প্রতারক চেনার উপায়

মানুষ প্রতারণা করে থাকে সাধারণত কোন স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে কিংবা কারো ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে। স্বার্থ বলতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থ, মান-মর্যাদা ও প্রতিপত্তি লাভের স্বার্থ কিংবা ক্ষমতা লাভের স্বার্থ। আর কারো ক্ষতি করার উদ্দেশ্য বা প্রতিহিংসাটা ব্যক্তিগত স্বার্থহানির জন্যও হতে পারে; আবার ধর্মীয়, জাতিগত বা রাজনৈতিক কারণেও হতে পারে। তবে যে উদ্দেশ্যেই হোক না কেন, প্রতারকদের কিছু কমন আচরণগত আলামত ও বৈশিষ্ট্য থাকে; যা চেনা থাকলে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, আর্থিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় যেকোন পর্যায়েই প্রতারণা থেকে বেঁচে থাকা যাবে। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অর্থ হারানো থেকেও বাঁচা যাবে, দ্বীন হারানো থেকেও বাঁচা যাবে, কারো প্ররোচনায় কোন নিরপরাধ আপনজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে পরে অনুতপ্ত হওয়ার আশংকা থেকেও নিরাপদ থাকা যাবে এবং সর্বোপরি নিজের ও পরিবারের শরীর ও জীবনের ক্ষতিও এড়ানো যাবে।
(১) বেশি কথা বলা
(২) নিজের সততা ও সত্যবাদিতা জাহির করা
(৩) বেশি বেশি শপথ করা
(৪) অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থবোধক কথাবার্তা
(৫) নিজের দু:খের কথা বলে মানুষের কাছে সহানুভূতি আদায় করা
(৬) অন্যের দু:খে হা-হুতাশ ও বিলাপ জুড়ে কৃত্রিম সহানুভূতি প্রকাশ করা
(৭) উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা ও মনগড়া ফতোয়া প্রদান
(৬) উদ্দেশ্য প্রকাশে মিথ্যাচার
(৭) মনগড়া তত্ত্বের প্রচার
(৮) সত্য গোপন ও সত্যের বিপরীত তথ্য প্রকাশ
(৯) মন্দ কাজে ভাল উদ্দেশ্য দাবি করা
(৮) দ্বিমুখী ভূমিকা ও আচরণ
(৭) নিজের সন্তানের চেয়ে অন্যদের কিংবা বাচ্চাদের চেয়ে বড়দের প্রতি বেশি দরদী হওয়া
(৮) স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে ইচ্ছাকৃতভাবে একেক সময় একেক রকম আচরণ করা
(৯) সামনে ও পিছনে দুই রকম হওয়া
(৯) মানুষের উপকারের চেয়ে মানুষকে পটানোর কাজে বেশি মনোযোগী হওয়া
(১০) উপকারের বিনিময়ে থাকার ও ঘাঁটি গাড়ার সুযোগ অন্বেষণ করা অথবা কোন স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা আদায় করা
(১১) বার বার ক্ষমা চাওয়া
(১২) বিশ্বাসের ব্লাকমেইল
(১২) মানুষের অক্ষমতার সুযোগ নিয়ে দোষারোপ করা
(১২) পরিবারের ক্ষেত্রে কর্তাব্যক্তিদের সাথে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা
(১৩) মানবসৃষ্ট দুর্যোগকে আল্লাহর ইচ্ছা বলে হালকা করার প্রবণতা

(১) ব্যবসায়ী, ডাক্তার, রাজনীতিবিদ যাদেরকেই প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত বকবক করতে দেখবেন, তাদের থেকে দূরে থাকবেন। যারা সত্যিকার কাজের, তারা শুধু সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য যতটুকু কথা বলা প্রয়োজন ততটুকুই বলবে। বড়জোর ধর্ম ও দেশ নিয়ে কিংবা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কুশলাদি নিয়ে কিছু কথাবার্তা ও খোঁজখবর নিতে পারে। কিন্তু কাউকে যদি দেখেন আগ বাড়িয়ে যেচে শুধু ক্রেতা ও সার্ভিস গ্রহীতার প্রতি অনাবশ্যক তোষামোদ ও গুণকীর্তন করছে, কিংবা নিজের ব্যবসায়িক ও পারিবারিক সুনাম ও সততা নিয়ে গল্প জুড়ে দিচ্ছে বা অন্যদের বদনাম ও গোষ্ঠী উদ্ধার করছে, তাহলে বুঝবেন something is wrong। এমন লোকের খপ্পরে পড়লে আর কিছু খোয়ানোর আগে যত তাড়াতাড়ি পারা যায় কেটে পড়ুন।

(২) যারা নিজেদেরকে সৎ, নীতিবান ও সরলমতি হিসেবে প্রচার করে, বাস্তবে তারাই সর্বাপেক্ষা অধিক মিথ্যাবাদী, কুচক্রী ও কুটনী হয়ে থাকে। এর ব্যতিক্রম কেউ দেখে থাকলে জানাবেন। "আমি মিথ্যা সহ্য করতে পারি না; আমি সরল ও সাদা মনের মানুষ, কোন প্যাঁচগোছ বুঝি না; আমি পিছনে কারো বদনাম করি না, প্রয়োজনে শুধু সামনে দু'-চারটা ধমক দেই; আমি নম্র-ভদ্র মানুষ, কোনদিন কারো সাথে দুর্ব্যবহার ও গালিগালাজ করিনি; হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করা, অল্পতে মানুষের দোষ ধরা এসব প্রবণতা আমাদের মাঝে নেই"- এসব যারা দাবি করে, বুঝবেন তাদের মাঝেই ঘাপলা বেশি। বর্ণিত স্বভাব ও মানসিকতাগুলোর সাথে তারা বেশ ভালোভাবে পরিচিত ও অভ্যস্ত বলেই তারা ওগুলোর কথা ওভাবে উল্লেখ করতে পারে। একেবারে সরলমতি হলে ওসবের কথা ওভাবে মাথায় আসারই কথা নয়, আর মাথায় এসে থাকলেও যেচে ওগুলোর ব্যাপারে নিজেকে নির্দোষ ও পবিত্র প্রমাণের দরকার তাদের পড়ে না। "আমি/আমরা জীবনে কোনদিন মিথ্যা কথা বলিনি"- এই কথাটাই জগতের সবচাইতে বড় মিথ্যা। কারণ, একমাত্র নবী-রসূলগণই নিষ্পাপ ছিলেন এবং নিষ্পাপ ছিলেন বিধায় তাঁরা সর্বদা সত্য কথা বলতেন, মিথ্যা বলার প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু নবী-রসূল ছাড়া আর কোন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিষ্পাপ নয়, সুতরাং জীবনে কোনদিন মিথ্যা না বলে পারা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। কারণ, নিজের গোপন ও লজ্জাজনক বিষয় কেউ মানুষের কাছে স্বীকার করবে না, সুতরাং এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হলে মানুষ মিথ্যা বলতে বাধ্য। তবে মিথ্যা আবার দুই রকমের হয়ে থাকে। ছোট মিথ্যা হলো নিজে বিপদ থেকে বাঁচার জন্য মিথ্যা বলা। আর বড় মিথ্যা হলো নিজে অতিরিক্ত ফায়দা হাসিলের জন্য বা অন্যকে ঘায়েল করবার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেয়া বা কারো উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা। প্রথমটি হলো আত্মরক্ষামূলক (defensive) মিথ্যা, আর দ্বিতীয়টি হলো আক্রমণাত্মক (offensive) মিথ্যা। আপনি বড়জোর দাবি করতে পারেন, জীবনে কোনদিন offensive মিথ্যা বলেননি। কারণ, ন্যূনতম বিবেকজ্ঞান ও ন্যায়-নীতিবোধ থাকলে এই শেষোক্ত গুরুতর প্রকারের মিথ্যাটি বর্জন করা সম্ভব। কিন্তু যারা আগ বাড়িয়ে নিজেদেরকে সৎ ও সত্যবাদী বলে সদম্ভে সমানে প্রচার করে থাকে, তারা আসলে এই দুই প্রকারের মিথ্যার কোনটি থেকেই মুক্ত নয়। অর্থাৎ, তারা শুধু আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যেই মিথ্যা বলে না, মানুষের কাছ থেকে অন্যায় ফায়দা হাসিল করা এবং মানুষকে ঘায়েল করবার জন্যও মিথ্যা কথা বলে থাকে।
প্রতারক শ্রেণির মানুষেরা নিজেদেরকে সৎ ও ধার্মিক হিসেবে প্রচারের জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকে। নিজেদেরকে ধার্মিক হিসেবে দেখানোর জন্য নিজেদের নামায-রোযার কথা বেশি প্রচার করে। বিশেষ করে আজকাল মানুষকে দেখিয়ে নফল নামাজ-রোজা ভণ্ড লোকেরাই বেশি পালন করে থাকে। সত্যিকার ধার্মিক থেকে এদেরকে আলাদা করবার উপায় হলো, যেই ব্যক্তির নফল এবাদতের মোকাবেলায় ধর্মের স্বার্থ ও মানবাধিকার প্রাধান্য পায়, সেই ব্যক্তি সত্যিকারের ধার্মিকরূপে গণ্য হবে; পক্ষান্তরে যেই নফল এবাদত ধর্মের স্বার্থ ও মানবাধিকারের উপরে প্রাধান্য পায়, সেই নফল এবাদত ভণ্ডামিরূপে গণ্য হবে।
সাধারণত অতি ধার্মিকতা প্রদর্শনের পিছনে উদ্দেশ্য হয়ে থাকে অন্য কারো চাইতে নিজেকে অধিক ধার্মিক প্রমাণের দ্বারা নিজে মানুষের কাছে প্রিয় হওয়া ও অপরকে অপ্রিয় বানানো। অন্যদেরকে অযথা মিথ্যাবাদী, চরিত্রহীন, ধর্মবিমুখ, গাফেল, কাফের বা মুনাফিক সাব্যস্ত করার দ্বারা পরিবারে হেয় ও কোণঠাসা করা এবং তার মোকাবেলায় নিজেদেরকে সত্যবাদী, চরিত্রবান, ধার্মিক
এমন অনেক মানুষ আছে, যারা এমনই পরহেযগারি ভাব দেখায় যে, ব্যাংকের সুদও নেয় না, অথচ তারা মানুষকে ঠকিয়ে ও ঠেকিয়ে অর্থ আদায় করে।

(৩)

(৪) প্রতারক ব্যক্তিরা নিজেদের এতিম, বিধবা বা সন্তানহারা হওয়ার কথা বলে; নিজের জীবনের দু:খের কাহিনী বর্ণনা করে মানুষের কাছে নিজেকে দু:খী, মজলুম, বঞ্চিত ও অবহেলিত হিসেবে তুলে ধরে এবং নিজের অনুকূলে মানুষের সমর্থন ও সহানুভূতি আদায় করে। নিজের জীবনের কোন করুণ কাহিনী মর্মস্পর্শী ভাষায় বর্ণনা করে মানুষের দৃষ্টি ও নেক নজর আকর্ষণ করে এবং সেই সাথে অন্য কারো দু:খ-দুর্দশার প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনা জানিয়ে নিজের ও তার মধ্যে সাদৃশ্য প্রদর্শন করে এবং উভয়ে একই রকম মজলুম বলে পারস্পরিক ঐক্য ও সহযোগিতা গড়ে তোলার তাগিদ দেয়। কিন্তু কেউ নিজে কারো হাতে নির্যাতিত হয়েছিল বলেই তাকে অন্য কোন নিরপরাধ মানুষের উপর জুলুম করার সুযোগ ও অনুমতি দিয়ে তার ক্ষতি ও কষ্টটা পুষিয়ে নেবার ব্যবস্থা/বন্দোবস্ত করে দিতে হবে— এমন আবদার যুক্তিসঙ্গত নয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইহুদী জাতি হলোকাস্টের ঘটনা বর্ণনা করে পশ্চিমা বিশ্বের জনমতকে নিজেদের পক্ষে নিতে এবং নিজেদের অন্যায়-অত্যাচারের পক্ষে পশ্চিমা শাসকদের সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। আর পারিবারিক ক্ষেত্রেও কোন কোন ব্যক্তিকে নিজের দু:খের কথা শুনিয়ে নিজের অনুকূলে সহানুভূতি অর্জনপূর্বক নিজের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ও অশুভ তৎপরতার পক্ষে পরিবারের কর্তাব্যক্তিদের অন্ধ সমর্থন আদায় করতে দেখা গেছে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে।

(৬) অন্যের দু:খে হা-হুতাশ ও বিলাপ জুড়ে কৃত্রিম সহানুভূতি প্রকাশ করা: অন্যের দু:খ-বিপদে বিলাপ জুড়ে বা অতিরিক্ত ও অনাবশ্যক দু:খ প্রকাশ ও উদ্বেগ জাহির করে মানুষের কাছে নিজে প্রিয় হওয়া আর অন্যকে অপ্রিয় বানানো প্রতারক কুচক্রীদের একটি প্রধান কৌশল। কোন পরিবারে আধিপত্য বিস্তারের জন্য বা ঈর্ষাবশত কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনাপূর্বক তার মোকাবেলায় নিজেকে শ্রেষ্ঠ ও দায়িত্বশীল এবং প্রতিপক্ষ বলে বিবেচিত ব্যক্তিকে হীন ও দায়িত্বহীন প্রমাণের জন্য মানুষের দুর্বল ও স্পর্শকতার জায়গাতে খোঁচা দিয়ে নিজেকে অপরের তুলনায় অধিক সহানুভূতিশীল দরদী হিসেবে তুলে ধরার প্রয়াস চালিয়ে থাকে এ ধরনের ব্যক্তিরা। কাকে কি দিয়ে কিভাবে প্রভাবিত করা যাবে, তা এরা ভাল করেই জানে। যেমন, পিতার মন জয় করার সর্বাপেক্ষা মোক্ষম উপায় হচ্ছে দাদীর প্রতি দরদ দেখানো। "দেখ বাবা, দাদীর এত বড় অসুখ হলো, ওরা (ভাই/ভাবী) কেউ একটিবারের জন্যও দেখতে গেল না!"- এই একটি মাত্র দরদবাক্যই নিজের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পিতাকে ক্ষেপিয়ে তোলার শ্রেষ্ঠ উপায়।
দরদ বা সহানুভূতির প্রকাশ নিজের কারো (পিতামাতা বা সন্তান-সন্ততির) প্রতি হোক, বা অন্যের কারো (পিতামাতা বা সন্তান-সন্ততির) প্রতি হোক, তা আন্তরিক নাকি বাহ্যিক ও লৌকিক, সত্যিকার নাকি ভণ্ডামি, তা যাচাই করার উপায় আছে। আমাদের একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, সত্যিকার শোক কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবার দরকার পড়ে না, সাজানো-গোছানো শোকবাক্যের দ্বারা প্রকাশ করা লাগে না। সত্যিকার মনের ব্যথার বহি:প্রকাশ হয়ে থাকে লোকচক্ষুর অগোচরে, নীরবে-নিভৃতে। যেটা সত্যিকার (real) কান্না, সেটা হয়ে থাকে একান্তে। পক্ষান্তরে যেটা ভগলামি ও অভিনয়, যেই বিলাপবাক্য ও অশ্রুফোঁটা মেকি ও ভণ্ডামি, সেই রোদন ও অশ্রুপাত কেবল মানুষের সামনেই হয়ে তাকে। দেখা যাবে, একা একা যখন থাকে দিব্যি ভালোই থাকে, কিন্তু যেই না মানুষজন জড়ো হয় অমনি ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে হারানো স্বজনের স্মৃতিচারণ করে চিৎকার জুড়ে দেয়। যেই শোক ও বিলাপ কেবল মানুষের সংস্পর্শে আসলে পুন:প্রচার হয়, তা কিছুতেই আন্তরিক ও real হতে পারে না।

