত সম্বলিত সমস্ত হাদসি এবত্রিত করলে যে কথাটি জানা যায় তা হচ্ছে এই যে, রসূলুল্লাহ (স) গিরগিটিকে হিংস্র জানোয়ারের মধ্যে শুমার করেছিলেন।*আরবীঅর্থাৎ ‘রসূলুল্লাহ (স) গিরগিটিকে হিংস্র বলেছেন কিন্তু তিনি তাকে হত্যার করারও হুকুম দিয়েছেন, এটা আমি শুনিনি।’মুসনাদে আহমদ ও ইবনে মাজায় হযরত আয়েশার (রা) অন্য একটি হাদীসও উদ্ধৃত হয়েছে, তাতে গিরগিটিকে হত্যা করার উল্লে­খ আছে এবং হযরত ইবরাহীমের (আ) আগুনে ফুক দেবারও। কিন্তু মশহুর হাদীস সমালোচক ও ব্যাখ্যাতা হাফিয ইবনে হাজার ফতহুল বারী গ্রন্থে লিখেছেনঃ বুখারীর হাদীসটিই অধিকতর নির্ভুল।আবার বুখারী শরীফের এই হাদীসে এ বাক্যও আছেঃ ‘সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাসের (রা) দাবী ছিল এই যে, রসূলুল্লাহ (স) তাকে হত্যা করার হুকুম দিয়েছিলেন।’ কিন্তু হযরত সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাসের (রা) নিকট থেকে একথা কে শুনেছে, এ হাদীসে তা উলে­খ করা হয়নি। দারা কুত্নীতে এ হাদীসটি নিম্নোক্তভাবে উদ্ধৃত হয়েছেঃ ‘ইবনে শিহাব সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাসের নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন।’ কিন্তু ইবনে শিহাব হযরত সাআদকে (রা) দেখেননি। কাজেই এটি মুনকাতে* হাদীস।

(১৪) এ হাদীসটি মুসলিম শরীফের নামায অধ্যায়ে ‘মুসাল্লার সুত্রা’ শিরোনামে উল্লেখিত হয়েছে। এ শিরোনামে ইমাম মুসলিম নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে ‘সুত্রা’ সম্পর্কে তাঁর নিকট যতগুলি হাদীস পৌঁছেছে সবগুলি জমা করেছেন এবং এর সমগ্র দিক আমাদের সম্মুখে তুলে ধরেছেন। এর মধ্য থেকে কোন একটিমাত্র হাদীস নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া ঠিক নয়। বরং সমস্ত হাদসসের ওপর ব্যাপক দৃষ্টিপাতের পরই কোনো সঠিক সিন্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব। এই হাদীসগুলি থেকে যে মূল কথাটি জানা যায় তা হলো এই যে, রসূলুল্লাহ (স) রাসাযীকে নিজের সম্মুখে ‘সুত্রা’* রাখার হুকুম দিয়েছিলেন এবং এর কারণ দর্শাতে গিয়ে বলেছিলেনঃ সুত্রা ছাড়া কোনো ব্যক্তি যদি কোনো খোলা জায়গায় নামায পড়তে দাঁড়ায়, তাহলে নারী, কুকুর, গাধা সবাই তার সামনে দিয়ে চলে যাবে। একথা শুনে কতক লোক একথাটিকে এভাবে বর্ণনা করতে শুরু করে যে, নারী, কুকুর ও গাধা সামনে দিয়ে চলে গেলে নামায নষ্ট হয়ে যায়। একথা যখন হযরত আয়েশার (রা) কানে পৌঁছলো, তখন তিনি বললেনঃ

আরবী (তাহলেতো মেয়েরা বড় নিকৃষ্ট ধরনের জানোয়ার)আরবী        (তোমরাতো আমাদেরকে কুকুর ও গাধার পর্যায়ে এনে দাঁড় করালে)আরবী        রসূলুল্লাহ (স) রাত্রে নামায পড়তেন এবং আমি তাঁর ও কেবলার মধ্যস্থলে জানাযার ন্যায় পড়ে থাকতাম।       