(৭) উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা ও মনগড়া ফতোয়া প্রদান: কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে যে ফতোয়া প্রদান করা হয় তা সাধারণত উদ্দেশ্যমূলক ও মনগড়াই হয়ে থাকে। মতলববাজ ব্যক্তিরা পরিবারের সম্পত্তি একটেচিয়াভাবে কুক্ষিগত করার উদ্দেশ্যে বা কারো কাছ থেকে সেবা ও সার্ভিস লাভের বাসনা কমবেশি হবার কারণে যখন কারো প্রতি ক্ষুব্ধ হয় বা কাউকে ঘায়েল করবার প্রয়োজন হয়, তখন ধর্ম ও নৈতিকতার বাণীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নোংরা রাজনীতি শুরু করে দেয়। কুৎসিত লালসা আর কুরুচিপূর্ণ প্রতিহিংসা তাদেরকে এতটা নীচে নামিয়ে দেয় যে, পরিবারের কোন সদস্য বা সদস্যবর্গকে কাফের ও দোযখী প্রমাণের জন্য তাদের কৃত কোন কাজ বা তাদের ব্যবহৃত কোন বস্তু বা তাদের দেখা কোন টিভি প্রোগ্রামকে কুফরী ও হারাম সাব্যস্ত করার দ্বারা তাদেরকে পরিবারে হেয় ও কোণঠাসা করা এবং পরিবার থেকে বহিষ্কার করার প্রয়াস চালায়। তাদের প্রদত্ত ফতোয়া তাদের বিশ্বাসের কথা নাকি মনগড়া ভাওতা, তা যাচাই করার উপায় হল তারা তাদের বর্ণিত বিষয়টি নিজেরা সর্বদা সর্বত্র সর্বাবস্থায় সর্বসমক্ষে পরহেয করে চলে কিনা কিংবা উক্ত বিষয়ের সমমানের বা নিম্নমানের অন্য কোন কিছুতে তারা লিপ্ত কিনা। যদি কোন মেয়েলোককে দেখেন, পিতা ও স্বামীর সামনে ভাই-ভাবীর টিভি সিরিয়াল দেখা নিয়ে নালিশ ও সিনক্রিয়েট করে, কিন্তু পিতা ও স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজেরাই সিরিয়াল দেখায় বেশি মগ্ন থাকে, তাহলে এটা নিশ্চিত যে তাদের ফতোয়া মনগড়া ও প্রচারণা উদ্দেশ্যমূলক।
উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণার আরেকটি ধরন হল জেনে শুনে জল ও জলপাইকে এক করে দেখানো। কাউকে বা কোনকিছুকে অসৎ উদ্দেশ্যে দমন করবার জন্য সেই ব্যক্তি, সম্প্রদায় বা বস্তুকে অপর কোন মন্দ ব্যক্তি, সম্প্রদায় বা বস্তুর সাথে সম্বন্ধযুক্ত করা- যাতে করে তা দমন করে নিজেদের পথের কাঁটা দূর করা যায়। নিজেদের অন্যায় উদ্দেশ্য পূরণ ও অশুভ শক্তিকে রক্ষা করা তাদের উদ্দেশ্য হলেও অন্যায় প্রতিরোধ ও মানবতাকে রক্ষার দোহাই দিয়ে ন্যায় পথ ও শুভ শক্তিকেই অন্যায় ও অশুভ আখ্যা দিয়ে

(৫) মিথ্যাবাদী ও প্রতারক স্বভাবের লোকেরা কোন ব্যাপারে নিজেদের স্বার্থ বা আসল উদ্দেশ্যের কথা না বলে অন্য কোন সৎ উদ্দেশ্যের কথা দাবি করে থাকে এবং মানুষের ভাল করার কথা বলে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে থাকে। মিথ্যাচার ও প্রতারণায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে রাজনীতিবিদরা। তারা নিজেদের ক্ষমতার জন্য কাজ করলেও যা কিছু করে সব জনগণের দোহাই দিয়ে করে। জনগণের ভোটাধিকার (ভোটের প্রাপকটা কে হবে সেটা দেখলেই বোঝা যায় গরজটা কার), জনগণের স্বার্থ এসব নিয়েই তাদের যত দরদ ও পেরেশানী! অথচ এটা পাগলেও বোঝে যে, জনগণের জন্য নিজেদের জান-মাল দিয়ে চেষ্টা-সাধনা করবার মতন মানুষ যদি দেশের নেতা হতো, এরা যদি এমন দয়ালু দাতা হাজী মোহসিনই হতো, তাহলে দেশটা বেহেশত হয়ে যেত। এরা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে যাবে কোন্‌ দু:খে? সাধারণ মানুষের মধ্যেও কারো কারো চরিত্রে নিজের স্বার্থে মানুষের কল্যাণকামনার দাবি করার প্রবণতা দেখা যায়। যেমন- ছেলের বউ বাপের বাড়ি গেলে নিজেদের সাংসারিক কাজে ও রসনা বিলাসের ক্ষেত্রে সমস্যা হলেও সেটা ওভাবে না বলে বেড়াতে গেলে বাচ্চার শরীর খারাপ করবে কিনা ইত্যাদি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করা। কিংবা ছেলের বউ সকালে ঘুম থেকে না উঠলে সকালের নাস্তা তৈরিতে সমস্যা হলেও সেটা প্রকাশের পরিবর্তে গর্ভাবস্থায় সকালের সূর্য দেখার মাহাত্ম্য বর্ণনা করা আর বাচ্চার শৈশবকালে বাচ্চা সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস না করলে স্কুলে যাবার বয়স হলে স্কুলে যেতে সমস্যা হবে কিনা সেই উপদেশ বিলানো। অথবা বাচ্চার দুধের পিছনে টাকা খরচ করাটা অনাকাঙ্ক্ষিত হওয়ায় দুধ খেলে পেট খারাপ হয় কিনা বা দুধপানের অভ্যাস খাদ্যাভাস গঠনের পথে অন্তরায় কিনা তা নিয়ে গবেষণায় বসে যাওয়া। ছেলের বউ বছরে দু'দিনের জন্য বাপের বাড়ি গেলেই লেখাপড়া গেল গেল রব উঠে যায়। বাচ্চার জীবন ও শারীরিক সুস্থতার জন্য যাদের এতটুকু দরদ নেই, বাচ্চার লেখাপড়ার জন্য তাদের অযাচিত দরদ সত্যিই বিরক্তিকর। এদের কাছে ...(পরের অনুচ্ছেদ থেকে)। এদের শঠতা ও প্রতারণার সবচাইতে নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হল, "তোমার তো বাচ্চা ছোট, ছোট বাচ্চা নিয়ে প্রতিদিন রান্না করাটা তোমার পক্ষে একটু কষ্টকরই হবে, তাই আজ নাহয় একটু বেশিসংখ্যক আইটেমই রেঁধে রাখ, তাহলে আগামীকাল একটু কম ... নিজেদের কায়েমী স্বার্থে ধর্মের ব্যবহারও ভণ্ড-মুনাফিকদের এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। যেমন- পরিবারের ভিতর নিজেদের কুচক্রীপনা ও ভিলেনী চরিত্র প্রকাশ হয়ে পড়ার আশংকায় এরা টিভি সিরিয়াল দেখাকে অপছন্দ করলেও মানুষের কাছে প্রচার করবে, বিধর্মীদের সিরিয়াল দেখলে ঈমান-আকীদা নষ্ট হবে বলে আমরা ওগুলোকে পছন্দ করি না। কোন কোন মুসলিম দেশের শাসকেরা নিজেদের বিরোধী তথ্য ও প্রচারণাকে রোধ করবার উদ্দেশ্যে ইউটিউব বন্ধ করলেও জনগণের কাছে দাবি করেছে, ওখানে ইসলামবিরোধী ভিডিও আছে বলেই আমরা ওটাকে বন্ধ করেছি। এতে করে তাদের দোষ গোপন করার পাশাপাশি নিজেদেরকে ধর্মদরদী নবীপ্রেমিক প্রমাণ করাও হলো, আবার আপনাদের মুখ বন্ধ রাখাও হলো। কারণ, আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেও এ নিয়ে কিছু বলতে গেলে নবীর দুশমন বনে যাবেন!Embarassed বকধার্মিক মহিলাদের কিরণমালাবিরোধী জোশটাও ঠিক এই একই কায়দার। আপনি 'কিরণমালা' দেখতে বসলে আপনাকে কাফের-মুশরিক বানিয়ে ছাড়বে। এদের আচার-আচরণ, কার্যকলাপ ও মন-মানসিকতা ধর্মবিরোধী হওয়া সত্ত্বেও ধর্মের নাম দিয়ে মানুষকে ব্লাকমেইল করায় এরা ওস্তাদ। বিদেশী টিভি সিরিয়াল দেখলে এদের সমস্যা হলেও বিধর্মীদের স্কুলে ভর্তি হওয়া আর নাস্তিকদের লাইব্রেরী থেকে বই এনে পড়ায় এদের জাত যায় না। বাস্তবে বিধর্মীদের পূজা-পার্বন দেখতে যেতেও এদের আপত্তি নেই; আপত্তি কেবল তখনই ঘটে, যখন তা হয় টিভি সিরিয়ালে। কারণ, সমস্যাটা যে পূজা-পার্বন বা শেরেক-বেদাতের মধ্যে নয়, প্রোবলেমটা যে অন্য কোথাও। আবার পেশাদার ধর্মব্যবসায়ীদের মধ্যেও অনেক সময় দেখা যায়, তাদের কাছে কোন ব্যক্তির অভিমত ও বক্তব্যকে নিজেদের পৌরহিত্য ও ফতোয়া দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করার কায়েমি স্বার্থের পথে হানিকর মনে হওয়ায় সেই ব্যক্তিকে ইসলামের শত্রু প্রমাণের জন্য উঠেপড়ে লাগে, আর তাকে বেদ্বীন ও ধর্মবিমুখ প্রমাণের জন্য তার লেবাস নিয়ে চর্চা শুরু করে দেয়। অতএব, কাউকে যদি কোন ব্যাপারে এমন কিছু বলতে শোনেন, যেখানে তার নিজের স্বার্থ বা নিজস্ব গরজ থাকার যথেষ্ট কারণ বর্তমান আছে, তাহলে তার কথা চোখবন্ধ করে বিশ্বাস করবেন না, যতক্ষণ না যার প্রতি দরদ দেখানো হচ্ছে তার প্রতি তাদের সামগ্রিক ও সার্বক্ষণিক আচরণ ও মনোভাব প্রীতিকর বিবেচিত না হয়। যদি কোন বিষয়ের (যেমন- ধর্মের) অযুহাত দেয়া হয়, তাহলে উক্ত বিষয়ের প্রতি আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা (ধর্মের ক্ষেত্রে ধর্মনিষ্ঠা) সবসময় তার কেমন থাকে সেটা দেখে নিতে হবে। যদি কোন ব্যক্তি (যেমন- বাচ্চা) বা জাতির (যেমন- স্বদেশের জনগণের) কল্যাণের দোহাই দেয়া হয়, তাহলে সর্বদা সে/তারা কাজে-কর্মে, চিন্তা-ভাবনা, আচার-আচরণে বাচ্চার বা জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয় কিনা সেটা যাচাই করে দেখতে হবে।
বিশেষ করে নিজের স্বার্থের জন্য ধর্মের দোহাই দেয়াটা প্রতারকদের একটি প্রধান ও কমন বৈশিষ্ট্য। কোন মানুষকে যদি দেখেন, বাচ্চাদের প্রতি দয়াশীল, দায়িত্বশীল ও আন্তরিক না হয়েই শুধু "পিতামাতার কথা না শুনলে দোযখের আগুনে জ্বলতে হবে" টাইপের নসীহত দিয়ে বাচ্চাদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে, তাহলে তাকে সাক্ষাৎ ভণ্ড প্রতারক ধর্মব্যবসায়ীদের দলেই গণ্য করবেন। কারণ, সে মুখে আল্লাহর কথা বললেও এবং আল্লাহর আযাবের ভয় দেখালেও তার নিজের মনে আল্লাহর ভয় নেই, আল্লাহকে সে একবিন্দু কেয়ার করে না, বরং আল্লাহর নাম ভাঙ্গিয়ে দুনিয়া কামাতে চায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যেসব পিতামাতা বা নেতা-মাতবর আল্লাহর ভয় দেখিয়ে নিজেদের আনুগত্য করতে মানুষকে বাধ্য করে, তারা মানুষকে দ্বীনদারি শেখানো বা আল্লাহর পথে মানুষকে চালিত করবার জন্য তা করে না, বা পারতপক্ষে দ্বীনের পথে মানুষকে চালিত করবার কোন তাগিদ বা প্রবণতা তাদের মাঝে পরিলক্ষিত হয় না। যেমন- পিতামাতারা সাধারণত প্রচলিত লেখাপড়া ও পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করাবার প্রয়োজনে পিতামাতার আনুগত্যের বিষয়টা জোর দিয়ে তুলে ধরে এবং এর সাথে ধর্মকে যুক্ত করে। অথচ বাচ্চার পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে নিজের সুনাম কামানোটা totally ষোলআনাই পার্থিব স্বার্থ- এর মাঝে দ্বীনের কিছুই নেই। কিংবা পারতপক্ষে সন্তানের কল্যাণকামনার বিষয়টিও এখানে জড়িত নেই। এমন ভগলা স্বভাবের মহিলাও দেখেছি, যে বাচ্চাদেরকে বলে, বিধর্মীদের সিরিয়াল দেখলে আল্লাহ চোখ দোযখের আগুনে পুড়িয়ে দেবে; আর তার একটু পরই বলে, তুমি যদি পাঁচ পৃষ্ঠা হাতের লেখা লিখে তোমার মাকে খুশী করতে পারতে, তাহলে তোমার মা খুশী হয়ে এমনিতেই টিভি চালানোর অনুমতি দিয়ে দিত। কী আশ্চর্য! যে জিনিস দেখা কুফরী বা হারাম, পাঁচ পৃষ্ঠা হাতের লেখা লিখলেই সেটা হালাল হয়ে যাবে? তোর নিজের সন্তুষ্টিই যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, টিভি সিরিয়ালকে জিম্মি করে লেখাপড়া আদায় করাই যদি কৌশল হয়ে থাকে, তাহলে ধর্মের দোহাই দিস কেন? আসলে দোযখের ভয়ের ব্যাপারটাকে যারা rough use করে, তারা মূলত: আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসীই নয়। কথায় কথায় শুধু দোযখের ভয় দেখানোটা কথায় কথায় শপথ করার মতই মুনাফিকের আলামত। যারা নিজেদের খেয়ালখুশীমত বিষয়ে উদ্দেশ্যমূলক ও মনগড়াভাবে বাচ্চাদেরকে দোযখের ভয় দেখায়, তাদের জানা উচিত, জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে মুনাফিকদের জন্য। মনের ভিতর ভিন্ন কোন অসৎ অভিসন্ধি রেখে সেটাকে ধর্মের আবরণ দিয়ে প্রকাশ করা তো মুনাফিকদেরই কাজ। শুধু ধর্মব্যবসায়ী প্রতারকগণই নয়, বরং এমনকি ধর্মবিদ্বেষী মুনাফিকরাও মানুষকে ধর্মের পথ থেকে সরিয়ে দেবার কাজে ধর্মের দোহাই দিয়ে থাকে। আমি এমন তাগূতী মহিলাকেও দেখেছি, যে নিজের বাচ্চাকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে দেবার জন্য ছলে-বলে-কৌশলে সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করে, কিন্তু নিজের অনুকূলে আনুগত্য লাভের প্রয়োজনে আল্লাহর নামকেই ব্যবহার করে। সরলমনা অবুঝ বাচ্চাকে প্রতারিত করবার উদ্দেশ্যে সে তার বাচ্চার শারীরিক অসুস্থতাকে মাতার অবাধ্যতা হেতু আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত শাস্তি হিসেবে তুলে ধরে এবং এর জন্য বাচ্চাকেই আল্লাহর কাছে এই মর্মে তওবা করতে বলে যে, "আমি আর মায়ের অবাধ্য হব না, এখন থেকে মায়ের সব কথা শুনব, অতএব আমাকে ভালো করে দাও।" অথচ প্রকৃত প্রস্তাবে ঐ বাচ্চার পক্ষে মায়ের কথা শোনা বলতে বাস্তবে কার্যত মায়ের কথামতো বমি ভক্ষণ করা এবং ঈমানদার ভাই-বোনদের সাথে হিংসা-বিদ্বেষ ও মারামারিতে লিপ্ত হওয়া ছাড়া আর কিছুই বোঝায় না। আর পরবর্তী জীবনে পরিণত বয়সে মায়ের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ বলতে মুসলমানদের মাঝে খুন-খারাবি, হানাহানি ও ফেতনা-ফাসাদে জড়িত হওয়া ছাড়া আর কোন অর্থই দাঁড়ায় না। অতএব, কেউ কখনো ধর্মের দোহাই দিলেই তা সাথে সাথে গ্রহণ করা যাবে না, বরং সে আসলে ধর্মে বিশ্বাসী কিনা ও আল্লাহর অনুগত কিনা এবং সেই সাথে তার আকাঙ্ক্ষা ও কামনা ধর্মের জন্য নিবেদিত নাকি নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ বা ব্যক্তিগত কোন অশুভ উদ্দেশ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট, তা আগে বুঝে নিতে হবে। ধর্মদ্রোহী মুনাফিকরা নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতে বাধাদানের ক্ষেত্রে লেখাপড়া ও জীবনের নিরাপত্তার দোহাই দিলেও আসলে লেখাপড়া বা জীবনের নিরাপত্তা তাদের উদ্দেশ্য নয়, বরং ধর্মের পথ থেকে ফিরিয়ে রাখাটাই তাদের উদ্দেশ্য।
যা কিছু নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থী বা নিজেদের গোমর ফাঁসকারী (অর্থাৎ আসল পরিচয় ও কুৎসিত চেহারা প্রকাশকারী), তা সবই ধর্মবিরোধী অথবা বিধর্মীদের বলে সাব্যস্ত করে থাকে ধর্মব্যবসায়ী প্রতারকরা। যেমন, কোন টিভি সিরিয়ালে শুভ শক্তি ও অশুভ শক্তির দ্বন্দ্ব দেখালো, শুভ ও অশুভ চরিত্রগুলোর বৈশিষ্ট্য, কর্মকাণ্ড ও পার্থক্য খোলাসা করে তুলে ধরা হলো; তা দেখে এরা বলে বসবে, হিন্দুরা শুভ-অশুভ বিশ্বাস করে, শুভ শক্তি ও অশুভ শক্তির বিষয়টা পুরোটাই হিন্দুদের ব্যাপার। অথচ প্রকৃতপক্ষে ভাল-মন্দের পার্থক্য করাটা তো ইসলামেরই শিক্ষা। 'ফুরক্বান' অর্থ সত্য-মিথ্যার প্রভেদকারী। হক বলতে সত্য ও শুভ জিনিসকে বোঝায়, আর বাতিল ও তাগূত বলতে মিথ্যা ও অশুভ শক্তিকে বোঝায়। জগত থেকে অশুভ শক্তির বিনাশ করে শুভ শক্তিকে প্রতিষ্ঠা করাটা তো কিরণমালার সংগ্রাম নয়, এ তো ইসলামেরই সংগ্রাম। শুভ শক্তি তথা সৎ মানুষের সংস্পর্শে মানুষের উপর থেকে (নৈতিক বা পার্থিব) অশুভ প্রভাব কেটে যাওয়া এবং অশুভ শক্তি তথা অসৎ মানুষের সংস্পর্শে মানুষের উপর কুপ্রভাব পড়ার বিষয়টির সত্যতা তো ইসলামে স্বীকৃত। রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "মানুষ তার বন্ধুর ধর্মের দ্বারা প্রভাবিত হয়।" নবী, সিদ্দীক ও আউলিয়া থেকে শুরু করে সকল ঈমানদার সৎকর্মপরায়ণ মুত্তাকী মুমিন বান্দাগণ শুভ শক্তিরই ধারক-বাহক।
মনে বড় দু:খ হয়, আমরা যারা সত্যিকারভাবেই মানুষকে ধার্মিক ও নামাযী বানাতে চাই, ধর্মের দাওয়াত দিতে যাই; আমরা বাস্তবেই ধর্মবিরোধী শয়তান মুনাফিকের দ্বারা নানা উছিলা ও ছলনায় বাধাপ্রাপ্ত হলেও, সত্যিকার ইসলামবিরোধী আচরণ চাক্ষুস দেখতে পেলেও হাড়ে হাড়ে টের পেলেও আমরা তা প্রকাশ করতে পারি না, আল্লাহদ্রোহী জালেম শয়তানের আসল পরিচয় প্রকাশ করার দু:সাহস রাখি না, বা প্রকাশ করতে গেলেও মানুষের কাছে তিরস্কার বা হাসির পাত্র হওয়ার ব্যাপারে ষোলআনা নিশ্চিত জানি; সেখানে ধর্মব্যবসায়ী প্রতারকরা ধর্মের কল্যাণকামী না হয়েও শুধু ব্যক্তিগত আক্রোশে মানুষকে ঘায়েল করবার জন্য ধর্মের নাম দিয়ে তুচ্ছ অযুহাতে মানুষকে কাফের-মুশরিক সাজিয়ে পরিবারে ঘৃণার পাত্র বানিয়ে কোণঠাসা করে রাখতে ঠিকই সমর্থ হয় অতি সহজে বিনা বাধায়। যে সমস্ত ব্যক্তি বা বস্তু আসলেই ধর্মের পথে (বিশেষত বাচ্চাদের ধর্ম শেখা ও ধর্ম পালনের পথে) প্রতিবন্ধক, সেসবের ব্যাপারে আমরা কোন প্রতিকার পাই না; অথচ ধর্মব্যবসায়ীরা তাদের মনগড়া একেকটা বিষয়কে ধর্মের বিরোধীরূপে দাড় করিয়ে (যা আসলে মূলত তাদের নিজেদের বিরোধী, ধর্মের বিরোধী নয়) অনায়াসে বন্ধ করিয়ে দিতে পারে।