(১৫) এ বিষয়বস্ত্ত সম্বলিত হাদীস বুখারী শরীফের সৃষ্টির প্রারম্ভে এবং চিকিৎসা অধ্যায়ে উলি­খিত হয়েছে্ উপরন্তু ইবনে মাজা, নাসায়ী, আবু দাঊদ ও দারা কুত্নীতেও  এ হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে। অনেক হাদীস ব্যাখ্যাতা এই হাদীসের শব্দাবলীকে শাব্দিক অর্থে ব্যবহার করেছেন। তাঁরা এর অর্থ এই মনে করেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে মাছির একটি ডানায় আছে রোগ এবং অন্যটিতে আছে তার ওষুধ! তাই কোনো খাদ্যবস্ত্ততে মাছি পড়লে তাকে একটি চুবানি দিয়ে বের করে ফেলে দেয়া উচিত।*

আবার অনেকে এর এ অর্থ নিয়েছেন যে, রসূলুল্লাহ (স) লোকদের অযথা অহংকার নির্মূল করতে চাচ্ছিলেন। দুধ বা তরকারির পাত্রে মাছি পড়লে অনেক লোক তা সম্পূর্ণটাই ফেলে দিতো বা চাকর-বাকরদের দিয়ে দিতো।       

এই ধরণের লোকদের অহংকার নির্মূল করার জন্যে রসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ মোমাদের খাদ্যবস্ত্ততে মাছি পড়লে তাকে একটি চুবানি দিয়ে বের করে ফেলে দাও অতঃপর খাবারটি খেয়ে নাও। তার একটি ডানায় রোগ আছে অর্থাৎ অহংকার রোগ, তাকে খাদ্যে পরতে দেখেই এ রোগ তোমাদের মধ্যে জন্মে এবং অন্য ডানায় আছে ওষুধ অর্থাৎ এই অহংকারের ওষুধ-যে অহংকারের ফলে তোমরা খাদ্য ফেলে দাও বা চাকরদের দিয়ে দাও। অন্য বহু হাদীসও এই অর্থটি সমর্থন করে। ঐ হাদীসগুলিতে রসূলুল্লাহ (স) পাত্রে সামান্য কাবার রেখে উঠে যাওয়াকে অপসন্দ করেছেন এবং হুকুম দিয়েছেনঃ তোমাদের পাত্রের সবটুকু খেয়ে নিয়ে তারপর ওঠো। এ নির্দেশের করণও হচ্ছে এই যে, যে ব্যক্তি এভাবে পাত্রে কিছু রেখে দিয়ে উঠে পড়ে, সে একথাই বলতে চায় যে, তার এ অভুক্ত খাদ্যটুকু ফেলে দেয়া হোক বা অন্য কেউ খেয়ে ফেলুক।       

সর্বশেষে আপনি বুখারী শরীফের ‘আল্লাহর কিতাবের পর সর্বাধিক নির্ভূল কিতাব’ হওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করেছেন। এর সংক্ষিপ্ত জবাব হচ্ছে এই যে, দুনিয়ায় আল্লাহর কিতাবই একমাত্র কিতাব যেটিকে আমরা সব চাইতে বিশ্বস্ত উপায়ে লাভ করেছি। কারণ হাজার হাজার লোক তাকে একইভাবে উদ্ধৃত করেছে। কিন্তু এর পর যে কিতাবটি সব চাইতে নির্ভরযোগ্য বর্ণনার মাধ্যমে আমাদের নিকট পৌঁছেছে, সেটি হচ্ছে বুখারী শরীফ। কারণ অন্যান্য কিতাবের রচয়িতাদের তুলনায় এই কিতাবের রচয়িতা অধিকতর সতর্কতার সাথে বর্ণনাকারীদের যাচাই পর্যালোচনা করেছেন।       