(৬) প্রতারকরা নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য মনগড়া তত্ত্ব প্রচার করে থাকে। তাদের মনগড়া কথা ধর্মের নামেও হতে পারে, আবার চিকিৎসাবিজ্ঞানের নামেও হতে পারে। ধর্মের নামে মনগড়া কথার প্রচার জাল হাদীসের মাধ্যমেও হতে পারে, আবার কাল্পনিক কেচ্ছা-কাহিনীর মাধ্যমেও হতে পারে। যেমন- "যে যুগের ইমামকে চিনল না, সে কাফের হয়ে মরল।" চিকিৎসাবিজ্ঞানের নামে নিজের স্বার্থে যে ধরনের ভুয়া কথার প্রচার হতে পারে, তার উদাহরণ হল- "বাচ্চা হওয়ার পর দেড় বছর পর্যন্ত দূরে কোথাও যাওয়া যায় না।" প্রতারকদের মনগড়া মিথ্যাচার ধরা পড়ে যায় তখনই, যখন ভিন্ন ক্ষেত্রে স্থান-কাল ও পাত্রভেদে তাদের ফয়সালা পাল্টে যায়। যেমন, একজনের ক্ষেত্রে দেড় বছরের তত্ত্ব জাহির করবার পর আরেকজনের ক্ষেত্রে যখন আবার বলা হয়, "বাচ্চা হওয়ার পর তিন মাসে একটু হাওয়া পাল্টাতে হয়", তখন তাদের আগের কথার অসারতা ও জালিয়াতি স্পষ্ট হয়ে যায়। মনগড়া তত্ত্ব নিয়ত পরিবর্তনশীল। পাত্র বিচারে এটা নিমিষে বদলে যেতে পারে। যেমন- প্রসূতির স্বাস্থ্য ও শিশুর বর্ধনের জন্য বিশ্রাম গ্রহণটা উপযোগী হবে, নাকি শুয়ে থাকাটা ক্ষতিকর হবে, এটার ফয়সালা নির্ধারিত হবে ব্যক্তি বিচারে। অর্থাৎ, প্রতারক ব্যক্তি কাকে সুবিধা দেবে, আর কার কাছ থেকে সুবিধা আদায় করবে, তার নিরিখেই নির্ধারণ করবে কোন্‌ রোগীর জন্য কোন্‌ পথ্য দেয়া যায়।
মনগড়া তত্ত্ব ছাড়াও প্রচলিত সত্য বিষয়কেও প্রতারকরা খামখেয়ালীপূর্ণ ও উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহার করতে পারে, যাকে বলে "কথা সত্য, মতলব খারাপ"। যেমন, তাদের মতে, গর্ভাবস্থায় ভ্রমণ করাটা গর্ভস্থ বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর, কিন্তু রান্নাঘরে চুলার সামনে দাড়িয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এবং ফিড়ির উপর বসে পেটের বাচ্চার উপর চাপ