 এ প্রসংগে এ কথাও জেনে নেয়া প্রয়োজন যে, কোনো বর্ণনার দিক দিয়ে নির্ভূল হলে তার বিষয়বস্ত্তও সকল দিক দিয়ে নিভূল এবং হুবহু গ্রহণযোগ্য হওয়া অপরিহার্য নয়। আমাদের নিজেদের জীবনেই আমরা বারবার দেখেছি, কোনো ব্যক্তির কথাকে অন্যের নিকট পৌঁছাবার সময় নির্ভুল বর্ণনার চেষ্টা করা সত্ত্বেও বর্ণনাকারীর বর্ণনায় বহু ত্রুটি থেকে যায়। যেমন অনেকের সমস্ত কথা মনে থাকে না এবং তার একটি অংশ মাত্র তারা বর্ণনা করে। অনেকে কথাটি হয়তো পুরোপুরি বুঝতে পারে না, তাই তারা অসম্পূর্ণভাবে মোটামুটি কথাটাই বর্ণনা করে। অনেকে আলোচনার মাঝখানে উপস্থিত হয়, তারা জানতে পারেনা আগে কি কথা হচ্ছি। এ ধরনের নানান ত্রুটি থাকার কারণে অনেক সময় সদুদ্দেশ্য ও সততা সত্ত্বেও বক্তার কথা যতার্থরূপে উদ্ধৃত হতে পারে না। অবস্থা ও কর্মের ধারা বিবরণী বর্ণনার ক্ষেত্রেও এই একই ব্যাপার সংঘটিত হয়। কখনো কখনো অন্যান্য হাদীস এই ত্রুটিগুলি দূর করে দেয় এবং সমস্ত হাদীসগুলি এক সাথে মিলিয়ে দেখলে পূর্ণ চিত্র ভেসে ওঠে। আর কখনো কখনো একটিমাত্র হাদীসই বর্তমান থাকে (হাদীসের পরিভাষায় একে বলা হয় গরীব), তখন ‘রেওয়ায়েত’ বা বর্ণনার মাধ্যমে এই ত্রুটি দূর করা যেতে পারে না এবং ‘দেরায়েত’ বা বিষয়বস্ত্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে রসূলুল্লাহর (স) আসল বক্তব্য কি হতে পারে অথবা এ কথাটি এর বর্তমান আকৃতিতে গ্রহণযোগ্য কিনা অথবা রসূলুল্লাহর (স) মনন ও বাকরীতির সাথে একথা সামঞ্জস্যশীল কিনা, এ সম্পর্কে মত প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। হাদীসশাস্ত্রে এতটুকন অনুসন্ধান করার যোগ্যতা যাদের নেই, তাদের প্রথমত হাদীস গ্রন্থসমূহ পাঠ করাই উচিত নয় এবং পাঠ করলেও কমপক্ষে সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত প্রকাশ না করা উচিত।(তরজমানুল কুরআন, অক্টোবর-নবেম্বর, ১৯৫২)

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3.7 (3টি রেটিং)

ভাই, আপনার সাথে আমার একটু ব্যক্তিগত যোগাযোগ করা দরকার। কিভাবে পাব আপনাকে? আপনি কি ফেসবুকে আছেন? যা হোক, আমাকে একটা মেইল দেবেন। আমার ইমেইল ismailakb@yahoo.com

-

আল্লাহকে যারা বেসেছে ভালো দুঃখ কি আর তাদের থাকতে পারে? 

যোগাযোগ করবো ইনশাআল্লাহ।

মাশাআল্লাহ তারিক খুব সুন্দর কাজ।

-

স্বপ্নই দেখি! বাস্তব হয় না।

কাজে আসলো। আপনাকে ধন্যবাদ

-

a bengali writer and poet. * Address:- Mv Kamal House, 48 Badar
Mukam, Thana Road, Coxsbazar, Bangladesh. Hot line:- +8801814261603
Email - kutubibd@gmail.com

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3.7 (3টি রেটিং)