(৭) সত্য গোপন করা এবং সত্যের বিপরীত তথ্য প্রকাশ করা প্রতারকদের এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নিজের চরিত্র, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও ভূমিকা, অন্যদের সাথে তার সম্পর্ক ও আচরণ, নিজের ও নিজের সাথে জড়িত (related) অন্যান্যদের অবস্থা ইত্যাদি ব্যাপারে প্রকৃত চিত্র তুলে না ধরে প্রকৃত অবস্থার বিপরীত তথ্য প্রচার করে। সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য; ভালোকে মন্দ, মন্দকে ভালো; অত্যাচারীকে সেবক, আর সেবককে অত্যাচারী; জালেমকে মজলুম, মজলুমকে জালেম; দয়াশীলকে নির্দয়, নির্দয়কে দয়াশীল; সুখীকে দু:খী; দু:খীকে সুখী; শোষকতে ত্যাগী, শোষিতকে ভোগী; ভিকটিমকে বেনিফিসিয়ারী, আর বেনিফিসিয়ারীকে ভিকটিমরূপে তুলে ধরে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা টাউট, তারা আপনাকে উত্তমরূপে গজ দিয়ে দেবার পরও এমন ভাব দেখাবে, যেন আপনার পিছনেই সে যত সময়, অর্থ ও এনার্জি ক্ষয় করেছে; আপনার মাল মেরামত করতে গিয়ে নিজের আরো তিনটা মাল নষ্ট করে ফেলেছে; শুধু নেহায়েত ভালবাসা আর সম্পর্ক রক্ষার খাতিরে আপনার কাজটা করে দিল ইত্যাদি। আপনাকে ঠকিয়ে নিজে লাভবান হলেও মানুষের কাছে প্রচার করে বেড়াবে, আপনার প্রতি সে কত অনুগ্রহ করছে, আপনাকে বড়লোক বানিয়ে দিচ্ছে। ঘরের গিন্নীদের মধ্যে যারা একটু প্রতারক টাইপের, তারা ছেলের বউ অবস্থায় শ্বাশুড়ী-ননদের থেকে বেশি সার্ভিস পেয়ে ও নিজে তুলনামূলক কম সার্ভিস দিয়ে আসলেও এবং শ্বাশুড়ী অবস্থায় ছেলের বউকে উত্তমরূপে নিংড়ে খেয়ে বাচ্চাসহ অসুস্থ বানিয়ে দিলেও মানুষের কাছে প্রচার করে বেড়াবে যে, বউ অবস্থায় নিজে যেরূপ কষ্ট করে নিজের জীবনটা বরবাদ করে এসেছে, নিজের ছেলের বউয়ের উপর সেই তুলনায় ফুলের টোকাটিও লাগতে দেয়নি, নিজের কারণে নিজের মত কষ্ট আর কেউ ভোগ করুক এটা চায়নি বলেই সে মানুষকে অনেক সুযোগ ও ছাড় দিচ্ছে। পুত্রবধু এমনকি পুত্রের ঘরের নাতি/নাতনির উপর নিজের যত হিংসা-বিদ্বেষ, বৈষম্য ও বৈরী মানসিকতা আছে, সব চাপা দিয়ে মানুষের প্রতি তার সেবা ও অনুগ্রহের চিত্র এমনভাবে তুলে ধরবে যে, মানুষ শুনে মুগ্ধ হয়ে যাবে যে, আহা! জগতে এনার মত শ্বাশুড়ীই আর হয় না। সব মিলিয়ে বউকে কতটা রাজার হালে রেখে জামাই আদরে লালন-পালন করছে, নিজেই বরং বউকে গোষ্ঠীশুদ্ধ রান্না করে খাওয়াচ্ছে- এমন একটা ভাব দেখাবে, আর তা যথাসম্ভব সবাইকে বিশ্বাসও করিয়ে ছাড়বে। বউকে কত রকম ছাড় ও সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে, তার ফিরিস্তি একদিকে শোনাবে; অপরদিকে বউটা কতবড় মুখপোড়া ও হতভাগা, কোন সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগাতে পারে না, কিংবা কত বড় অকৃতজ্ঞ, তার বয়ান শোনাবে- যা শুনে বউয়ের অবস্থা সম্পর্কে আপনাদের মনে হবে যেন 'কুত্তার পেটে ঘি সয় না'। নিজে চরম স্বার্থপর হিংসুক হওয়া সত্ত্বেও মানুষের কাছে এমন একটা আবহ তৈরি করবে যে, শ্বাশুড়িটা একেবারে ফেরেশতার মত সাদা মনের শান্তিপ্রিয় মানুষ, আর তার বিপরীতে দেখো কেমন একটা বউ জুটেছে, যে এই রকম একটা মহান শ্বাশুড়ী পেয়েও দোয়া নিতে জানে না। কখনো নিজের জন্য বা নিজের প্রিয় কারো জন্য কিছু তৈরি করে বা করিয়ে (নিজে হোক, অন্য কারো দ্বারা হোক, বা খোদ আপনার দ্বারাই তৈরি করানো হোক) আপনার কাছে দাবি করবে, আপনার জন্য বা আপনার বাচ্চার জন্য তৈরি করেছে। তদুপরি পুত্রবধূর বাচ্চা জন্মের আগে থেকে অর্থাৎ একদম শুরু থেকেই বউকে সার্বক্ষণিক সংসারের কাজে (অর্থাৎ নিজের মেয়েদের সেবায়) ব্যস্ত রাখা এবং বাচ্চার কাছে ঘেঁষার সুযোগ না দিয়ে বাচ্চাকে অনাদরে অবহেলায় ফেলে রাখতে বাধ্য করা সত্ত্বেও প্রচার করবে, বউ সংসারের কাজ কিছুই করে না, শুধু নিজের বাচ্চা নিয়েই পড়ে থাকে! অপরদিকে নিজের মেয়েরা আহার যোগান থেকে শুরু করে বাচ্চা পালন পর্যন্ত সকল সার্ভিস অন্যদের কাছ থেকে লাভ করা, বাচ্চা পালনে কোনরূপ কষ্ট বা বেগ পেতে না হওয়া এমনকি নিজের পরনের কাপড়ের নোংরা বস্তুটিও অন্যের দ্বারা পরিষ্কার করিয়ে নিতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও বলে বেড়াবে, "আহারে! মেয়েটা আমার দু'দুটা বাচ্চা নিয়ে কতই না দু:খে কষ্টে দিন অতিবাহিত করছে, আমার মেয়েটার মতন এমন জনমদু:খিনী মা আর জগতে দ্বিতীয়টি নেই। অপরদিকে দেখো, আমার বউমাটা মাত্র একটি বাচ্চা নিয়ে কতই না সুখে-আরামে জিন্দেগী অতিবাহিত করছে!" বউ জ্বালানোর উদ্দেশ্যে নিজের মেয়েদের ফরমায়েশ মত রান্নার আইটেম নির্বাচন, রান্নার মান (quality) ও আইটেম সংখ্যা (quantity) নিশ্চিত করতে রান্নার সামনে দাড়িয়ে থেকে dictation প্রদানের জন্য পাকঘরে অবস্থান করলেও এবং রাঁধুনী বউয়ের সামনে অযাচিতভাবে দাড়িয়ে থেকে কাজের চাপ (load) বাড়ানোটা বউয়ের নাভিশ্বাস ওঠার কারণ ঘটালেও ঘরশুদ্ধ মানুষেরা (যাদের জন্য করা হচ্ছে সেই মেয়েরা সহ) এমন ভাব দেখাবে- যেন বউকে সহযোগিতা (help) করবার জন্য, বউয়ের কাজের চাপ কমানোর জন্য, বউয়ের কষ্ট লাঘব করবার জন্যই উনি পাকঘরে পড়ে আছেন। তথ্য বিকৃতি ও ইতিহাস বিকৃতির কাজেও এদের জুড়ি মেলা ভার। ছেলের বউকে শুধু নিজেদের রসনা বিলাসের যোগান দিতে ব্যস্ত রেখে শুধু নিজের যুবতী মেয়েদের পছন্দমত রান্না করতে বাধ্য করা এবং বাচ্চার জন্য কোন একটা খাবার বাচ্চার উপযোগী করে আলাদাভাবে রান্না করবার সুযোগ বা অনুমতি না দেয়া সত্ত্বেও পরবর্তীতে এরা প্রচার করে, "দেখো, কী নিষ্ঠুর মা! সে অন্যের জন্য তো দূরের কথা, নিজের বাচ্চা ঝাল খেয়ে কষ্টে ক্রন্দন করলেও নিজের বাচ্চাটির জন্যও কোনদিন আলাদা ঝাল ছাড়া তরকারি রান্না করেনি।" এদের মিথ্যাচার ও ইতিহাস বিকৃতির আরেক জঘন্য নজির হল, নিজের বাচ্চাকে হুকুম (নির্দেশ) ও তালিম (প্রশিক্ষণ) দিয়ে ভাইয়ের বাচ্চাকে শারীরিকভাবে নিয়মিত আঘাত ও জখম করার পরও উল্টো আবার নিজের বাচ্চার কাছে সম্পূর্ণ কাহিনীটাই ঘুরিয়ে বলে যে, তোমার মামাতো বোনটাই তোমাকে শুধু মারত আর ধাক্কা দিত। উদ্দেশ্য, বাচ্চাকে উষ্কানী দিয়ে ক্ষেপিয়ে তুলে আরো অধিক ফেতনায় লিপ্ত করা। যেখানে সে সর্বদা সবরকমভাবে কেবল ভাইয়ের বাচ্চাটার ক্ষতি করার কাজেই নিবেদিত থেকেছে- নিজের হাত দিয়ে, কাজের মেয়েকে দিয়ে, নিজের মেয়েকে দিয়ে ভাইঝিকে সবসময় শুধু ধাক্কাই মেরেছে; সেখানে সে ভাইয়ের মেয়েকেই ধাক্কাদাতা আর নিজের মেয়েকেই ধাক্কার শিকার হিসেবে তুলে ধরে। আবার কোন কোন খচ্চর মহিলা আছে, প্রবাসী স্বামীর কষ্টার্জিত অর্থ-সম্পদ পরকীয়া শয্যাসঙ্গী নিয়ে নিজের সুখ-সম্ভোগে ব্যয় করা এবং একমাত্র শিশুপুত্রটিকে অনাহারে শুকিয়ে কাঠ বানিয়ে ফেলার পরও মানুষের কাছে প্রচার করে বেড়াবে, সে নিজে কিছুই খায় না, সব শুধু খাদক বজলুটাকেই খাওয়ায়। আবার সেই খচ্চর মহিলার ভাবশিষ্য কোন কোন খাডাস মহিলা আছে, যে বাপের বাড়িতে জেঁকে বসে দুধের ভাণ্ড সব নিংড়ে সাবাড় করে নিজেদের গতরে চর্বি জমিয়ে ফেলার পরও বাপের কাছে গিয়ে হিসাব দেবে, দুধের বাবদ খরচ যা হয়েছে তা শুধু তার ঐ ভাইয়ের বাচ্চাটার পিছনে। নিজেরা টিভি দেখায় চ্যাম্পিয়ন হলেও বলে বেড়াবে, এ সংসারে টিভি আর কেউ দেখে না, শুধু ঐ ভাইয়ের বাচ্চাটাই দেখে। এ ধরনের কুটনী মার্কা শ্বাশুড়ী-ননদরা নিজেরা একতরফাভাবে ছেলের বউ ও ভাইয়ের বউকে এবং সেই সাথে ছেলের ঘরের নাতনী ও ভাইঝিকে শুধু পর নয় রীতিমতো শত্রুজ্ঞান করলেও এবং তাদের সাথে একপ্রকার অঘোষিত যুদ্ধে লিপ্ত থেকে তাদের শ্রম-স্বাস্থ্য-সম্পদ সবকিছুকে গনীমত হিসেবে গণ্য করে আসলেও উল্টো বরং পুত্র-পুত্রবধু বা ভাই-ভাবীর নামেই স্বামী বা পিতার কাছে (এবং তার মাধ্যমে সমাজের আর সবার কাছে) প্রচার চালাবে যে, তোমার এই আদরের ছেলে আর ছেলের বউ তো আমাদেরকে আপনই মনে করে না, সংসারটাকে নিজের মনে করে না, তোমার মেয়েরা বেড়াতে আসলে সুনজরে দেখে না, তোমার মেয়েদেরকে আপদ ও জঞ্জাল মনে করে, এমনকি পিতামাতাকেও বোঝা মনে করে। অথচ প্রকৃতপক্ষে পিতামাতা বা শ্বশুর-শাশুড়ীকে বোঝা মনে করার তো কোন কারণই ছিল না, এমনকি ননদদের বেড়াতে আসাটাতেও আপত্তির কিছু ছিল না। সমস্যার কারণটা ছিল শুধু ননদগণ কর্তৃক পরিকল্পিতভাবে অনাবশ্যক কাজের বোঝা চাপানোর মাধ্যমে ও মুখের গ্রাস কেড়ে নেবার মাধ্যমে ভাইয়ের বউ-বাচ্চাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করা এবং পিতামাতার কানে বিষ ঢালার মাধ্যমে তাঁদের মনকে বিষিয়ে তুলে সংসারে বিভেদ ও অশান্তি সৃষ্টি করা; এমনকি বাচ্চাদের মধ্যেও মারামারির উষ্কানী দিয়ে নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করা। এই মিথ্যাবাদী ও মিথ্যাশ্রয়ীদের জঘন্য ও কুৎসিত পরিকল্পনাটি হলো, গোষ্ঠীশুদ্ধ সবাই মিলে মানুষের ঘাড়ে চেপে বসে তার উপর একের পর এক কাজের বোঝা চাপিয়ে মানুষের সামর্থ্য ও কর্মক্ষমতাকে পুরোপুরি শুষে নেবার পর তাকে বের করে দিয়ে প্রমাণ করবে, "দেখো! আমরা বলেছিলাম না, বউটা কত অপদার্থ, নিজের রান্নাটুকুও করে খেতে পারে না? এতদিন শাশুড়ীর রান্না বসে বসে খেতে পেরেছিল বলেই খেয়ে বেঁচে ছিল।" অপরদিকে কোন কোন বেয়াদব বউ আছে, স্বামী বা শ্বশুর-শাশুড়ী কারো সাথে ঝগড়া হলে তার বিবরণটা খণ্ডিত ও একপেশেভাবে প্রকাশ করে এবং নিজের সন্ত্রাসী আচরণের কথা বেমালুম চেপে গিয়ে নিজের হাজারো আগ্রাসী বাক্যবানের দ্বারা প্ররোচনা দিয়ে বের করা প্রতিপক্ষের দু'একটি কথাকেই রাষ্ট্র করে দিতে শুরু করে। তার ভাবখানা এমন হয় যে, আমি শুধু (স্বামীকে) একটা ভাল সৎ পরামর্শ দিয়েছিলাম বা কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম, বা (শাশুড়ীকে) রান্নার ব্যাপারে একটা কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম, বা (শ্বশুড়ের কাছে) ছেলের প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলাম, আর তাতেই খামাখা আমাকে যা তা বলেছে, আমাকে অসভ্য-বেয়াদব বলেছে ইত্যাদি। অনেক সময় দেখা যায়, স্বামী বাচ্চার ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপারে শতভাগ আন্তরিক হলেও এবং আল্লাহর নাম-পরিচয় থেকে শুরু করে নামায-কালাম বাচ্চাকে আদর ও সদ্ব্যবহারের দ্বারা শিখিয়ে আসলেও এবং তার বিপরীতে স্ত্রীর ভূমিকা সর্বদা কার্যত বাচ্চার ধর্মশিক্ষার প্রতি বৈরী হওয়া সত্ত্বেও রাতারাতি হঠাৎ করে কোন একদিন ধর্মদরদী সেজে বাচ্চাকে মেরে-বকে আলিফ-বা ও কায়দা পড়তে বসিয়ে দিয়ে বাহাদুরী দেখাতে শুরু করে, আর দাবি করে, "আমি আরবী পড়াতে না বসালে পড়ানোই হয় না, তুমি নিজে তো পড়াতে পারই না, উল্টো আমাকে বাধা দাও।" এমনকি বাচ্চার ধর্মশিক্ষা ও ধর্মপালনের ক্ষেত্রে নিজের নেতিবাচক মনোভাব, তাচ্চিল্যবাদী প্রবণতা ও প্রতিকূল আচরণকে আড়াল করবার জন্য স্বামী ও বাচ্চার শারীরিক সমস্যাবশত: সকালে ঘুম থেকে ওঠায় বিলম্বের অযুহাত তুলে 'হিন্দুর বাচ্চা', 'খুলুর জাত' ইত্যাদি আবোল তাবোল গালাগাল দিয়ে প্রলাপ বকতে শুরু করে।  যে মহিলা বাচ্চার কার্টুন দেখা আর কোরআন তেলাওয়াত দেখাকে একই জিনিস হিসেবে সাব্যস্ত করে চরম নাস্তিক্যবাদী মনোভাবের পরিচয় দিয়েছে, সেই মহিলাই আবার স্বামী-সন্তানকে রাজনৈতিকভাবে জব্দ করবার প্রয়োজনে তাদের উপরেই নাস্তিকতার অপবাদ আরোপ করে বসে। অনেক বাচ্চার মাকে বলতে শুনবেন, বাচ্চার বাপের কারণে লেখাপড়া শেখাতে পারেনি, বা বাচ্চার দাদা-দাদী বাচ্চাকে লেখাপড়া শেখাতে দেয়নি, এদের আহলাদের কারণেই আমার একসময়কার মেধাবী বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গেল, তার লেখাপড়া সব জলে গেল ইত্যাদি। অথচ সচেতন ব্যক্তি মাত্রই এসবের ক্ষেত্রে প্রকৃত কারণটা (real case) ঠিকই ধরতে পারেন যে, বাচ্চার পিতা বা দাদা-দাদী লেখাপড়ায় বাধা দেয়নি, বরং তাদের আপত্তি ছিল কেবল লেখাপড়ার নামে অযৌক্তিক ও বাড়াবাড়িপূর্ণ জবরদস্তি ও নির্যাতনের ব্যাপারে। এরা এতটাই কুচক্রী ও হীন প্রকৃতির যে, মিথ্যা প্রচারণার দ্বারা বাচ্চাকেও তার বাবার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে এবং 'বাবাই আমার হাতের লেখা ও ড্রইংটা খারাপ করে দিল"- এমন একটা ক্ষোভমিশ্রিত ধারণা বাচ্চার মনে জাগিয়ে তোলে। অথচ বাচ্চার বাবার আপত্তি ছিল হাতের লেখা ও ড্রইংয়ের নামে মারামারি ও ধমকাধমকির ব্যাপারে, মাত্রাতিরিক্ত হাতের লেখা ও চর্বিত চর্বন করিয়ে বাচ্চার হাত ব্যথা বানানো নিয়ে। বাচ্চার বাবার অপরাধ ছিল তুচ্ছ বিষয়ে বাচ্চার জীবনীশক্তি ক্ষয় না করে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাকে প্রাধান্য দেয়া এবং আল্লাহর দ্বীন শিক্ষা ও বাচ্চাকে নামাজী বানানোর বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা। এক্ষেত্রে বাচ্চার পিতা তার সত্যিকার হিতাকাঙ্ক্ষী হওয়া সত্ত্বেও এবং এ বিষয়টি বাচ্চার মা জানা সত্ত্বেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাচ্চার বাবাকেই বাচ্চার অনিষ্টকারী ও অনিষ্টকামীরূপে সাব্যস্ত করে এবং বাচ্চার বাবার প্রতি বাচ্চার মনকে বিষিয়ে তোলার চেষ্টা করে। আবার কোন কোন মা নামক ডাইনী কুলাঙ্গারকে বলতে শুনবেন, বাচ্চার দাদী-ফুপুর কারণে বা চাচাতো বড় ভাইয়ের কারণে বাচ্চাকে শান্তিমত একটু খাওয়াতেও পারলাম না, ওদের জ্বালায় আমি বাচ্চাকে কিছুই খাওয়াতে পারি না, ওদের কারণেই আমার বাচ্চাটা না খেয়ে শুকিয়ে গেল! অথচ এক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যাপারটা হল, মহিলা সম্পূর্ণ অন্য কারণে (বাচ্চার বাবার সাথে বিরোধ ও মনোমালিন্য, নিজের পরকীয়ায় বাধাপ্রাপ্তি এবং কারো কারো ক্ষেত্রে চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে নিজে শয়তানে পরিণত হবার পর নিজের আল্লাহদ্রোহিতা ও ধর্মীয় বিদ্বেষবশত বাচ্চাকে ধর্মচ্যুত ও বিপথগামী করবার উদ্দেশ্যে) বাচ্চাকে নির্যাতন করবার হাতিয়ার ও অযুহাত হিসেবে খাওয়ানোটাকে একটা উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করে মাত্র; আর যারা এর বিরোধিতা করে, বলাবাহুল্য তাদের বিরোধিতা বাচ্চাকে খাওয়ানোর ব্যাপারে নয় বরং খাওয়ানোর নামে অযথা অত্যাচার করার ব্যাপারে। আবার একদল লোক আছে, প্রতিপক্ষের নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে সম্পূর্ণ বিনা দোষে চাপা মার দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েও মানুষের কাছে প্রচার করে, ওরাই শুধু যত তাণ্ডব করেছে, আর আমরা ওদেরকে সযত্নে সসম্মানে জামাই আদরে যার যার বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছি, এমনকি যারা পথ-ঘাট কিছুই চেনে না তাদেরকেও তাদের বাড়ির লাইনের বাস-ট্রেনের স্টেশনটা চিনিয়ে দিয়েছি, টিকেটটাও কেটে দিয়েছি একেবারে বিনে পয়সায়! আবার আরেকদল আছে, মানুষের উপর পেট্রোল মারতে এসে বাসের চাপায় আহত হয়ে ধরা পড়ার পর দাবি করে, পুলিশ আমাদের লোককে অন্যায়ভাবে ধরে নিয়ে এসেছে। আবার যারা বলে, আমরা শুধু একটু বিজ্ঞান চর্চা করতে চেয়েছিলাম, আর তাতেই মানুষ আমাদের ফাঁসি চাইতে শুরু করে দিল; তারাও সত্য গোপনকারী, সত্যের অপলাপকারী। মিথ্যাবাদী প্রতারক ও মতলববাজরা যেকোন ঘটনার সংবাদ প্রকাশের বেলায় ঘটনার মূল বিষয় বা সমস্যাটা পাশ কাটিয়ে ভিন্ন কোন বিষয়কে খবরের শিরোনাম হিসেবে বেছে নেয়। যখন কোন নিপীড়িত জনগোষ্ঠী আগুনে পুড়ে মরা থেকে বাঁচার জন্য কোনমতে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে আসে, এমনকি পালিয়ে এসেও শেষরক্ষা না পায় বরং উল্টো হয়রানি ও অমানবিক আচরণের শিকার হয়, তখন এদের মূল শিরোনাম হয়: "অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না"। প্রতারণা ও পক্ষপাতদুষ্টতার স্পষ্ট নজির হলো গণহত্যাকে সামরিক অভিযান এবং প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নিতে চাওয়াকে অনুপ্রবেশ হিসেবে প্রচার করা।
কোন ঘটনায় মূল বিষয় বা মূল ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে ঘটনার ভিন্ন কোন ডাইমেনশনকে সামনে নিয়ে এসে অপরাধীদের পক্ষে সাফাই গাওয়া বা মানুষের সহানুভূতি আদায় করা মতলববাজদের একটি পলিসি। অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে না দেখে এবং অপরাধীর আসল অপরাধটিকে আড়াল করে অপরাধী ব্যক্তির অন্য কোন অপ্রাসঙ্গিক সত্য বা মিথ্যা তথাকথিত গুণ, যোগ্যতা বা পরিচিতিকে সামনে নিয়ে এসে অপরাধীকে innocent victim হিসেবে তুলে ধরে। যেমন- কোন ব্যক্তি আল্লাহকে বা রসূলকে অসম্মান করবার কারণে জনসমক্ষে লাঞ্ছিত ও ধিকৃত হলো, তখন সে কি কারণে নিগৃহীত ও শাস্তিপ্রাপ্ত হলো সেটা বলার পরিবর্তে তার অপর কোন কর্ম ও অবদান বা পেশাগত পরিচয়কে খবরের শিরোনাম ও বর্ণনার বিষয় বানায়। অথচ একজন অপরাধী কেবল অপরাধীই। সে বিজ্ঞানী হোক বা ভাষাবিদ হোক কিংবা শিক্ষক হোক, তা তার অপরাধকে বৈধ করে বা মওকুফ করে দিতে পারে না। এদের যুক্তির ধরন অনেকটা এইরকম, "ছাত্ররা হেডমাস্টারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে অন্যায় করেছে, কারণ হেডমাস্টার একজন সঙ্গীতপ্রিয়।"
আসলে যারা বিনা প্রয়োজনে ঠাণ্ডা মাথায় যেচে মিথ্যা ও মনগড়া কথা বলতে পারে, আসল সত্যকে জেনেশুনে বিকৃত করতে পারে, তারা প্রয়োজনে মানুষ খুনও করতে পারে। একজনকে খুন করে তার দায় আরেকজনের ঘাড়ে চাপিয়েও দিতে পারে। তাই এসব ব্যক্তির থেকে সবসময় সাবধান থাকা দরকার।

(৯) মন্দ কাজে ভাল উদ্দেশ্য দাবি করা: মন্দ কাজে ভাল উদ্দেশ্য দাবি করা আর কল্যাণ ও উপকার সাধনের নামে অনিষ্ট ও সর্বনাশ সাধন করা মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য। তারা প্রতিহিংসামূলক নির্যাতনকে সংশোধনমূলক শাস্তি হিসেবে দাবি করে। এমনকি কাউকে নষ্ট করা বা খারাপ বানানোর উদ্দেশ্য কাজ করলেও মুখে বলে, ভাল বানাতে  চাচ্ছে, মানুষের ভাল করা ছাড়া তাদের আর কোন উদ্দেশ্যই নেই। কোন কোন ব্যভিচারী মুরতাদ মাকে বলতে শোনা যায়, "আমি তো বাচ্চাটাকে মেরে মেরে শাসন করে ভাল বানাতে চাই, তোমরাই ওকে আহলাদ দিয়ে নষ্ট করেছ। তোমরাই (যারা মারতে দেয় না বা নির্যাতনের বিরোধিতা করে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে) যত নষ্টের মূল!" আবার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও দেখা যায়, যারা জনজীবনে ফাসাদ ও অশান্তি সৃষ্টি করে, নিজেদের ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারের স্বার্থে হোক বা ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে হোক; তারাও গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শান্তি ও মীমাংসার নামে তা করে থাকে। কাফের, জালেম ও অপরাধীদেরকে প্রশ্রয় ও সুযোগ দানের বেলায় শান্তি ও মীমাংসার দোহাই দেয়; আর মুসলিম, মজলুম ও নিরপরাধদের উপর আগ্রাসন ও নির্যাতন চালানোর বেলায় সংশোধনের নামে শাস্তি প্রদানের বাহানা দেয়। কেউ কেউ আছে জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার নামে জনগণেরই নাভিশ্বাস উঠিয়ে দেয়, জনগণকে 'বাপ' ডাকিয়ে ছাড়ে।
যারা মানুষের কল্যাণ ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে অকল্যাণ ও অশান্তি সৃষ্টি করে, সেই সমস্ত জালেম প্রতারকদের সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে, وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لاَ تُفْسِدُواْ فِي الأَرْضِ قَالُواْ إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ অর্থাৎ, "আর যখন তাদেরকে বলা হয় যে, দুনিয়ার বুকে ফাসাদ সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, আমরাই তো মীমাংসাকারী/সংশোধনকারী/সমাধানকারী/শান্তিস্থাপনকারী।" (সূরা বাকারা: ১১)

(৭) প্রতারকরা সবসময় দ্বিমুখী ভূমিকা পালন করে এবং তাদের আচার-আচরণ দ্বিমুখী হয়ে থাকে। তারা কখনো একই নীতির উপর স্থির থাকতে পারে না। সকল সময় সবার ক্ষেত্রে একই নীতি প্রয়োগ তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। বরং স্থান, কাল ও পাত্রভেদে তাদের মন-মানসিকতা, কথাবার্তা ও কার্যকলাপ পরিবর্তিত হতে দেখা যায়। মানুষ পরের দু:খের চেয়ে নিজের দু:খটা একটু বেশি অনুভব করবে এটা স্বাভাবিক। একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় সীমাবদ্ধ থাকলে সেটাকে স্বাভাবিক মানবীয় দুর্বলতা হিসেবে মেনে নেয়া যায়। কিন্তু নিজের ও পরের দু:খ বোঝার ব্যবধানটা যখন স্বাভাবিকতার মাত্রা ছাড়িয়ে অনেক বৃহত্তর মাত্রায় দেখা যায়, তখন এটাকে দ্বিমুখী চরিত্র হিসেবেই ধরা যায়। দ্বিমুখী লোকদের ক্ষেত্রে অনুভূতি হয়ে থাকে অসম্ভব রকমের আপেক্ষিক। তারা পরের কষ্টকে আদৌ কোন কষ্ট বা সমস্যাই মনে করে না, কিন্তু নিজের সামান্য কষ্টকেই বড় করে দেখে। এদের স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার উদাহরণ হল একদিকে নিজের কারণে অন্যান্য মানুষ সব পুড়ে মরতে দেখেও নির্বিকার থাকা, অপরদিকে নিজের ছেলের স্বাভাবিক মৃত্যুতেও অজ্ঞান হয়ে পড়া। এমনকি একদিকে নিজের কোন দলীয় কর্মীকে রিকশা চালাতে দেখে অশ্রুসংবরণ করতে না পারা, অপরদিকে সাধারণ মানুষকে একটা দিনের জন্যও আগুনে পোড়া থেকে অব্যাহতি দিতে রাজি না হওয়া। নিজ দলের সব নেতা-কর্মী পাজেরো এসি গাড়িতে চিরদিন আরামে কাটাবেন, আর সাধারণ মানুষ পাবলিক বাসের ভিতর পেট্রোলে জ্বলে অঙ্গার হতে থাকবে- এমন অযৌক্তিক অসম ফয়সালা কামনা করা। দ্বিমুখী স্বভাবের ব্যক্তি নিজে পুত্রবধূ থাকাকালে শাশুড়ী যদি তাকে কোন খাবার খাওয়ার জন্য সাধতে গিয়ে তা সে খায় কিনা সেটা জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়ে নিতে চায় (যদিও তা খাবার না দেবার উদ্দেশ্যে কৃপণতাবশত: নয়), সেটাই তার দীর্ঘশ্বাস ও দু:খের কাহিনীতে পরিণত হয়। অথচ......পুত্রবধূর স্বাভাবিক পোশাক-আশাক দেখেও তার এলাকার নাম ধরে ইঙ্গিত করে 'অমুক এলাকার মানুষ বেশি সাজগোজ করে' এরূপ প্রচার করা, এছাড়া কোন রাষ্ট্র বা সম্প্রদায় যদি আশপাশের দেশগুলোতে গণতন্ত্র ও ইসলামী বিপ্লব রফতানি করলেও নিজের কোল ঘেষা শুধু একটিমাত্র দেশকে এর আওতার বাইরে রাখে, গণতন্ত্র ও ইসলাম গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেয়, তাহলে এটাও দ্বিমুখী নীতির সবচেয়ে জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। আবার নিজেরা গোমাংস ভক্ষণ বা গোমাংসের ব্যবসায় জড়িত থেকেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে গোমাতাভক্তি ও গরুপ্রীতি দেখিয়ে সাম্প্রদায়িক উষ্কানী দিয়ে মানুষ হত্যা করাটাও দ্বিমুখী নীতিরই পরিচায়ক। যে তোমাকে কথায় কথায় গলা কেটে বা গলা টিপে হত্যার অভিলাষ প্রকাশ করেছে, হত্যার চেষ্টাও কম করেনি; হত্যার উদ্দেশ্যে নির্যাতন যেমন নিয়মিতভাবে করেছে, তেমনি নাশকতামূলক অঘটনও কম ঘটায়নি; সে-ই যখন তোমার প্রাণনাশের আশংকার ধোঁয়া তুলে মসজিদে যাওয়া থেকে বিরত রাখে, তখন সেটাকে মুনাফেকী, ভণ্ডামী আর দ্বিমুখী নীতিরই প্রতিফলন হিসেবে ধরে নেবে। আবার বাড়ির পাশের মসজিদে যাওয়াটাকে যে শুধু রাতের অন্ধকারের দোহাই দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করেছে, সে-ই যখন কোন মারামারি-হানাহানির মত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তোমাদের কাউকে নিয়োগ দিতে চাইবে, সেটাকেও দ্বিমুখী নীতি ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। আবার এমন শয়তান দুর্বৃত্ত ব্যক্তির আল্লাহদ্রোহী মুনাফেকী চরিত্রের কথা যদি প্রকাশ করতে যান, তখন দেখবেন পরিবারের মধ্যে এই ব্যক্তির ভক্ত-অনুচরেরা বলতে শুরু করবে, মুসলমানকে কাফের বা দোযখী বলা বৈধ নয়। অথচ তারাই আবার যখন নিজেদের বাচ্চাদেরকে কথায় কথায় কারণে অকারণে কাফের ফতোয়া দিতে শুরু করে- "বাবা-মায়ের কথা না শুনলে দোযখে যাবে", "কিরণমালা দেখলে কাফের হয়ে যাবে", "হিন্দুর বাচ্চা হয়ে গেছ"; বা নামাযে আসতে একটু দেরি হলেই "নামায যখন পড়তে আসছ না তাহলে কিরণমালা দেখে মূর্তিপুজা করে হিন্দু হয়ে যাও গে" ইত্যাদি সস্তা বুলি আওড়াতে শুরু করে; তখন এটাও একপ্রকার দ্বিমুখী নীতিরই প্রতিফলন। দ্বিমুখী নীতির আরেকটি উদাহরণ হল, নিজের মেয়েরা ২৪ ঘন্টা স্টার-জলসা ও জি-বাংলা নিয়ে পড়ে থাকলেও তা নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য না করা, আবার সেই মেয়েদেরই প্ররোচনায় ভাইয়ের পরিবারের আধ ঘন্টা 'কিরণমালা' দেখা নিয়ে সরব হয়ে ওঠা। ছেলের পরিবার যখন টিভি চালাবে, তখন টিভি প্রোগ্রাম শেষ না হওয়া পর্যন্ত খাবার টেবিলে আসা চলে না, কিন্তু টিভির রিমোটটি নিজের মেয়ের হাতে থাকা অবস্থায় টিভির সামনে খেতে আসলেও জাত যায় না। একই টিভি  চ্যানেল বা একই তেলে ভাজা খাদ্যের বেলায় যদি একজনের ক্ষেত্রে চোখ বা নাক রুমাল দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়, আর আরেকজনের ক্ষেত্রে হৃদয়টা উদার ও প্রশস্ত করে দেয়া হয়, তখন সেই ঘরে ছেলেমেয়েদের মধ্যে মিল-মহব্বত তো দূরের কথা, শান্তি বা সমঝোতাও কিয়ামত পর্যন্ত কায়েম হবে না। এই জগতে দ্বিমুখী নীতির সর্বাপেক্ষা প্রকাশ্য ও নির্লজ্জ নজিরটি হলো একজনকে বাপের বাড়িতে রেখে সেবা ও আরাম দেবার জন্য আরেকজনের বাপের বাড়ি যাওয়া নিয়ে চোখ গরম করা। নিজের বিবাহিত মেয়েদেরকে কোলের মধ্যে রেখে বউকে দিয়ে মেয়েদের পছন্দের সব খাবার আঞ্জাম দেয়া; আর বউ যদি দু'দিনের জন্য পিতৃগৃহে অবস্থানরত ননদদের সেবায় বিরতি দিয়ে নিজের পিত্রালয়ে যায়, তাহলে এই মর্মে অনুযোগ করা যে, "তোমাদের মত কেউ বেড়ায় না" (অর্থাৎ তোমার মত কেউ শ্বশুর বাড়ি যায় না বা তোমার বউয়ের মত কেউ বাপের বাড়ি থাকে না)। এছাড়া নিজেরা মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল না হয়ে মানুষের কাছ থেকে সহানুভূতি আশা করাটাও একপ্রকার দ্বিমুখী নীতির অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে নিজেদের স্বার্থে ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে অসুস্থ বানানো এমনকি মাসুম বাচ্চার অসুস্থতাকেও আমলে না নেয়া, আর নিজেদের অসুস্থতার সময় মানুষের অনিচ্ছাকৃত ও অনবধানতাবশত এগিয়ে আসতে ব্যর্থতাকেও ইচ্ছাকৃত অবহেলা হিসেবে গণ্য করে অনুযোগ তোলা দ্বিমুখী মানসিকতারই পরিচায়ক। দ্বিমুখী নীতির আরেকটি উদাহরণ হল, বাচ্চা ঘুমানোর সময় নবী-রসূলদের গল্প শুনতে চাইলে ঘুমাতে বিলম্ব হবার জিগির তুলে চেঁচামেচি জুড়ে দেয়া, কিন্তু ইংরেজি শব্দ মুখস্থ করানোর বেলায় ঘুমাতে বিলম্বের বিষয়ে ভ্রূক্ষেপ না করা, এমনকি বাচ্চার ঘুমের সময় অন্যান্য প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে আলাপ জুড়ে দিয়ে বাচ্চার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার বিষয়টিতে পাত্তা না দেওয়া। দ্বিমুখী নীতির ব্যাপারে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে আমার "বিভ্রান্ত দল চেনার উপায়" শীর্ষক অপর একটি লেখার ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে।

(৭) মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হল, মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালবাসে নিজের সন্তানকে এবং বড় মানুষের তুলনায় বাচ্চাদের প্রতি স্নেহ-ভালবাসা, দয়া-মায়া ও অনুরাগ একটু বেশি থাকে। কিন্তু কাউকে যদি দেখেন, নিজের সন্তানের প্রতি দুর্ব্যবহার বা উদাসীনতা প্রদর্শন করছে, কিন্তু অন্যদের প্রতি যেচে দরদ দেখাচ্ছে; কিংবা বাচ্চাদের প্রতি কঠোর হলেও বড়দেরকে অতিরিক্ত খাতির-যত্ন ও আদর-আস্তিক করছে; তাহলে বুঝবেন, এ আচরণ আন্তরিক নয় বরং বিশেষ কোন উদ্দেশ্য হাসিলের নিমিত্তে পরিচালিত। এ ধরনের কৃত্রিম দরদের সর্বনিম্ন লক্ষ্য হতে পারে মানুষের কাছে ভাল সাজা ও প্রশংসা-সুনাম অর্জন করা। মাঝারি মানের লক্ষ্য হতে পারে মানুষকে পটিয়ে সম্পত্তি বা অন্য কোন পার্থিব সুবিধা হাসিল করে নেয়া। আর সর্বোচ্চ লক্ষ্য হতে পারে মানুষের হিতাকাঙ্ক্ষী সেজে কুমন্ত্রণা দিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়া, বা দ্বীনের পথ তথা ধর্মকর্ম থেকে সরিয়ে দেয়া ও ঈমানহারা করা, কিংবা পারতপক্ষে নিজের ধর্মদ্রোহিতা, অনাচার ও জুলুম-অত্যাচারের পক্ষে অনুমতি, লাইসেন্স এবং সম্ভব হলে সক্রিয় সহযোগিতা ও সর্বাত্মক সমর্থন আদায় করা।
মনে করুন, আপনার স্ত্রী যদি বাচ্চার প্রতি সদ্ব্যবহারকারী না হয়েও আপনার প্রতি আপনার মায়ের অবহেলা নিয়ে পেরেশানী দেখায়, আপনার মা যদি আপনার শিশুসন্তানের প্রতি কৃপণতা বা বিরূপ মনোভাব পোষণ করলেও আপনার প্রতি বেশি যত্নবান হয়, আপনার শিশু-নির্যাতনকারী স্ত্রী যদি আপনার ভাই বা ভাতিজা আপনাকে ব্যবসায়ে ঠকালো কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ-অস্থিরতা দেখায়, আপনার প্রতিবেশী মহিলা যদি নিজের বাচ্চাকে ঘরে তালা মেরে রেখে এসে যেচে আপনার সাংসারিক কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে, তাহলে এগুলোকে উদ্দেশ্যমূলক বলেই জানবেন। কারণ, যে লোক বা মেয়েলোক বাচ্চাদের প্রতিই দয়া দেখাতে জানে না, সে বড় মানুষের প্রতি সমব্যথী হবে- এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। (নিজের) স্বার্থ হাসিল বা (পরের) অমঙ্গল সাধন ছাড়া তার আর কোন মোটিভ থাকতে পারে না। তবে কেউ যদি দারিদ্রের কারণে নিজের ও সন্তানের আহার যোগানোর তাগিদে নিজের বাচ্চাকে ফেলে রেখে অন্যের বাচ্চা পালনের চাকুরী নেয়, তার কথা ভিন্ন। এছাড়া আমাদের নবীর (সা:) সাহাবায়ে কেরাম যে সবকিছুর চাইতে রসূলুল্লাহ (সা:)-কে বেশি ভালবাসতেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও এ ব্যাপারটা প্রযোজ্য নয়। কারণ, নবীজী (সা:) বাস্তবেই আমাদের সন্তান-সন্তুতি অপেক্ষা অধিক ভালবাসা লাভের যোগ্য এবং তাঁর প্রতি সাহাবাদের ভালবাসাও কোনরূপ লোক দেখানো বা উদ্দেশ্যমূলক ছিল না, বরং খাঁটি আন্তরিক ছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কেউ যদি নিজের নিষ্পাপ শিশুদের চেয়ে অন্য কোন সাধারণ মানুষের প্রতি বেশি দরদ দেখায়, তাহলে সেক্ষেত্রেই কেবল সেটা সন্দেহ ও প্রশ্নের উদ্রেককারী বিষয় বলে গণ্য হবে। অবশ্য কোন পরিস্থিতি বা বিপদের কারণে যদি অন্য কোন মানুষ নিজের শিশু সন্তানের তুলনায় অধিক বিপন্ন ও সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে, তখন খাদ্য বা ঔষধ নিজের শিশুকে না দিয়ে ঐ ব্যক্তিকে দেয়াটা ভণ্ডামীর পর্যায়ে পড়বে না।

(৮) মানুষের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা, পারিপার্শ্বিকতা ও মন-মেজাজের কারণে একেক সময় একেক রকম আচরণ হতেই পারে। এছাড়া আপনার অবস্থা ও কার্যকলাপের প্রেক্ষিতেও আপনার প্রতি কারো আচরণ পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু তেমন কোন বোধগম্য কারণ ছাড়াই যদি দেখেন, কেউ একসময় ঠাণ্ডা মাথায় আপনার উপর নির্যাতন ও শত্রুতামূলক আচরণ করছে, সামনে-পিছনে আপনার বিরুদ্ধে অন্যান্য মানুষকে উত্তেজিত করছে, পরিকল্পিতভাবে আপনাকে হেয় ও ক্ষতিগ্রস্থ করার লক্ষ্যে কাজ করছে; আরেক সময় সেই একই ব্যক্তি যদি আপনার সাথে মধুর ব্যবহার করতে শুরু করে, আপনার প্রতি খাতির-যত্ন ও আদর-আস্তিক দেখাতে শুরু করে, আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়, আপনার কাছে অন্য কারো বদনাম করতে ও অন্য কারো বিরুদ্ধে আপনাকে উত্তেজিত করতে শুরু করে, আপনার সদুপদেশদাতা ও হিতৈষী বনে যায়; তাহলে তাকে মিথ্যাবাদী প্রতারক জালেম মুনাফিক ছাড়া কিছুই ভাববেন না। সে মূলত আপনার অনিষ্টকামী কুমন্ত্রণাদাতা 'ওয়াসওয়াসিল খান্নাস' মাত্র। সে যদি আপনার বন্ধুই হতো, তাহলে আপনার দুর্বল ও শক্তিশালী অবস্থা তথা সর্বাবস্থাতেই ইচ্ছাকৃতভাবে আপনার ক্ষতি করা বা আপনাকে কষ্টদান করা থেকে বিরত থাকত। আপনার দুর্বলতার কোন সুযোগ কখনো নিত না। কিন্তু এ শ্রেণির প্রতারকদের ধর্মই হল, তারা শুধু অনিষ্টসাধনের কৌশল পাল্টায় মাত্র। উদ্দেশ্য হাসিলটা কখনো সরাসরি নিজের হাত দিয়ে করে, কখনো অন্য কাউকে দিয়ে করায় আর নিজে সাধু থাকে। কখনো আপনার বিরুদ্ধে অন্যকে ক্ষেপাবে, আবার কখনো আপনাকে অন্য কারো বিরুদ্ধে ক্ষেপাবে। শৈশবে যে তোমাকে লাথি-পাছাড় ও গলাটিপ ছাড়া আর কিছুই দেয়নি, বমি ছাড়া আর কিছুই খাওয়ায়নি, কৈশোরে সে-ই যদি তোমাকে দু'হাত ভরে দান করতে শুরু করে, তখন তার পিছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখো। হতে পারে তোমার বাবার পকেট খালি করা বা তোমাকে কোন বিপথে বা বিপদে চালিত করার পরিকল্পনা এখানে কাজ করছে। শিশুকালে তোমরা কেউ একটা কমলা খেলে যে ব্যক্তি 'খাদক বজলু' বলে উপহাস করেছে এবং বজলুকে কমলা খাইয়ে নিজে যে বদান্যতার পরিচয় দিয়েছে সে ব্যাপারটি ঘরে ঘরে ঘুরে বলে বেড়িয়েছে, সেই ব্যক্তি যখন তোমাদের গ্রামের জমির মোটা চাল থাকতে আহলাদ করে দামী চিকন চাল কিনে খাওয়ায়, তখন বুঝবে, তোমাদের বাবাকে ফতুর করা এবং তোমাদের কাছে নিজে সস্তা জনপ্রিয়তা লাভ করাই তার উদ্দেশ্য। পাশাপাশি তোমাদেরকে এবং তোমাদের বাবাকে সমাজে সকলের চোখে হেয় ও অপাংক্তেয় করে তোলার লক্ষ্যটিও পূরণ হবে তোমাদেরকে অপব্যয়ী ও বিলাসী হিসেবে দেখাতে পারলে। যে তোমাকে আদর-স্নেহ-ভালবাসা তো দূরের কথা, ভুলেও এক মুহূর্তের জন্য মানবিক সহানুভূতিও দেখায় নি, সে-ই যখন তোমাকে অন্যদের কাছে আদর ও আশ্রয় পেতে দেখে অন্যদের নিরাপদ আশ্রয় ও ভালবাসার বন্ধন থেকে তোমাকে বিচ্ছিন্ন করবার উদ্দেশ্যে নিজে আগ বাড়িয়ে যেচে আদর-সোহাগ করতে শুরু করে; তখন তাকে কোনভাবেই বিশ্বাস করো না। যে তোমাকে আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছে, সে-ই যখন দু'বছর পর তোমাকে রাতের বেলা মসজিদে যেতে দেখে 'মাতৃস্নেহের'(!) দুশ্চিন্তায় দু'নয়নের জলে বুক ভাসিয়ে দেয়, তখন সেটাকে শয়তানী ছাড়া আর কিছুই ভাববে না। তোমাদের কারো বাড়ির পাশের মসজিদে যাওয়াটাকে যে ব্যক্তি ঝুঁকিপূর্ণ সাব্যস্ত করে রুখে দিয়েছে, দশ বছর পর সেই একই ব্যক্তি যখন তোমাদের কাউকে কোন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত করে প্রকাশ্য ও নিশ্চিত বিপদের দিকে ঠেলে দেবার জন্য পাগল হয়ে ওঠে, তখন তার দরদ ও মায়াকান্নার স্বরূপটা চূড়ান্তরূপে নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়। যে তোমার বাবাকে সবেমাত্র ফতুর বানালো, সে-ই যখন তোমার চাকরির জন্য তদবির শুরু করে, তাহলে বুঝবে, এ তোমাদের অর্থনৈতিক মুক্তিদানের কোন প্রয়াস নয়, বরং তোমাদেরকে নতুন করে কোন বিপদের সম্মুখীন করারই পায়তারা মাত্র। হতে পারে, তার নির্যাতনের ফলে সৃষ্ট তোমার শারীরিক ও মানসিক দুরবস্থা বর্তমান থাকা অবস্থায় তুমি কোন কর্মস্থলে বা মানব সমাজে গিয়ে স্বস্তিবোধ করবে না, তাই তোমাকে বিব্রত ও অপদস্থ করাই তার অভিপ্রায়। অথবা হতে পারে, এ তোমাদের ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ লাগানোর নতুন কোন অভিসন্ধি। কারণ, তোমাদের এক ভাই যদি উপার্জন করে অন্য দুই ভাইকে খাওয়ায় এবং পরবর্তীতে এর প্রতিদান না পায়, তখন ভাইয়ে ভাইয়ে মনোমালিন্য ও রেষারেষি অনিবার্য। অপরদিকে তুমি যদি তোমার উপার্জিত টাকার পুরোটা সংসারে দিয়ে দিতে না চাও, তাহলে সেটাও হবে তোমাকে কৃপণ ও দায়িত্বহীন আখ্যা দিয়ে তোমার বাকি দুই ভাইকে তোমার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার একটা মন্ত্র। আপনার আর্থিকভাবে স্বচ্ছল অবস্থায় আপনার সম্পদ যতদ্রুত সম্ভব ফুরিয়ে ফেলে আপনাকে দেউলিয়া বানানোর চেষ্টায় যে কোন ত্রুটি করেনি, সে-ই যখন আবার কে আপনার সম্পদ আটকে রাখল, কে আপনার কাছে বাড়িভাড়া চাইল এসব নিয়ে দরদে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, তখন তা আপনাকে বিপদের উপর বিপদে ফেলার প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়। অতএব, পরনিন্দুক চোগলখোর দুর্বৃত্তদের কখনো প্রশ্রয় দেবেন না।
উপকারী বন্ধুর পক্ষে কি প্রাণঘাতী শত্রু হওয়া সম্ভব? এ প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, যে ব্যক্তি আন্তরিক ও নি:স্বার্থভাবে [অর্থাত নিজে কোন ব্যক্তিগত বিনিময় ও লাভের আশা কিংবা আপনাকে তার নিজের মত ও পথে (এখানে ভ্রান্ত ধর্মবিশ্বাস ও মতাদর্শের কথাই বোঝাচ্ছি) চালিত করবার উদ্দেশ্য ছাড়াই] আপনার উপকার করেছে, তার ক্ষেত্রে বড় কোন গুরুতর কারণ বা পরিবর্তন ছাড়া আপনার শত্রুতে রূপান্তরিত হবার আশংকা নেই বলেই আমরা আশা করতে পারি। কিন্তু যে ব্যক্তি আদৌ আদতে আপনার কল্যাণকামী ছিলই না, বরং নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এবং আপনাকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করে আপনাকে নিজের অশুভ উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহার করবার জন্যই আপনার সাথে সদ্ব্যবহার ও আপনার উপকার করেছে, সে ব্যক্তি যেকোন সময় নিজের স্বরূপ ধারণ করে সরাসরি আপনার সাথে শত্রুতা শুরু করে দিতে পারে, অথবা উপরে ভাল সেজে থেকে গোপনেও আপনার চৌদ্দটা বাজিয়ে দিতে পারে। প্রথমজনের উদাহরণ হচ্ছে কিরণমালা, আর দ্বিতীয়জনের উদাহরণ হচ্ছে রাজকুমারী মোহিনী নামধারী ছদ্মবেশী নাগিনী।

(৯) সামনে ও পিছনে দুই রকম হওয়া: আপনার সামনে আপনাকে প্রশংসা ও সমর্থন করা বা আপনার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করা আর আপনার পিছনে বা অনুপস্থিতিতে আপনার হোগায় বাঁশ দেওয়া প্রতারক ব্যক্তিদের কর্মকৌশল। এরা আপনার পিছনে আপনার বিরুদ্ধে মানুষকে উষ্কানী প্রদান করে, আর আপনার সামনে আপনার প্রতি সমর্থন ও সহানুভূতিসূচক মনোভাব প্রকাশ করে থাকে। আপনার স্ত্রী বাপের বাড়ি থাকাকালে "এতদিন কেউ বেড়ায় নাকি?"- আপনার মায়ের এই প্রশ্নের জবাবে আপনার বোনকে যখন বলতে শুনবেন, "কেন, আমি বেড়াচ্ছি না? বাপের বাড়ি থাকাটাকে কি বেড়ানো বলে নাকি? বাপের বাড়ি তো নিজের বাড়িই।"- তখন হয়তো যারপরনাই মুগ্ধ ও অভিভূত হবেন আর ভাববেন, যাক, আমার বোনটা আমার পক্ষ নিয়ে দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছে বটে! কিন্তু "বউ শুধু বেড়ায়", "বউয়ের এরকম বাপের বাড়ি যাওয়াটা বিরক্তিকর ও নিন্দনীয়"- এই ধারণা ও তত্ত্বটার উৎপত্তিস্থল কোথায়, তা যদি জানতেন, তাহলে আর এমন আহলাদে আটখানা হবার কোন কারণ খুঁজে পেতেন না। অতিমাত্রায় ঝানু প্রতারক তথা গভীর জলের মাছেরা এরকমই ধূর্ত ও দ্বিমুখী স্বভাবের হয়ে থাকে, যারা সহজে মানুষের সামনে ধরা দেয় না। শুধু কথাতে নয়, প্রয়োজনে তরবারি হাতে নিয়ে আপনার পক্ষে আপনার শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলে আপনার প্রাণরক্ষার নাটক করেও আপনার কাছে আস্থা ও বিশ্বস্ততা অর্জন করতে পারে, যেমনটি আমরা দেখেছি 'কিরণমালা' সিরিয়ালে কুমারের ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক চাচা মহামন্ত্রী কর্তৃক বজ্রমালা ও পিশাচিনীর আক্রমণ প্রতিহত করার মধ্য দিয়ে। এরা হচ্ছে এমন চীজ, পরিবারের ছোট-বড় সবাইকে আপনাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপাতে থাকবে, কিন্তু আপনার সামনে ধরা দেবে না। আপনার পিতামাতার মাথায় আপনাদের নামে একেকটা উষ্কানীমূলক বিদ্বেষাত্মক বিষয় ঢোকাবে, তারপর পিতামাতা যদি মুখ ফসকে আপনাদের সামনে কোন বেফাস কথা বলে বসে তখন আপনাকে আশ্বস্ত করবার জন্য পিতামাতাকেই তিরস্কার করবে। তারা নিজেদের বাচ্চাদেরকেও আপনার বাচ্চার বিরুদ্ধে নানাভাবে উষ্কানী দেবে, "ও তোমাকে মারত, তোমাকেও ওকে মারতে শিখতে হবে" ইত্যকার উষ্কানীমূলক মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডার দ্বারা হিংসা ও শত্রুতা দিয়ে বাচ্চাদের মনকে ভরিয়ে তুলবে; কিন্তু তাদের কোন বাচ্চা যদি মায়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত তালিম (শিক্ষা) ও তরবিয়ত (প্রশিক্ষণ) মোতাবেক আমল করার কাজটা আপনার সামনেই করে বসে, অর্থাৎ আপনার চোখের সামনেই আপনার বাচ্চার সাথে মারামারি ও ধাক্কাধাক্কিতে প্রবৃত্ত হয়, তখন আপনার কাছ থেকে নিজেদের নোংরামিটা আড়াল করবার জন্য ঠিকই নিজেদের বাচ্চাদেরকে শাসন করবে- উত্তম মধ্যম দিয়ে তিরস্কার করবে। শুধুমাত্র পরিবারের কর্তাদের সামনে তারা যথাসম্ভব দেখাতে চেষ্টা করে, আমরা বাচ্চাদের মধ্যে পার্থক্য করি না, পিতা ও ভাইয়ের সামনে তারা নিজের ও ভাইয়ের বাচ্চা নির্বিশেষে সকলকেই আদর করে ডেকে খেতে দেয়, কিন্তু পিতা বা ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে ভাইয়ের বাচ্চার দিকে ফিরেও তাকায় না, বরং ভাইয়ের বাচ্চার মুখের গ্রাসটাও পারলে কেড়ে নেয়। এরা জানে, কিভাবে 'পালে এসে বিয়ান' দিতে হয়।
ধর্মবিরোধী মুনাফিক ব্যক্তিকেও দেখবেন, আপনার সামনে বসে বাচ্চাকে ধর্ম-কর্ম শেখানোর ব্যাপারে উৎসাহ দেবে, এ কাজে সমর্থন ও একাত্মতা প্রকাশ করবে, কিন্তু পিছনে এটা ঠেকানোর চেষ্টা করবে। আপনাকে বলবে, "ওকে নিয়ে একটু সূরা শেখাও", বাচ্চাকেও আপনার সামনে বলবে, "যাও, ভাইয়ার কাছ থেকে একটু সূরা শিখে এসো"; কিন্তু আপনার আড়ালে বসে বাচ্চাকে হয় সূরা শিখতে নিষেধ করবে অথবা অন্য কোন কৌশলে সূরা শেখার ব্যাপারে বিতৃষ্ঞা ধরিয়ে দেবে (হতে পারে তা সূরা শেখানোর নামেই নির্যাতন চালানোর মাধ্যমে)। আপনি যখন মসজিদে যাবার জন্য ডাকতে আসবেন, তখন আপনার সামনে নিজেই বাচ্চার জামাকাপড় এগিয়ে দিয়ে রেডি করিয়ে দেবে; কিন্তু মসজিদ গমনে বারণ করার এবং আপনাকে (নামাযের আহবানকারীকে) দরজা থেকে বিদায় করবার কাজটি শিশুর পিতাকে দিয়ে করাবে। মসজিদে যাবার ব্যাপারে নিজের আপত্তির কথা কখনো আপনার সামনে উচ্চারণ করবে না (যেহেতু আপনি তার ইসলামবিরোধী ও বাচ্চার অনিষ্টকামী মানসিকতার কথা জানেন তাই আপনার সামনে অন্য কোন ব্যাখ্যা বা ওজর ধোপে টিকবে না), বরং আপনার আড়ালে শিশু ও তার পিতা উভয়কে মসজিদ গমনের কথিত 'ঝুঁকির দিকটা' বুঝিয়ে convince করবে এবং আপনার সামনে দেখানো হবে শিশুটি নিজেই নামাযে যেতে চাচ্ছে না বা শিশুর পিতাই ঝুঁকির দিক বিবেচনায় মসজিদে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এখানে শিশুর (ধর্মদ্রোহী অনিষ্টকামী ভ্রষ্টাচারী) মায়ের কোন ভূমিকা নেই। আপনি হয়তো অনেক সময় মুনাফিক ব্যক্তির অনুকূল ব্যবহার দেখে এবং বিনা বাধায় নামায কায়েমের সুযোগ লাভ করে অবাক হয়ে যাবেন এমনকি এও হয়তো ভাবতে শুরু করবেন যে, মুনাফিক ব্যক্তি বোধহয় মুসলমান হয়ে গেছে কিংবা তা না হোক অন্তত ধর্মের ব্যাপারে উদার ও সহনশীল হয়ে গেছে, বাচ্চাদের কল্যাণকামী হয়ে না গেলেও অন্তত অকল্যাণ সাধনের খায়েশটা বাদ দিয়েছে; কিন্তু দেখবেন আপনার সামনে ভদ্র ব্যবহার ও সংযত আচরণ করলেও সে ঠিকই আপনার পিছনে অন্যান্য মুরব্বিয়ানে কেরামের কাছে ধরনা দিয়ে দরবার করে আপনার আগমনের উপর ১৪৪ ধারা জারি করার আইনটা পাশ করিয়ে ফেলেছে যা কার্যকর হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। বাচ্চার দ্বীন-ঈমান, আমল-আখলাক, সুখ-শান্তি ও মনুষ্যত্ব বিলুপ্ত করবার উদ্দেশ্যে বাচ্চাকে বমি খাওয়ানোর কাজটাও

১০। অন্যের কাজের কৃতিত্ব হাইজ্যাক করা ও নিজেদের দোষ অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়া: প্রতারক ব্যক্তিরা সবসময় ভাল বা প্রশংসনীয় কাজ অন্য কেউ করলেও বা অন্যকে দিয়ে করানো হলেও তার কৃতিত্ব নিজে লুফে নেয় এবং মন্দ বা নিন্দনীয় কাজ নিজে বা নিজেদের কেউ করলেও তার দায়ভার অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়। আল্লাহতাআলা বলেন, "তুমি মনে করো না, যারা নিজেদের কৃতকর্মের উপর আনন্দিত হয় এবং না করা বিষয়ের জন্য প্রশংসা কামনা করে, তারা আমার নিকট থেকে অব্যাহতি লাভ করেছে। বস্তুতঃ তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।" (সূরা আল-ইমরান: ১৮৮)
লেবু ফ্রিজ, ময়লা রক্ত, গালি শেখা, লবণ হাড়ক্ষয়। অপরদিকে নিজেদের কেউ আপত্তিকর কাজ করলেও তার কোন না কোন ইতিবাচক ব্যাখ্যা প্রদান করে।

৯। মানুষের কল্যাণ সাধনের চেয়ে মানুষকে সন্তুষ্ট করার দিকে এদের বেশি মনোযোগ থাকে। কারো কথাবার্তা ও হাবভাবে যদি এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ পায় যে, সে একাই আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী আপনজন, সে একাই আপনাকে ভালবাসে, আর অন্য সবাই (কিংবা তার বর্ণিত/নির্দেশিত/ইঙ্গিতকৃত সুনির্দিষ্ট কেউ কেউ) আদৌ আপনার ভালোই চায় না, সবাই শুধু আপনাকে ঠকায়- তদুপরি কোন কাজের কাজ কিছুর দ্বারা না হয়ে শুধু সস্তা আনুষ্ঠানিকতা ও আলগা আদিখ্যেতা দিয়েই আপনার কাছে নিজেকে প্রিয় ও অন্যকে অপ্রিয় বানাতে চায়, তাহলে এমন ব্যক্তি থেকে সাবধান! কারণ, "অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ।"

(১১) বিশ্বাসের ব্লাকমেইল: মানুষের বিশ্বাস নিয়ে ব্লাকমেইল করা হলো প্রতারকদের প্রধান রক্ষাকবচ। কারো প্রতারণা, শত্রুতা বা অনিষ্ট সম্পর্কে আঁচ করতে পারলেও তাকে সরাসরি ধরতে পারবেন না শুধু একথা শোনার ভয়ে যে, "ছি ছি! তুমি আমার সম্পর্কে এমন ভাবতে পারলে?" অনেক সময় দেখা যায়, আমরা ভিকটিম হয়েও অনিষ্টকারীদের সম্পর্কে সত্য কথা বলতে গেলে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়।

১২। পরিবারে ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ধান্ধায় থাকে এমন ব্যক্তি ও অপশক্তিগুলো মানুষকে জব্দ করবার জন্য তার কোন অক্ষমতা বা ব্যর্থতাকে পুঁজি করে থাকে। মানুষের নিরুপায় বা একান্ত অপারগ অবস্থাকে ইচ্ছাকৃত অবহেলা সাব্যস্ত করে তার বিরুদ্ধে অন্যদেরকে ক্ষেপিয়ে তোলার প্রয়াস চালায়। এ প্রসঙ্গে আমরা হযরত আলী (রা:)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের সেই অপপ্রচারের কথা উল্লেখ করতে পারি, যেখানে তারা উসমান হত্যার বিচারের দাবিকে উষ্কে দিয়েছিল এবং প্রচার করছিল, আলী (রা:) ইচ্ছাকৃতভাবেই এ বিচারকে উপেক্ষা করছেন এবং উসমান হত্যাকারীদেরকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তিনি বুঝি নিজেই উসমান হত্যার সাথে জড়িত। অথচ এই অভিযোগের রচয়িতারা নিজেরাই উসমান হত্যার মূল কুশীলব ছিল এবং তারা এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল যে, আলী (রা:) রীতিমতো অসহায় হয়ে পড়েছিলেন এবং এ হত্যা রবিচার করা তাঁর কাছে অসম্ভব হয়ে উঠেছিল, আর বিচার করতে গেলেও সাধারণ মানুষজন উসমানের খুনীদের হাতে জিম্মি থাকায় বড় রকমের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার আশংকা ছিল। আধুনিক যুগেও বিভিন্ন দেশের কুচক্রী রাজনীতিবিদদেরকে নিজ নিজ দেশের সরকারকে ব্যর্থ করা এবং সেই ব্যর্থতার দায়ে দোষারোপ করবার কৌশল অবলম্বন করতে দেখা যায়। এমনও দেখা যায় যে, কেউ একদিকে শত্রুরাষ্ট্রকে নিজ দেশ আক্রমণের প্ররোচনা দিল, নিজ দেশের উপর আগ্রাসনে সহায়তা করল; অপরদিকে শত্রুর আগ্রাসন মোকাবেলায় ব্যর্থতার ধুয়া তুলে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলল। আবার পারিবারিক পর্যায়েও দেখা যায়, কুচক্রী নারীরা একদিকে নিজ স্বামীকে ব্যর্থ করবার জন্য চেষ্টায় থাকে, স্বামীকে বিভিন্ন ব্যর্থ ফলহীন প্রজেক্টে নিয়োজিত করে ক্ষতিগ্রস্ত করে, স্বামীর বিরুদ্ধে অন্যের কাছে (বিশেষত ব্যবসায়িক পার্টনার ভাইয়ের কাছে) লবিং করে পাওনা টাকা আটকে দেয়, বা ছলে-বলে-কৌশলে অপচয় ঘটিয়ে বা অর্থ আত্মসাত করে নিয়ে স্বামীকে দেউলে করে; তারপর আবার বউ-বাচ্চার ভরণ-পোষণের মুরোদ নেই বলে হেয় করে, চাপের মধ্যে রাখে। সাধারণত দেখা যায়, কুচক্রীরা কারো যে অক্ষমতা বা সমস্যা নিয়ে ঝগড়া বাধানোর ইস্যু সৃষ্টি করে, সেই সমস্যা বা অসহায়ত্ব মূলত তাদেরই সৃষ্ট। ওসমান (রা:) হত্যা ও এরপর আলীর (রা:) অক্ষমতার কারণে আলীকে দায়ী করার ঘটনার ক্ষেত্রেও একথাই প্রযোজ্য ছিল। মানুষের পরিবারের মধ্যেও ভণ্ড ও বেদ্বীন নারীরা অর্থনৈতিক ব্যাপার থেকে শুরু করে ধর্মীয় ও চিকিৎসাগত ব্যাপার পর্যন্ত সবক্ষেত্রেই এরূপ ছলনার আশ্রয় নিয়ে থাকে। যেমন- বাচ্চাকে ধর্মশিক্ষা বা নামায-কালাম চর্চার কোনরূপ সুযোগ না দিয়ে এবং একগাদা ইংরেজি শিক্ষার বোঝা চাপিয়ে দিয়ে এমনকি ধর্মীয় তালিম দানের যেকোন প্রয়াসকে ভ্রূ-কুঁচকে জোরালোভাবে বিদ্রূপ ও তিরস্কারের জোরে দাবিয়ে রাখার পরও বাচ্চার উপর তার (ভণ্ড মায়ের) কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট অনীহা ও অলসতার জন্য কিংবা ধর্ম পালনে সামান্য ঘাটতি বা কথিত ভুল-ত্রুটির জন্য বাচ্চাকে বেদ্বীন ঠাওরাতে শুরু করে এবং বাচ্চার ধর্মের প্রতি কথিত গাফলতির জন্য ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপারে নিবেদিতপ্রাণ শিশুর পিতার উদাসীনতাকেই দায়ী করতে শুরু করে। এমনকি শিশুর পিতার অনিচ্ছাকৃত দু'এক ওয়াক্ত নামায কাজা হবার দোহাই দিয়ে পিতা ও সন্তানকে একই সাথে বেনামাযী ও ধর্মবিমুখ প্রমাণের 'জিহাদ' শুরু করে দেয় অনেকটা পাবলিকের ধাওয়ায় পলায়নপর চোর কর্তৃক পাবলিককেই 'চোর চোর' করে ধ্বনি তোলার স্টাইলে। একইভাবে, বাচ্চার চিকিৎসার ক্ষেত্রেও শিশুর পিতার যেকোন অপারগতা বা অক্ষমতা নিয়ে উদ্দেশ্যমূলক পলিটিক্স শুরু করে। যেমন, কোন এক ডাক্তারের দুর্নীতি ও অপচিকিৎসা সম্পর্কে জানার কারণে শিশুর পিতা একান্ত নিরূপায় না হলে জরুরী প্রয়োজন ছাড়া শিশুকে ঐ ডাক্তারের কাছে নেয়ার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করায় এই আসল কারণটি জানা সত্ত্বেও বাচ্চার মা উদ্দেশ্যমূলকভাবে এটাকে বাচ্চার পিতার কৃপণতা ও অবহেলা হিসেবে প্রচার করে এবং '(ডাক্তারের কাছে না নেবার কারণে) আমার বাচ্চাকে তুই অসুস্থ বানিয়েছিস, আমার বাচ্চাকে ভালো করে দে!' বলে তারস্বরে মাতম শুরু করে দেয়। এ ধরনের বিপজ্জনক মহিলারা প্রয়োজনে নিজের বাচ্চাকে খুন করেও বা পারতপক্ষে ইচ্ছাকৃতভাবে মৃত্যু বা সর্বনাশ ঘটবার সুযোগ দিয়েও বিলাপ জুড়ে দিতে পারে।
১৩। প্রতারকদের একটি চরিত্র হলো, তারা জেনে বুঝে ইচ্ছাকৃত ও সুপরিকল্পিতভাবে মানুষের ক্ষতি সাধন করে, কিন্তু তারপর আবার তাকদীরের দোহাই দিয়ে মানুষের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টা আল্লাহর উপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের দায়টা ধামাচাপা দেয়। প্রতারকদের মধ্যে যারা নিজেদের স্বার্থের জন্য বা ব্যক্তিগত হিংসার জন্য অন্যের উপর শোষণ করে শারীরিকভাবে অসুস্থ বানায়, তারাও বলে মানুষের রোগ-ব্যাধি, সুস্থতা-অসুস্থতা সব আল্লাহর ইচ্ছাতে হয়। আবার যারা মানুষের অনিষ্টকামী শয়তান হিসেবে ঠাণ্ডা মাথায় তিলে তিলে মানুষকে বিধ্বস্ত ও পঙ্গু করে দেয়, তারাও দাবি করে, মানুষের রোগ-শোক যা হয় সব আল্লাহই দিয়ে থাকেন। খোদাদ্রোহী প্রতারকরা আবার শুধু মানুষের অতীত ও ঘটে যাওয়া সর্বনাশের জন্যই আল্লাহকে দোষ দেয় না, বরং ভবিষ্যতে যে অনিষ্টটা সাধন করতে চাচ্ছে, তার দায়টাও অগ্রিম আল্লাহর উপর চাপিয়ে দিয়ে রাখে। এরা যখন কাউকে কোন বিপজ্জনক পেশায় যোগদানের জন্য প্ররোচিত করে, তখন কেউ তাদের সামনে এর ঝুঁকির দিকটা উল্লেখ করলেই সাথে সাথে এরা জবাব দেবে, হায়াত-মউত সব আল্লাহর হাতে। মৃত্যু যখন যেখানে যেভাবে লেখা আছে, তা এমনিতেই হবে। অথচ সে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবার হীন পরিকল্পিত উদ্দেশ্যেই তাকে ওখানে পাঠাতে চাচ্ছে। নিজের অতীতের অন্যায়-অপকর্ম আর ভবিষ্যতের অশুভ নিয়তকে চাপা দেবার জন্য আল্লাহর ইচ্ছা ও তাকদীরের দোহাই দিলেও ধর্মের জন্য কোন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ তো দূরের কথা, নামাযে যাবার মতন সহজ ও নিরাপদ কাজের অনুমতি দেবার বেলাতেও সে বিপদের গন্ধ পায়, সেক্ষেত্রে আর তাওয়াক্কুল ও তাকদীরের দোহাই চলে না। এই সমস্ত মুনাফিক ও ছলনাময়ীদের সামনে আমাদেরকে স্পষ্টভাবে একটা কথা ঘোষণা করতে হবে, হায়াত-মউত, সুস্থতা-অসুস্থতা সব আল্লাহর হাতে ও আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে একথা শতভাগ সত্য বটে, কিন্তু এই তাকদীরের বিধান কোন অপরাধীর চক্রান্ত ও মতলববাজিকে দায়মুক্তি দেয় না। ইচ্ছাকৃত অপরাধ যদি তাকদীরের দোহাই দিয়ে মার্জনীয় ও উপেক্ষণীয় হতো, তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতে কোন শাস্তির বিধানই থাকত না।
মানবসৃষ্ট অনিষ্টকে আল্লাহর ফয়সালা বলে মানুষের দোষকে আড়াল করতে চাওয়ার প্রয়াসটা যেমন মিথ্যাচার, প্রতারণা ও শয়তানী মনোভাবের আলামত; তেমনি কোন চিহ্নিত মুনাফিক অনিষ্টকামী ব্যক্তি কর্তৃক কোন দুর্ঘটনাকে আল্লাহর ইচ্ছা হিসেবে আখ্যায়িত করাটাও উক্ত ঘটনায় তার জড়িত থাকার ইঙ্গিতবহ। মনে করুন, আপনি আফসোস করে বললেন, ইস! কেন যে ঐ দিন এখানে এসেছিলাম। আমি যদি এখানে এভাবে না আসতাম, তাহলে আমার পা-টা ভাঙ্গত না। তখন কেউ আপনাকে বোঝাতে শুরু করল, বিপদাপদ ও হায়াত-মউত তো সব আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়, নইলে (স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণকারী আপনার কোন আপনজনের উল্লেখ করে) অমুকে মরেছিল কিভাবে; তখন বুঝবেন নিশ্চয়ই এ ঘটনায় তার কোন হাত আছে। যদি কোন দ্বীনদার ও ঈমানদার ব্যক্তি আপনার ঈমান রক্ষা ও আপনাকে সান্ত্বনা প্রদানের উদ্দেশ্যে তাকদীরের বাণী শোনায়, তাহলে সেটাকে আন্তরিক হিসেবে গ্রহণ করবেন। আর যদি কোন চিহ্নিত শত্রু ও পুরান পাপীর মুখে ধর্মের ওয়াজ শোনেন, তাহলে বুঝবেন এটা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার প্রয়াস বৈ আর কিছু নয়।

(১৪) অস্বাভাবিক প্রস্তাব পেশ করা: যেকোন অস্বাভাবিক প্রস্তাবকে নির্ঘাত ধোঁকা ও প্রতারণা হিসেবেই গণ্য করতে হবে। ব্যবসার প্রস্তাব হোক, বা বিয়ের প্রস্তাব হোক, যেকোন অসম ও অস্বাভাবিক প্রস্তাবকে প্রতারণা হিসেবেই জানবেন। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে যদি দেখেন, আপনার অপরিচিত দূর মহাদেশের কেউ পত্র, মোবাইল মেসেজ বা ইমেইলের মাধ্যমে তার মিলিয়ন ডলার স্থানান্তরের ব্যাপারে আপনার সহযোগিতা চাইল, সারা দুনিয়ার মধ্যে একমাত্র আপনাকেই বিশ্বস্ত সহায় হিসেবে পেল, আপনাকে আকর্ষণীয় কমিশনের প্রস্তাব দিল, তাহলে এ উদ্ভট আবেদনকে প্রথম দর্শনেই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবেন। আবার বিয়ের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে যদি শোনেন, পাত্রপক্ষ বউকে বসিয়ে রেখে খাওয়াবে, পাত্রের ঘরভর্তি চাকর-নোকর আছে, বউকে একদম কিছুই করতে হবে না; কিংবা পাত্রীপক্ষ পাত্রকে রান্না করেও খাওয়াবে আবার কামাই করেও খাওয়াবে, পাত্রকে ঘরে বা বাইরে কিছুই করতে হবে না; তাহলে এ ধরনের অবাস্তব প্রস্তাবে অবশ্যই ঘাপলা ও রহস্য থেকে থাকবে, যেটা আপনার জন্য সুখকর না হওয়ার সম্ভাবনাটাই বেশি। এ দুনিয়ায় যৌথ পরিবারের ক্ষেত্রে অন্তত এতটুকু আশা করতে পারেন যে, পুত্রবধূর উপর কাজের চাপকে সহনীয় মাত্রায় রাখা হবে, তার সুস্থতা ও অসুস্থতাকে গুরুত্ব দেয়া হবে এবং মাতৃত্বের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ছাড় প্রদান ও সহানুভূতি প্রদর্শন করা হবে। কিন্তু একেবারে বসিয়ে রেখে খাওয়ানোর আশ্বাস কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। আর কারো যদি ঐ ধরনের শুভ নিয়ত থেকেও থাকে, সে তা আগে থেকে অঙ্গীকার করবে না; কারণ প্রলোভন দেখিয়ে ফুসলিয়ে নেয়াটা কখনো সেবার করবার উদ্দেশ্যে হয় না, বরং ফায়দা হাসিলের জন্যই হয়ে থাকে। বিশেষ করে আজকের যুগে এই স্বার্থপর দুনিয়ায় অমন ত্যাগী মানুষ পাওয়ার আশা করাটাই বোকামি। কোন মানুষ যদি এতই মহৎপ্রাণ হয়ে থাকে যে, বউকে বসিয়ে রেখে খাওয়াবে, তাহলে অতবড় মহান উদার মানুষ হলে তার এতদিন ঘরে বসে থাকবারই কথা নয়, বরং আল্লাহর রাস্তায় মানুষের সেবার কাজে বেরিয়ে পড়ার কথা।
প্রতারণার শিকার হওয়া থেকে বাঁচতে হলে যেখানে মিথ্যার আভাস দেখবেন, সেখান থেকেই ভালোয় ভালোয় সটকে পড়বেন। কারণ, যারা একবার মিথ্যা বা প্রতারণার আশ্রয় নেবে, তারা আপনাকে বার বার এমনকি জীবনভর ঠকাতে পারে। কোন বিয়ের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে যদি দেখেন, একদিকে ঘটকেরা বিয়ে মিলানোর জন্য মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে- পাত্রের সামর্থ্য (ছেলেকে ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠিতরূপে তুলে ধরা), পাত্রের মায়ের গুণাবলী (অর্থাৎ ছেলের মাকে খুব সরল, ভালো ও সহানুভূতিশীল বলে প্রচার করা) ও পাত্রের সংসারের অবস্থা  (অর্থাৎ, সংসারে কোন কাজের চাপ থাকবে না, কাজের মানুষ দিয়ে কাজ করিয়ে বউকে বসিয়ে রেখে খাওয়ানো হবে ইত্যাদি বলা) সম্পর্কে মনগড়া অতিরঞ্জিত তথ্য পরিবেশনের দ্বারা পাত্রীপক্ষকে রাজি করানোর চেষ্টা করছে; অপরদিকে বিয়ের বিরোধী পক্ষ বিয়ে ভাঙ্গানি দেয়ার জন্য আপনার উপর মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে (অর্থাৎ, আপনি সম্পত্তির লোভে আসতে চাচ্ছেন কিনা এসব বলে আপনাকে জেরা করছে); তখন বুঝে নেবেন, যেখানে শুরুতেই মিথ্যা তথ্য ও মিথ্যা অপবাদের ছড়াছড়ি দেখা যায়, সেখানে গেলে সারাজীবনই আপনাকে মিথ্যা অপবাদের শিকার হতে হবে।
উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো যাদের মাঝে দেখবেন, তাদেরকে বিশ্বাস করার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করবেন। তবেই সমাজ-সংসারে ফেতনা থেকে নিরাপদ থাকবেন।

প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা: বিভ্রান্ত দল চেনার উপায়
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)
এই লেখাটির সারাংশ তথা মূল বক্তব্য সংক্ষেপে এককথায় প্রকাশ করতে গেলে বলা যায়, কোরআন শরীফের ছোট্ট একটি বাক্যে আমার এ আলোচনার সারমর্ম নিহিত আছে:- إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَكَاذِبُونَ অর্থাৎ, নিশ্চয়ই মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী। (সূরা মুনাফিকুন: ১)

মানুষ কখন প্রতারিত হয়? প্রতারিত কারা বেশি হয়?

যে সমস্ত কারণে মানুষ প্রতারিত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে, তা হল কোন বিষয় বা মানুষের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস ও শর্তহীন অনুরাগ। সাধারণত নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেবার কারণে মানুষ প্রতারিত হয়ে থাকে:-

(১) বাহ্যিক লেবাস: মানুষের বাহ্যিক লেবাস তথা দাড়ি-টুপি, বোরখা-হিজাব ইত্যাদিকে যখন অতিরিক্ত প্রাধান্য দেবেন, তখনই আপনি প্রতারিত হতে বাধ্য। কারণ, লেবাসটাই আপনার কাছে তাকওয়া হিসেবে বিবেচিত হবে এবং লেবাসধারীকেই আপনি তাকওয়াসম্পন্ন মুত্তাকী হিসেবে গণ্য করবেন। কারণ, টুপিধারী ব্যক্তিও লোক ঠকাতে পারে, আপনার অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করতে পারে, এমনকি আপনাকে শত্রুর হাতে ধরিয়েও দিতে পারে। বোরখাধারী মহিলাও পরকীয়ায় লিপ্ত হতে পারে, এমনকি কাফের-বেঈমান ও শয়তান-মুনাফিকও হতে পারে, মুসলমানের বেশ ধরে থেকে শিশুকে ধর্মচ্যুত ও পথভ্রষ্ট করবার চেষ্টা-সাধনায়ও লিপ্ত হতে পারে। এমনকি যে মহিলাটি শিশুকে নামায পড়তেও দিচ্ছে না, নানান ছলছুতা ও বাহানা হাজির করে শিশুদেরকে নামায থেকে দূরে রাখতে সচেষ্ট থাকে, সেই মহিলাও নিজে বোরখা পরার দ্বারা সমাজে ধর্মপরায়ণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

(২) বাহ্যিক আচরণ ও আংশিক পর্যবেক্ষণ: মানুষের স্বভাব-চরিত্র, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, মতিগতি ও মন-মানসিকতা সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য না নিয়ে শুধু তার বাহ্যিক আচার-আচরণ বিশেষত শুধু আপনার প্রতি তার আচরণ দেখে যখন তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন প্রতারিত হতে পারেন। কারণ, একটা মানুষ সামনে কি করে, পিছনে কি করে; আপনার সাথে কি আচরণ করে, পরিবারের আর পাঁচজনের সাথে কি আচরণ করে; তার সার্বিক চিত্র পর্যালোচনা না করে সে কেমন মানুষ এটা আপনি বুঝতে পারবেন না। অবশ্য আংশিক পর্যবেক্ষণ দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সাধারণত নীতিবান ও ঈমানদার ব্যক্তির পক্ষে কম থাকে। কারণ, আপনি যদি আল্লাহর প্রতি ঈমানদার ও আল্লাহর বান্দাদের প্রতি দয়াশীল হয়ে থাকেন, সকলের কল্যাণ কামনা যদি আপনার নীতি হয়ে থাকে, তাহলে আপনি মানুষ বিচার করার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শুধু আপনার সাথে কি আচরণ করে তা দেখে সন্তুষ্ট থাকবেন না, বরং সকলের সাথে সে কি ব্যবহার করে সেই খবরটা অবশ্যই নেবেন। অপরদিকে স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা যদি আপনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকে, তাহলে কোন ব্যক্তিকে অন্য সবার সাথে অমানবিক আচরণ করতে সচক্ষে দেখলেও শুধু আপনার সাথে ভালো ব্যবহারকে আমলে নিয়ে তাকে বন্ধু হিসেবে বেছে নেবেন। এমনকি শিশু নির্যাতনকারী অমানুষ ব্যক্তিও আপনার কাছে পরম দয়াশীল মানবদরদী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মনে রাখবেন, প্রতারক মানেই যে সবসময় সবার সাথে শুধু মিথ্যা কথাই বলবে, সবসময় শুধু জালেম ও অন্যায়কারীর পক্ষেই থাকবে, সবসময় শুধু মন্দ কাজের আদেশ ও ভালো কাজের নিষেধই করবে- এমনটি নাও হতে পারে। চরম আল্লাহদ্রোহী, মানুষের অনিষ্টকামী ও শয়তান প্রকৃতির ব্যক্তিও নিজের আসল উদ্দেশ্য, স্বভাব ও পরিচয় লুকানোর জন্য সত্য কথাও বলতে পারে, কোন কোন সময় মজলুমের পক্ষেও সমর্থন দিতে পারে ও জালেমকে ছি-ছি- জানাতে পারে, মন্দ কাজের প্রতি নিন্দাবাদ ও ভালো কাজে বাহবা ও উৎসাহ প্রদানও করতে পারে। যাতে আপনি তাকে সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ হিসেবে বিশ্বাস করেন, যাতে আপনি মনে করেন সে আসলে ধর্ম ও মানবতার পক্ষে। প্রতারক কুচক্রী ব্যক্তিরা সবাইকে কিন্তু একভাবে পটায় না। যারা নীতিহীন ও স্বার্থপর জালেম, তাদেরকে বশে রাখার কাজটি নিজের দুষ্ট চরিত্র কিছুটা প্রকাশ রেখেও সম্পন্ন করা যায়। কিন্তু যখন কোন ধার্মিক ও ভালো মানুষকে পটা

(৩) আত্মীয়তা: শুধু নিজের আত্মীয় বলেই যারা মানুষকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে, তার সব কথা বিশ্বাস করে ও মেনে চলে, কিংবা তাকে কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বা পদ প্রদান করে, তারা প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার সম্মুখীন হতে পারে যেকোন সময়ে। মনে রাখবেন, জগতের সকল অপরাধী ও কুচক্রী ব্যক্তিই কারো না কারো আত্মীয়। শত্রু মানুষের ঘরেই থাকে, আসমান থেকে নাযিল হয় না। আমার আত্মীয় খারাপ হতে পারে না- এই অন্ধবিশ্বাসটাই মানুষকে বিপদে ফেলার জন্য যথেষ্ট।

(৪) দল বা ফেরকা-মাযহাব: যারা কোন দলীয় পরিচয় বা ফেরকা-মাযহাবের প্রতি অতিরিক্ত অনুরাগী ও অনুগত হয়ে থাকেন, তাদের কাছে আর সব পরিচয়ের উপরে এই পরিচয়টাই প্রবল হয়ে থাকে। তারা মনে করেন, যেহেতু আমার দলটাই একমাত্র সুপথগামী দল, যেহেতু আমার তরীকা ও মাযহাবটাই জগতের একমাত্র সহীহ পথ, তাই এর অনুসারী ও অনুগামী ব্যক্তি মাত্রই ঈমানদার ও বিশ্বস্ত হয়ে থাকবে। অতএব, তাকে চোখ বন্ধ করে ব্লাংক চেক দিতেও সমস্যা নেই, নিশ্চিন্তে নির্ভয়ে নিজের বেডরুমটাও তাকে চিনিয়ে দেয়া যায়, নিজের দ্বীনী-দুনিয়াবি যত জ্ঞান ও প্রতিভা আছে, রাজনৈতিক-সামরিক যত কলাকৌশল ও কসরত আছে, সবকিছুর তালিমই তাকে দিয়ে দেয়া চলে নির্দ্বিধায়।

কৃত্রিমতা ও লৌকিকতা দিয়ে যাদেরকে জয় করতে হয়, যাদের সমর্থন লাভের জন্য ছলনার আশ্রয় নেবার প্রয়োজন হয়, তাদের সমর্থন লাভের জন্য আফসোস করো না। কারণ, তাদের অভিমত ও সিদ্ধান্ত ক্ষণস্থায়ী। পক্ষান্তরে যারা নৈতিকতা ও মানবিকতার অধিকারী, যারা স্বভাবগতভাবেই ন্যায়পরায়ণ ও দয়াশীল, ন্যায়-অন্যায় বিবেচনাবোধ যাদের মাঝে বর্তমান; তাদেরকে সমর্থন কর, নিজের প্রয়োজনে তাদের কাছে সমর্থন প্রত্যাশা কর। হতে পারে সমাজ-সংসারে তারা খুব একটা প্রভাবশালী নয়; তাদের সমর্থনে পরিবারে, সমাজে বা প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার ভারসাম্য রাতারাতি খুব একটা হেরফের হবার নয়; তারপরও আপনি নিজে সততা ও ন্যায়ের উপর কায়েম থাকা সাপেক্ষে তাদেরকে স্থায়ী বিশ্বস্ত বন্ধুরূপে পেতে পারেন।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)